ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

টানাপোড়েনে অস্থির ক্রিকেট বিপিএল ম্যাচ হলোই না

এই এক জীবনে ক্রিকেটে এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখিনি : আকরাম খান সাবেক অধিনায়ক

টানাপোড়েনে অস্থির ক্রিকেট বিপিএল ম্যাচ হলোই না
×

আকরাম খান সাবেক অধিনায়ক

 ক্রীড়া প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিসিবির সঙ্গে ক্রিকেটারদের টানাপোড়েনে মাঠে গড়ায়নি বিপিএলের ম্যাচ। গাঁটের পয়সা খরচ করে টিকিট কেটে ম্যাচ দেখতে এসে সমর্থকদের ফিরে যেতে হয়েছে খালি মাঠ দেখে। প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর লাঠিচার্জেরও শিকার হয়েছেন কেউ কেউ। এত কিছুর পরও গতকাল বৃহস্পতিবার বিপিএলের খেলা মাঠে ফেরাতে পারেনি বিসিবি।

তবে আজ থেকে আবার শুরু হচ্ছে বিপিএল। যে দুটি ম্যাচ ক্রিকেটাররা বয়কট করেছিলেন, তা শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান। গুলশানের নাভানা টাওয়ারে বিসিবি কার্যালয়ে কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুনকে সঙ্গে নিয়ে গতকাল রাতে সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন তিনি।

ফ্র্যাঞ্চাইজি বিসিবির সভায় বৃহস্পতিবার বাতিল হওয়া ম্যাচ দুটির পয়েন্ট ভাগাভাগি করার প্রস্তাব করা হয়। গভর্নিং কাউন্সিলের এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি দলগুলো। ফলে ঢাকা পর্বের সব ম্যাচই হবে। এদিকে কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুনকে দেশ-বিদেশ থেকে ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন কে বা কারা।

বেফাঁস মন্তব্য করায় পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম পদত্যাগ না করায় ম্যাচ বর্জন করেন ক্রিকেটাররা। ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (কোয়াব) নেতৃত্বে ক্রিকেটাররা একাট্টা হয়েছিলেন ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা সভা করে সিদ্ধান্ত নেন, বিতর্কিত পরিচালক নাজমুল পদত্যাগ না করা পর্যন্ত মাঠে ফিরবেন না তারা। সন্ধ্যায় খেলোয়াড়রা কিছুটা ছাড় দিয়ে নাজমুলকে ক্ষমা চাওয়ার শর্তে খেলায় ফিরতে রাজি হন। এ নিয়ে অফিসিয়ালি বিজ্ঞপ্তিও দেয় কোয়াব।

একটি সূত্রে জানা গেছে, নাজমুলের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়াতেও রাজি হননি বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। বিপিএলের খেলা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে রাতে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের মতামত নেওয়া হয়েছে। গুলশানের সভায় মালিকরা লিগের বাকি ম্যাচ খেলার পক্ষে বলে জানান বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করেছিলেন ক্লাব ক্যাটেগরি থেকে নির্বাচিত পরিচালক নাজমুল ইসলাম। তামিম বিশ্বকাপ খেলার ব্যাপারে ইতিবাচক কথা বলায় ফেসবুকে তাঁকে ভারতের দালাল হিসেবে অভিহিত করেন তিনি। এ নিয়ে পক্ষেবিপক্ষে জনমত তৈরি হলেও নাজমুল নিজের অবস্থান থেকে সরেননি। উল্টো বুধবার জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের হেয় করে বক্তব্য দেন গণমাধ্যমে। কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও ক্রিকেটাররা এখন পর্যন্ত কোনো ট্রফি জিততে পারেনি বলে খোঁচা দেন তিনি। এ ছাড়া খেলোয়াড়দের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেওয়া নাজমুলের বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ক্রিকেটাররা প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।

