র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতিতে চোখ ডুলির
থমাস ডুলি
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ১২:৫০
ক্রিস কোলম্যান বাদ পড়ার পর আলোচনায় উঠে আসে থমাস ডুলির নাম। জার্মান বংশোদ্ভূত ৬৫ বছর বয়সী এ কোচের সঙ্গে আলোচনা সফল হয় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের। তাই শুক্রবার সকালে ডুলি ঢাকায় নামার কিছুক্ষণ পর বাফুফে থেকে আসে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। হামজা চৌধুরী-শমিত সোমদের নতুন কোচ ডুলি। হ্যাভিয়ের ক্যাবরেরার পর এবার বাংলাদেশের ডাগ আউটে দাঁড়াবেন তিনি।
দুই বছরের জন্য বাংলাদেশ দলের কোচ হয়ে এসেছেন তিনি। ৫ জুন সান মারিনোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের জন্য আগামীকাল রোববার থেকে ক্যাম্প শুরুর কথা বাংলাদেশ দলের। তখন থেকেই দল নিয়ে প্রস্তুতিতে নেমে পড়বেন ডুলি। তাঁর প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশকে এশিয়ান কাপে নিয়ে যাওয়া, ‘ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশকে (এশিয়ান কাপে নিতে) সফল করতে আমি আশাবাদী। এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
ক্যাবরেরার অধীনে দুবার এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব খেলেছে বাংলাদেশ। মূলপর্বে খেলার স্বাদ পায়নি। এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ সর্বশেষ খেলেছিল ১৯৮০ সালে। এরপর নারী দল এশিয়ান কাপে খেললেও ছেলেদের দল আর পারেনি। সেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলতেই বাংলাদেশে এসেছেন বলে জানান ডুলি।
আর ফুটবল নিয়ে নিজের দর্শন ও ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি, ‘আমার বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হলো, দলকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে তারা সুন্দর ফুটবল খেলে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। আমি সুন্দর ফুটবল খেলতে পছন্দ করি। বলের পেছনে অকারণে ছুটে বেড়ানো বা চেজিং ফুটবল আমার পছন্দ নয়। বল পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু শুধু দৌড়ানোর কোনো মানে হয় না।’
বর্তমানে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে পেছনের সারিতে থাকা বাংলাদেশ দলকে এক বছরের মধ্যে ১৫০ থেকে ১৬০-এর মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্য জানালেন ডুলি, ‘যে কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বাস্তববাদী হতে হবে। ১৬০ বা ১৫০ র্যাঙ্কিংয়ে যাওয়া সম্ভব, তবে তা রাতারাতি হবে না। এটি একটি প্রক্রিয়া। আগামী এক বছরের মধ্যে এটি অর্জন করা যেতে পারে।’ গত ২৩ বছর ধরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি জিততে না পারা বাংলাদেশকে এই স্বাদ দিতে চান তিনি, ‘গত ২৩ বছর ধরে আমরা কিছুই জিতিনি। এখন সময় এসেছে সেটা বদলানোর।’
সাফল্যের জন্য খেলোয়াড়দের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন এই কোচ। নিজের লেখা বই ‘দ্য ট্রুথ অ্যাবাউট সাকসেস ইন সকার’-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সাফল্যের চারটি স্তম্ভ রয়েছে, যার অন্যতম হলো মানসিকতা। মানসিকতা বদলানো মানে আপনার চিন্তাধারার পরিবর্তন। চ্যাম্পিয়ন হতে হলে জীবনে অনেক কিছু বিসর্জন দিতে হয় এবং কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। আমি আমার খেলোয়াড়দের এই বিষয়টাই বোঝাতে চাই।’
বাংলাদেশের দর্শকদের ফুটবল উন্মাদনা এবং তাদের প্রত্যাশার চাপ সম্পর্কেও আগে থেকেই সচেতন ডুলি। এশিয়ায় এর আগে ফিলিপাইন জাতীয় দল এবং মালয়েশিয়ায় কাজ করার সুবাদে এই অঞ্চলের ফুটবল সংস্কৃতি তাঁর বেশ চেনা। দক্ষিণ আমেরিকায় কাজ করলেও তাঁর স্বপ্ন ছিল আবার এশিয়ায় ফেরা। দর্শকদের চাপ ও সমালোচনা নেওয়ার বিষয়ে তিনি প্রস্তুত কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে ডুলি মজার ছলে বলেন, ‘আমি জার্মানি থেকে এসেছি, সেখানেও একই অবস্থা। বাংলাদেশে সম্ভবত এক মিলিয়ন কোচ আছেন, যারা ফুটবলের সবকিছু বোঝেন। এটা ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে।’
৬৫ বছর বয়সী কোচ ডুলির জার্মানিতে জন্ম হলেও আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে। ৯ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দুটি বিশ্বকাপও খেলেছেন তিনি। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া বিশ্ব আসরে স্বাগতিকদের হয়ে সব কটি ম্যাচ খেলেছিলেন। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে তো অধিনায়ক হয়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশটির হয়ে ৮১ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন সাতটি। মূলত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন তিনি। ক্লাব ফুটবলে খেলেছেন বেয়ার লেভারকুসেন, শালকের মতো ক্লাবে। শালকের হয়ে জিতেছেন উয়েফা কাপ। বুন্দেসলিগা শিরোপা জেতেন এফসি কাইজারস্নাউটার্নের জার্সিতে।
কোচিং ক্যারিয়ারও বেশ সমৃদ্ধ তাঁর। ২০১১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ক্লিন্সম্যানের সহকারীর ভূমিকায় ছিলেন। এরপর ফিলিপাইনের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন দেশটির দায়িত্বে। কাজ করেছেন ভিয়েতনামেও। দেশটির ভি-লিগের ক্লাব ভিয়েত্তেলের স্পোর্টিং ডিরেক্টর পদে ছিলেন বছরখানেক। দুই বছর পর ২০২২ সালে আবারও ফিলিপাইনের দায়িত্বে ফেরেন তিনি। দলকে নিয়ে যান প্রথমবার এশিয়ান কাপে।
থমাস ডুলিকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারাও। গতকাল বাফুফের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, একটি দল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দক্ষ ডুলি এবং এশিয়ার ফুটবলের বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও সমর্থকদের আবেগ সম্পর্কে তাঁর রয়েছে গভীর ধারণা। বাফুফে মনে করে বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলারদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় দলকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও সফল এক দলে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েই এবার নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন ডুলি।
