ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

ডেলিভারি বয় যখন বিশ্বকাপে

ডেলিভারি বয় যখন বিশ্বকাপে
×

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ১২:২৩

পেলে, ম্যারাডোনা থেকে তেভেজ, সুয়ারেজের মতো অসংখ্য লাতিন তারকা দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো ব্রাজিলের ইগর থিয়াগোর নাম। ছোটবেলায় বাবা হারানো এই ফরোয়ার্ড পরিবারের জন্য রাজমিস্ত্রী, বিক্রয়কর্মী, ডেলিভারি বয়, এমনকি রাস্তায় গাড়ি মোছার কাজও করেছেন। তবে হাজার কাজের মাঝেও ফুটবল খেলা ছাড়েননি। সেই ফুটবল তাদের পরিবারের অভাব দূর করেছে। আর এখন সুযোগ পেয়েছেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে, যা ছিল ইগর থিয়াগোর আজন্ম লালিত স্বপ্ন।

থিয়াগোর ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয় ব্রাজিলের সীমান্তবর্তী পারানা রাজ্যে। সেখান থেকে ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব ক্রুজিরোতে। বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগের দল ব্রেন্টফোর্ডে। আগামী মাসে বিশ্বকাপ মাতানোর স্বপ্ন দেখছেন কার্লো আনচেলত্তির দলে সুযোগ পাওয়া এই ফরোয়ার্ড। ব্রাজিলের আর দশজনের মতোই ছোট্টবেলা থেকে ফুটবলের সঙ্গে প্রেম ছিল ইগর থিয়াগোর। বাড়ির আঙিনা, রাস্তায় সুযোগ পেলেই ফুটবল নিয়ে মেতে উঠতেন তিনি। ভালো খেলতেন বলে নিজ মহল্লায় একটা পরিচিতিও ছিল। সেই সূত্র ধরেই গ্রেমিও ওসিদেন্তালে এনজিওদের সামাজিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে সুযোগ পান তিনি। ১৩ বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যায়। সংসারের দায়িত্ব এসে চাপে তাঁর মায়ের কাঁধে। তখন মাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করার জন্য ফুটবল অনুশীলন ও ম্যাচের ফাঁকে যেই কাজ সামনে পেতেন, সেই কাজই মনোযোগ দিয়ে করতেন।

সেই এনজিওর প্রজেক্টে ফুটবল খেলার সময় সাও পাওলোর সাবেক ফুটবলার টিকোর নজরে পড়েন থিয়াগো। টিকো তাঁকে পারানা রাজ্যের ছোট ক্লাব ভেরেতে পাঠান। পরিবার ছেড়ে সেখানে যাওয়াটাই ছিল থিয়াগোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে মা ও ছোট ভাইকে উন্নত জীবন দিতে কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন তিনি। সেই সময়টা এখনও তাঁর স্মৃতিতে তরতাজা, ‘একেবারে শিশু বয়সে আমি মার্কেটে কাজ শুরু করি। রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতাম। বেশি কাজ করতাম মার্কেটের একটি ফলের দোকানে। সেখানে বিক্রমকর্মী হিসেবে কাজ করতাম। মাঝেমধ্যে মানুষের বাড়িতে ফল ডেলিভারি দিয়ে আসতাম। হাতে কাজ না থাকলে গাড়ি ধোয়ামোছাও করতাম, এমনকি ক্লিনারের কাজও করেছি। সামনে যা পেতাম, তাই করতাম। তবে এই কাজগুলোই আজকের আমাকে তৈরি করেছে, চরিত্র গঠনে ভূমিকা রেখেছে, জীবনের জিনিসগুলোকে মূল্য দিতে শিখিয়েছে, অনেক ছোট জিনিসও যে জীবনে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বুঝতে শিখিয়েছে। সে সঙ্গে শিখিয়েছে জীবনকে উপভোগ করতে।’

ভেরে ফুটবল ক্লাবে থিয়াগোর শুরুটা হয় দারুণ। ২০১৮ সালে পারানা রাজ্য অনূর্ধ্ব-১৭ আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। সুযোগ পেয়ে যান ক্লাবের অনূর্ধ্ব-২০ দলে। সেখানে খেলার সময় ব্রাজিলের অন্যতম নামি ক্লাব ক্রুজিরোর স্কাউটদের নজরে পড়েন। ক্রুজিরোর সঙ্গে যখন জীবনের প্রথম পেশাদার চুক্তি স্বাক্ষর করেন, স্বপ্নগুলো তখন ডালপালা মেলতে শুরু করে। তবে ব্রাজিলের অন্যতম সেরা এই ক্লাবে মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখেছেন তিনি। সেখানে মানসিক চাপে পড়ে যান। মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। ক্লাব তাঁর কাছে চাইত বেশি বেশি গোল, আর ১৭ বছরের থিয়াগোর বাড়ির জন্য মন আনচান করত। 

পারানা নদীর তীরে বন-পাহাড়ঘেরা প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা ছেলেটি বেলো হরিজন্তের শহুরে জীবনে মানসিক অস্থিরতায় পড়ে যান। ধীরে ধীরে সমালোচনা, প্রশংসা ইত্যাদির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শুরু করেন। আত্মবিশ্বাসও ফিরে পেতে শুরু করেন। ফলে গোলও আসতে থাকে। এরই মধ্যে বুলগেরিয়ার ক্লাব লুডুগেরেটস ১.৪৭ মিলিয়ন ডলার দিয়ে তাঁকে কিনে নেয়। সেখান থেকে বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুজ হয়ে ২০২৪ সালে ৪১ মিলিয়ন ডলারে ইংল্যান্ডের ব্রেন্টফোর্ডে নাম লেখান ইগর থিয়াগো। প্রিমিয়ার লিগে নিজের দ্বিতীয় মৌসুমে ২২ গোল করেছেন। আর্লিং হালান্ডের ২৬ গোলের পর তিনি চলতি মৌসুমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। এরই মধ্যে গত মার্চে ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন। হলুদ জার্সিতে দুই ম্যাচে এক গোল করেছেন তিনি। এখন স্বপ্ন দেখছেন বিশ্বকাপ মাতানোর।

আরও পড়ুন

×