ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্ট্রেইট ড্রাইভ

ওয়ানডেতে আমাদের গেছে যেদিন, একেবারেই কি গেছে...

ওয়ানডেতে আমাদের গেছে যেদিন, একেবারেই কি গেছে...
×

ফাইল ছবি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৫৮ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১০:৫৩

এশিয়া কাপের সময় আবুধাবিতে দেখা, সংবাদ সম্মেলনে তিনি আসবেন শুনেই পরিচিত সাংবাদিকরা ঠিক করে ফেলেন– কোন শিরোনামে ঢাকায় রিপোর্ট পাঠাতে হবে। ‘বিলিভ ... ছেলেদের নিজেদের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে ...।’ মজার ব্যাপার হচ্ছে, চেয়ারে বসে সেদিন স্পিন বোলিং কোচ মুস্তাক আহমেদ ঠিক প্রথম শব্দটিই বলেছিলেন ‘বিলিভ ...।’ 

ক্রিকেটকে দর্শনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু মুস্তাক আহমেদ নন, প্রধান কোচ ফিল সিমন্স আর সিনিয়র সহকারী কোচও একধাপ এগিয়ে। সুযোগ পেলেই ক্রিকেটারদের ছাত্র বানিয়ে তিনি হয়ে যান দর্শনের শিক্ষক। অতীত আর মানসিক চাপ দূর করার পরামর্শ দেন। ড্রেসিংরুমে এই ভাববাদী তত্ত্বের ছোঁয়াচে রোগ ক্রিকেটারদের মধ্যেও পড়েছে। তারাও ম্যাচ হারলে তাত্ত্বিক কথাবার্তা বলে তাদের টেকনিক্যাল দুর্বলতাগুলো এড়িয়ে যাওয়া শিখেছে। 

যে দলের কোনো ক্রিকেটার অফসাইড দিয়ে একটি বাউন্ডারি হাঁকাতে পারেন না, সেই দলের সমস্যা মানসিক নয়, প্রবলভাবে ক্রিকেটীয় দক্ষতার। যে দলের ওপেনার ২৮টি ওয়ানডে খেলার পরও ২০.৬৬ গড়ের বেশি যেতে পারেননি, সেই দল যে শেষ ১০টি ম্যাচের ছয়টিতেই আড়াইশ স্পর্শ করতে পারেনি, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আবার হৃদয়-জাকের– এ বছরে যে দুজনের গড় ভালো, তাদের আবার স্ট্রাইকরেট সত্তরের আশপাশে, সেই দল যে শেষ ১০টি ম্যাচের মধ্যে ৯টিতেই হেরেছে, তাতেও ভ্রু কুঁচকানোর কিছু নেই!

আসলে ওয়ানডে ফরম্যাটের দক্ষতা আর মেধার প্রবল ঘাটতি রয়েছে পুরো দলে। রোগ নির্ণয় করে নির্বাচক প্রধান গাজী আশরাফ ওষুধও দিয়েছেন, বিকল্প ওপেনার হিসেবে ‘পরীক্ষিত’ নাঈম শেখকে পুনর্বাসনে আবুধাবি পাঠিয়েছেন। যার কিনা আটটি ওডিআইয়ে সাতে তেরো গড়, স্ট্রাইকরেট ষাটের আশপাশে! ডমিস্টিক কিংকে আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে, যেভাবে গত দুই বছর ধরে তানজিদ তামিমকে করানোর চেষ্টা চলছে। 

২০২৩ সালের এশিয়া কাপে তানজিদের অভিষেকের পর ওপেনিংয়ে মোট ১১ জন সঙ্গী দেওয়া হয়েছে, কিন্তু একটিবারের জন্যও তানজিদকে বদল করা হয়নি। এই ফরম্যাটে ঘরোয়া ক্রিকেটেই যার গড় ২৯, তাঁকে দিয়ে বড় মঞ্চে কতটা প্রত্যাশা করা যায়, তা গত বিশ্বকাপেই দেখা হয়ে গেছে। অস্বস্তি জড়ানো বুকসমান বাউন্স, প্রত্যাশার চেয়ে একটু বেশি টার্ন– সবকিছুতেই এলোমেলা তানজিদ। সবকিছুতেই যা নয়, তা যেন জোর করে করানোর চেষ্টা চলছে, তেতো ওষুধ গেলানোর মতো গিলছে তা ক্রিকেটাররা! 

অধিনায়কত্ব হারিয়ে নাজমুল হোসেন শান্ত আরও ‘শান্ত’ হয়ে গেছেন। মিরাজ নিজেকে ৭ নম্বর থেকে মিডল অর্ডারে ৫ নম্বরে প্রমোশন নিয়েছেন। তাওহীদ হৃদয় হয় রানআউট হচ্ছেন, না হয় করছেন। টি২০ থেকে ওয়ানডেতে ফিরেও নুরুল হাসান সোহানের ছটফটানিও এতটুকু কমেনি। জাকের আলীরও ফিনিশিং দেওয়া আর হয়ে উঠেনি! নির্দিষ্ট কিছু শট সিলেকশনের মধ্যেই আটকে আছে তাদের আত্মবিশ্বাস। অনসাইড যে তাদের চুম্বুকের মতো টানে, গত দেড় মাসে আমিরাত সফরে থাকা বাংলাদেশি ব্যাটারদের এই দুর্বলতাটি লাল দাগ দিয়ে মার্ক করে নিয়েছে আফগানরা। এই দলকে সিরিজ হারতে দেখে তাই অবাক হয়নি সমর্থকরা। শুধু শঙ্কা বেড়েছে তাদের পরের বিশ্বকাপে সরাসরি খেলা নিয়ে।

আজ শুনলে গল্প মনে হয়, সে একটা দিন ছিল– ‘যখন তিতিরকে দেওয়া কথা রাখত চড়ুই, দিগন্তকে দেওয়া কথা রাখত আঙিনা, মুহূর্তকে দেওয়া কথা রাখত অসীম।’ কোনো এক কবিতায় পড়া পঙ্খিগুলো মনে পড়ছে বড্ড। আমাদেরও সে একটা দিন ছিল– যখন টেস্ট আর টি২০র লাস্ট বেঞ্চের ছাত্রটিই ওয়ানডেতে পেত ‘এ প্লাস’, সমর্থকদের দেওয়া কথা রাখত ক্রিকেটাররা। কোচের দেওয়া পরিকল্পনা মাঠে রাখত ব্যাটাররা, অধিনায়কের দেওয়া কথা রাখত বোলাররা। ২০১৫ থেকে যে স্বর্ণ সময় শুরু হয়েছিল, ২০২২ পর্যন্তও তার রেশ লেগেছিল বিশ্বক্রিকেটে। প্রায় সাতটি বছর র‍্যাঙ্কিংয়ে ছয় থেকে আটের মধ্যেই থাকত, সেই দলটিই দুই দশক পর গত ছয় মাস ধরে ১০ নম্বরে। 

২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে ওই বছরের মার্চের মধ্যে র‍্যাঙ্কিংয়ে ১০ থেকে ৯ নম্বরে উত্তীর্ণ হতে হবে। টি২০র জন্য সব ব্যালেন্স শেষ করে ওয়ানডেতে এখন দেনা দেনায় ভরে গেছে মিরাজের এই দল, চিহ্নবিহীন পথে বিভ্রান্তের মতো যেন ছুটছে তারা। মিরাজের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হলে জানতে চাইব– ওয়ানডেতে আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি?

আরও পড়ুন

×