বাংলাদেশও কাউন্টার অ্যাটাক করতে জানে
কাউন্ডার অ্যাটাকে রাকিব-মোরছালিন জুটিতে পাওয়া গোল উদযাপন। ছবি: সাজ্জাদ নয়ন
রাশেদুল ইসলাম
প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | ১৬:১৬
কাল বিকেলে ফোনে কথা হচ্ছিল শেখ মোরছালিনের সঙ্গে। জানতে চাইলাম, এক বাক্যে নিজের গোলটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? অনেকক্ষণ ভেবে মোরছালিন বলল, ‘কী বলা যায় … কী বলা যায় …।’
শেষ পর্যন্ত এক বাক্যে বলা হলো না ভারতের বিপক্ষে জয়ের নায়কের। ২২ বছর পর ভারতকে হারানো একমাত্র গোলটিকে মোরছালিন ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, ‘ফিনিশিংটা ভালো হয়েছে খুব। ডিফেন্ডারা বুঝতে পারে নাই যে এমন কিছু হয়ে যাবে। আমার মনে হয়, ওরা আমাকে সেভাবে গোনায় ধরে নাই। আমি রান করেছি এই ভেবে যে, পাইলেও পাইতে পারি। বলটা গুরপ্রীত সিংয়ের (ভারতের গোলকিপার) দখলে ছিল ৬০ ভাগ আমার ছিল ৪০। আমি রানিংয়ে ছিলাম বলে বল উইন করেছি।’
গুরপ্রীতের সঙ্গে এই ভগ্নাংশের লড়াই শুধু মোরছালিনই জেতেননি, এর ওপর ভর করে জিতেছে বাংলাদেশও। রাকিব হোসেন ও মোরছালিনের রসায়নে জন্ম নেওয়া সেই কাউন্টার অ্যাটাকের গোলটি বারবার ইউটিউবে সার্চ দিয়ে দেখার মতোই।
ফুটবলীয় ভাষায় ডিফেন্সিভ অ্যাকশন টু অ্যাটাকিং ট্রানজিশন, স্পিড, এক্সপ্লোয়েশন অব স্পেস, ইন্টেলিজেন্স অব বল মুভমেন্ট, ক্লিনিক্যাল ফিনিশ– সব মিলিয়ে দুর্দান্ত একটা গোল। এর সঙ্গে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মোরছালিনের সেকেন্ড বল উইন।
ফুটবল সমর্থকদের জানা আছে, রাকিব খুবই দ্রুতগতিসম্পন্ন ফুটবলার। উইঙ্গার হিসেবে খেলাতে রাকিবের গতিটা চোখে পড়ে। কিন্তু মোরছালিন বেশির ভাগ সময় মিডল করিডোরে অবস্থান করায় তাকে বেশি টেকনিক্যাল, ক্রিয়েটিভিটি, পজিশন সেন্স ভীষণ শো করতে হয়। তেমন বেশি দূরত্ব পাড়ি দিতে হয় না বিধায় ওর স্পিডটা সেভাবে চোখে পড়ে না। ভারতের বিপক্ষে অধিনায়ক সন্দেশ ঝিঙ্গানসহ ভারতীয় খেলোয়াড়দের গতির পরীক্ষা নিয়ে পাস করে গেছেন তরুণ এই ফুটবলার।
ভারতীয় ডিফেন্ডার রাহুল ভেকের থ্রো ইন থেকে গল্পের শুরু। রাহুলের থ্রো ইন হেড করে যখন ক্লিয়ার করলেন সাদ, নিজেদের ডিফেন্ডিং থার্ডে সেকেন্ড বল উইন করলেন মোরছালিন। হামজা আসার আগে এই সেকেন্ড বল উইন করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আমাদের কাছে জিপিএ পূর্ববর্তী যুগে বোর্ড স্ট্যান্ড করার মতো কঠিন ব্যাপার।
সেই বলটি মোরছালিন ওয়ান টাচেই রাকিবকে পৌঁছে দেন। তখন মোরছালিনের পেছনে ভারতের ছয়জন খেলোয়াড়। সামনে গোলকিপারসহ আরও পাঁচজন। গোলকিপার বাদ দিলে চারজনকে ঠিক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো নিজের দিকে টেনে নেন রাকিব। নিজের অবস্থান থেকে ভারতের গোলমুখে দৌড় শুরু করলেন মোরসালিন (মোরসালিনের ভাষায়, বল পাইলেও পাইতে পারি)। গতিতে ভারতীয় সবাইকে পেছনে ফেললেন। এই পর্যন্ত বাংলাদেশের ফুটবলে ধূমকেতুর মতো হলেও দেখা যায়। কিন্তু এর পরে যা ঘটল তা বাংলাদেশের ফুটবলে দেখা যায় না বললেই চলে।
বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা কোনো ফুটবলার গুরপ্রীত সিংয়ের মতো এশিয়ান পর্যায়ের গোলকিপার আর সন্দেশ ঝিঙ্গানের মতো এশিয়ান পর্যায়ের মধ্যে থেকে ছোঁ মেরে বলে টোকা দিয়ে জালে পাঠিয়ে দেবেন, এটা দেখলে চোখ কচলাতে হয়। মোরছালিন সেই কাজটাই করতে পেরেছেন বলে দুর্দান্ত সফল একটা কাউন্টার অ্যাটাকের গল্প নিয়ে লিখতে বসা।
হংকং ও ভারতের ম্যাচ সামনে রেখে বাংলাদেশ দল যে দুটি কাউন্টার অ্যাটাক প্যাটার্ন অনুশীলন করেছিল, তার প্রথমটিই নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করেছে দল। এর প্রথমটা ফাঁকা জায়গায় বল নিয়ে দৌড়াবেন রাকিব, বক্সে দৌড়াবেন মোরসালিন, ফাহিম বা অন্য কেউ। প্রথম পরিকল্পনাতেই সফল বাংলাদেশ।
ভারতের থ্রো ইন ও কর্নার কিকে শক্তির কথা জেনেই কোচিং স্টাফের পরিকল্পনায় ছিল বক্স ডিফেন্স। সুনীল ছেত্রীকে (যদিও সুনীল ছেত্রী দলে ছিলেন না) বক্সে সরাসরি মার্ক করা যায় না বলে নিজেদের বক্সে খেলোয়াড় বাড়ানো প্রথম লক্ষ্য ছিল। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় বাংলাদেশের অর্ধে চলে আসবে। আর সেখানে বল উইন করার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক। মঙ্গলবার তারই মঞ্চস্থ হয়েছে জাতীয় স্টেডিয়ামে।
লেখক: জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার
- বিষয় :
- বাংলাদেশ-ভারত
- শেখ মোরছালিন