বুধবার রাতে কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন ঘোষণা দেন, পরিচালক নাজমুল ইসলাম বৃহস্পতিবার প্রথম ম্যাচের আগে পদত্যাগ না করলে খেলা বয়কট করবেন তারা। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে বিসিবির দিক থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় ক্রিকেটাররা একাট্টা হয়ে খেলা বয়কটের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। কারণ হিসেবে কোয়াব সভাপতি মিঠুন বলেন, ‘আমরা মাঠে যাব একটাই শর্তে– বিসিবি থেকে তারা যদি আপনাদের সামনে এসে কমিটমেন্ট করেন, ঠিক আছে আমরা গ্যারান্টি নিচ্ছি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই লোক থাকবে না। যদি থাকে, তখন ক্রিকেটাররা যে খেলা বন্ধ করবে তখন তাদের ওপর কোনো দায়ভার থাকবে না এবং সেটার সম্পূর্ণ দায়িত্ব বিসিবি নেবে। এই শর্তে আমরা আবার মাঠে ফিরতে পারি। এটা নিয়ে তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু আমরা কোনো ধরনের নিশ্চয়তা পাইনি।’
ক্রিকেটার ও বিসিবি দুই পক্ষের কেউ ছাড় না দেওয়ায় ঢাকা পর্বে বিপিএলের প্রথম দিনের ম্যাচ মাঠে গড়ায়নি। যদিও বিতর্কিত পরিচালক নাজমুলকে ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিসিবি সভাপতি নিজস্ব ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেন। এই বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বোর্ড সভাপতি। যদিও নাজমুলের এত কম শাস্তিতে খুশি হতে পারেননি ক্রিকেটাররা। এই পরিস্থিতিতে বিপিএল দ্বাদশ আসরের খেলা বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাতে গুলশানে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল কার্যালেয় ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন বিসিবি সভাপতি। গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু জানান, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা বিপিএলের বাকি ম্যাচগুলো খেলার পক্ষে। সব পক্ষ মিল হলে আজ থেকে বিপিএলের ঢাকা পর্বের খেলা মাঠে গড়াতে পারে।

বিসিবিতে শৃঙ্খলা নেই: আকরাম
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) শৃঙ্খলা নেই বলে মনে করেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান। তাঁর দাবি কয়েকজন পরিচালক ইচ্ছেমতো কথা বলছেন মিডিয়াতে। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলকেও ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন তারা। পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম ক্রিকেটারদের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনকে দম্ভ হিসেবে দেখেন আকরাম খান। তিনি ক্রিকেটারদের মাঠের খেলায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।

২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন বিসিবি পরিচালক। এই একজীবনে ক্রিকেটে এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখেননি জানিয়ে আকরাম বলেন, ‘দেশের চেয়েও বিদেশে অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে নেতিবাচক খবরগুলো। এটা দেশের অনেক বড় ক্ষতি। গত ১০-১৫ দিনে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেটা খুবই দুঃখজনক। সবাই সবার কথা চিন্তা করছে। কেউই বাংলাদেশের ক্রিকেটের কথা ভাবছে না। সবাইকে আমি একটাই কথা বলতে চাই– একে অন্যকে সম্মান করুন। কে কী বলতে পারবে, কে কী বলতে পারবে না, সেটাও ঠিক করতে হবে। যে কোনো বড় সিদ্ধান্তে কথা বলবেন বিসিবি সভাপতি। এর ব্যত্যয় হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। খেলোয়াড়দের ব্যাপারেও আমি একই কথা বলতে চাই।’

ক্রীড়া উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কেন: তুষার
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষারের মতে, বিসিবির একজন পরিচালক কীভাবে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করবেন? সেদিন যদি তামিমকে দালাল বলার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত, তাহলে হয়তো আজকে এমন কিছু দেখতে হতো না।

তুষার বলেন, ‘আসলে বোর্ড ক্রিকেটারদের সম্মান দিতে জানে না। মাশরাফিকে তারা সম্মানজনক বিদায় দিতে পারেনি। সাকিবকে অপমান করেছে, তাকে খেলতে দেওয়া হয়নি। যাদের ক্রিকেট দিয়ে তারা চলে, যাদের ম্যাচ টিভি রাইটস বিক্রি করে চলে, তাদেরকেই একের পর এক অপমান করে চলেছে বিসিবি।’
বিসিবিতে রাজনীতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। সেখানে রাজনীতি আগেও ছিল। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পর রাজনীতি থেকে বের হতে পারেননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিসিবি একটি স্বাধীন ক্রীড়া সংস্থা, সেখানে বিসিবির কর্তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে ক্রীড়া উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কেন? বিসিবি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এখন যারা বোর্ডে আছেন, তারা সেই নির্বাচনের মাধ্যমেই এসেছেন। এখন যে বিশ্বকাপের ভেন্যু বদল নিয়ে আইসিসির সঙ্গে আমরা লড়াই করছি, আমাদের কি সেই সক্ষমতা আছে? বাস্তবতা বুঝতে হবে, ক্রিকেট কিন্তু এক দিনের না। বিশ্বকাপের পরও ক্রিকেট থাকবে। ভবিষ্যতের কথাও চিন্তা করে আলোচনা করতে হবে।’

 

আরও পড়ুন

×