ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার

নিয়মিত লিগ হওয়া চাই 

নিয়মিত লিগ হওয়া চাই 
×

বাংলাদেশ নারী ‍ফুটবল দলের কোচ সাইফুল বারী টিটু। ছবি: ফাইল

সাখাওয়াত হোসেন জয়

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৪ | ১৩:১৬

গোলাম রব্বানী ছোটন পদত্যাগের পর অনেকেই বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। এর পর সাইফুল বারী টুটির কাঁধে দেওয়া হয় নারী দলের দায়িত্ব। তাঁর অধীনে পরপর দুটি বয়সভিত্তিক সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। সর্বশেষ নেপালে জিতেছে অনূর্ধ্ব-১৬ নারী সাফের ট্রফি। সুরভী–ইয়ারজেনদের সাফল্যের অন্যতম কারিগর কোচ টিটু। অল্প কয়েকদিনে মেয়েদের দল নিয়ে কাজ করে কীভাবে সফল হয়েছেন, মেয়েদের লিগসহ আরও নানা বিষয় নিয়ে বুধবার সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন সাইফুল বারী টিটু। শুনেছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়। 

সমকাল : নারী দলের কোচ হওয়ার পর আপনার অধীনে দুটি বয়সভিত্তিক সাফ জিতেছে।

টিটু : সাফল্য তো আমার একার কারণে হয়নি। এটা পুরোটা টিমওয়ার্ক। বড় কথা হচ্ছে, মেয়েরা তো আগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তাদের জন্য এটা তাই নতুন কিছু না। কোচ হিসেবে সাফল্য আসায় অবশ্যই আমি ব্যক্তিগতভাবে খুশি। তবে এটা মনে রাখতে হবে, সাফল্যটা কীভাবে এসেছে, তা নিয়ে চিন্তা করা। আমার চেয়ে মেয়েদের কৃতিত্ব বেশি। আসল কাজটি তো ওরাই করে। আর এখানে ধন্যবাদ অবশ্যই দিতে হবে কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং মাহফুজা আক্তার কিরণকে। মেয়েদের ফুটবলের জন্য তারা একটা প্ল্যাটফর্ম করে রেখেছেন। সারা বছর ট্রেনিং করার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। এই কারণে মেয়েরা মানসিক এবং শারীরিকভাবে অনেক শক্তিশালী। আপনি যখন সারা বছর ট্রেনিংয়ের মধ্যে থাকবেন, তখন আপনার ফিটনেস লেভেল থেকে শুরু করে সবকিছুতেই উন্নতি হবে। ওই প্রেক্ষাপটগুলো তৈরিই ছিল। আমি শুধু কাজ করেছি যেসব খেলোয়াড় নতুন, যারা কিনা একাডেমিতে আগে ছিল না, তাদের নিয়ে। এদের সঙ্গে পুরোনোদের মধ্যে বন্ডিং তৈরি করার কাজটি খুব কম সময়ের মধ্যেই করার চেষ্টা করেছি। এটা হয়তো আমার লাভ হয়েছে। 

সমকাল : অনূর্ধ্ব-১৬ দলে অনেক প্লেয়ারই নতুন। সে হিসেবে আপনি কি মনে করনে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের চেয়ে অনূর্ধ্ব-১৬ দলকে চ্যাম্পিয়ন করাটা কঠিন ছিল?

টিটু : অনূর্ধ্ব-১৯ দল যৌথ চ্যাম্পিয়ন। আর এবারেরটা আমরা এককভাবে চ্যাম্পিয়ন। সেজন্য একটু ভালো লাগা কাজ করছে। আরেকটা বড় হলো, খুব কম সময়ের মধ্যেই এদের নিয়ে কাজ করে সফল হয়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, তারা খুব ট্যালেন্ট। 

সমকাল : নেপালে অন্যতম সমস্যা ছিল উচ্চতার। আর স্বল্প সময়ের মধ্যে এই দলকে গুছিয়ে নেওয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

টিটু : এটা অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। আর নেপালের উচ্চতা সব দলের জন্যই সমস্যা হয়। এজন্য প্রথম ম্যাচের আগে তিন দিন ট্রেনিং করার সুযোগ পেয়েছি। উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা বেশি অনুশীলন করেছি। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বেশির ভাগ ফুটবলারকে আমি আগে থেকেই জানি। কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৬ বয়সীদের সঙ্গে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা কম ছিল।

সমকাল : মেয়েদের ফুটবলের সাফল্যের শুরু কিন্তু কিশোরীদের হাত ধরেই। এই দলের কাকে কাকে আপনি আগামীর মারিয়া, মনিকা কিংবা সাবিনার মতো মনে করছেন?

টিটু : এটা এখনই বলা মুশকিল। আর ব্যক্তিগতভাবে কারও নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না। কারণ, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সাফল্য এসেছে। এটা ঠিক কয়েকজন ছিলেন দুর্দান্ত। আর মারিয়া, মনিকারাও কিন্তু একসময় এদের মতো ছিল। এই পর্যায়ে যেতে তাদের অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। এদেরও সময় দিতে হবে। আর ভবিষ্যতের তারকা আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে। একটা জিনিস, মনিকা-মারিয়া কিন্তু এক্সট্রা অর্ডিনারি। আর একজন কোচ কিন্তু ফুটবলার বের করে আনতে যতটা না পারেন, তার চেয়ে ওই ফুটবলারের মেধা এবং প্রতিভাটা বেশি থাকে। 

সমকাল : আপনি এমন সময় নারী দলের কোচের দায়িত্ব পেয়েছিলেন যখন সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন পদত্যাগ করেছেন। সেই সময় অনেকেই বলেছেন, ছোটন চলে যাওয়া মানে মেয়েদের ফুটবল শেষ হয়ে যাওয়া। কিন্তু দিনশেষে আপনার হাত ধরে দুটি ট্রফি জিতেছে বাংলাদেশ।

টিটু : কোনো একক কোচের ওপর সবকিছু নির্ভর করে না। ছোটন তার একটা পার্ট করে গেছে। এখন আমার পার্ট আমি করার চেষ্টা করছি। ছোটন যে কাজ করে গেছে, আমার এখানে আসার পর আগে সেগুলো বুঝতে হয়েছে। মেয়েরা কোন ফরম্যাটে অভ্যস্ত বা কীভাবে খেলে সেগুলো আমাকে আগে বুঝতে হয়েছে। মেয়েদের সঙ্গে ছোটনের বন্ডিংটা লম্বা সময় ধরে। আমাকেও ওদের সময় দিতে হয়েছে। ওদেরও আমাকে সময় দিতে হয়েছে। 

সমকাল : ছেলেদের বাইরে এই প্রথম আপনি মেয়েদের টিম নিয়ে কাজ করেছেন। 

টিটু : চ্যালেঞ্জিং ছিল। ফুটবলে আসলে কোচের দায়িত্ব একই। দুটি ফর্মুলা একই। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা আছে, তারা অনেক দিন ধরে ট্রেনিংয়ের মধ্যে ছিল। আর তারা যে কোনো কৌশল খুব সহজেই আয়ত্ত করতে পারে। আর মেয়েরা দ্রুতই মানিয়ে নিতে পারে। আমি আসার পর একটু চিন্তা করেছিলাম, তাদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলব। যে কারণে শুরুতেই একটু সতর্ক ছিলাম। তবে আস্তে আস্তে তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি।

সমকাল : নারী দলের কোচ হওয়ার পর ছোটনের সঙ্গে কখনও কথা হয়েছিল আপনার?

টিটু : হ্যাঁ, অনেকবারই হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ছোটনের সঙ্গে কথা বলেছি। পরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে মেসেজ পাঠিয়েছিল।

সমকাল : সামনে সিনিয়র নারী দলের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। কিন্তু টুর্নামেন্টের প্রস্তুতির জন্য আমরা দুটি উইন্ডোতে কোনো ম্যাচ খেলতে পারিনি।

টিটু : উইন্ডো কখনও মিস করতে চাইনি। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে আমরা কোনো টিম পাইনি খেলার জন্য। এপ্রিল এবং জুনের উইন্ডোতে অবশ্যই আমাদের খেলতেই হবে। উইন্ডোটা যতটা কাজে লাগানো যাবে, ততটা ভালো। বিশেষ করে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে আপনাকে খেলতেই হবে। তখনই আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনি কোথায় আছেন। আর আপনাকে সাউথ এশিয়ার বাইরের দলগুলোর সঙ্গে খেলতে হবে বেশি। খেলতে পারলে এই অঞ্চলের বাইরে গিয়ে আপনি নিজের অবস্থানটা বুঝতে পারবেন।

সমকাল : আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য এলেও মেয়েদের লিগটা অনিয়মিত। 

টিটু : আমি মনে করি, ক্লাব ফুটবলের গুরুত্বটা সবচেয়ে বেশি। সারা বছর বাফুফেতে প্র্যাকটিস করলে তো হবে না। আপনাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ খেলতে হবে বেশি। লিগে খেললে এর চেয়ে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ তো পাওয়া যায় না। প্রতি সপ্তাহে একটি-দুটি ম্যাচ থাকত। তাই নিয়মিত লিগ হওয়াটা অবশ্যই দরকার। সামনে হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, বড় বড় টিম দল তৈরি করতে পারছে না। বসুন্ধরা কিন্তু এবার নেই। এটা যদি আমরা ভারতের মতো বিদেশি প্লেয়ার যুক্ত করতে পারতাম, তাহলে সেটা আরও ভালো হতো। ভারত যেমন বিভিন্ন বিদেশি ফুটবলার এনেছে এবং তারা কিন্তু হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে খেলছে। ওটাও বেশ দরকার। এই জিনিসটা আমাদের নজর রাখা উচিত। ক্লাবগুলোর তো সহযোগিতার দরকার আছে। তাদের কীভাবে সহযোগিতা করার যায়, সেই জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কিছু করা যায় কিনা, তা নিয়েই ভাবা উচিত। সবকিছু নিয়েই কাজ করা দরকার।

আরও পড়ুন

×