বিশ্বকাপ ফুটবল
আর্জেন্টিনার সৌভাগ্যের প্রতীক ‘এল তুলা’
৫৬ বছরের পুরোনো ‘বম্বো’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন আর্জেন্টিনার সমর্থক সিরো -এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৮:২৫ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
উন্তোস ওতরা ভেজু বিশাল বোর্ড আর্জেন্টিনা টিম হোটেলের গায়ে। কৌতূহলী মন স্প্যানিশের বঙ্গানুবাদ করতে ব্যর্থ হলে হাসিমুখেই এগিয়ে আসেন বছর উনিশের সিরো গঞ্জালেজ। ‘আমরা আবার একসঙ্গে’– প্রথমত, বাংলাদেশি শুনেই বুকে জড়িয়ে ধরা তাঁর। বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা বাংলাদেশে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কথা তাঁর জানা। তাঁর কথায়, আমরা আবার সবাই একসঙ্গে হয়েছি সোনার গোলকটি ধরে রাখতে। এই ‘আমরা’র সঙ্গে তিনি তাঁর হাতের ড্রামটাকেও যেমন রাখতে চান, তেমনি বাংলাদেশকেও রাখতে চান। বলতে থাকেন সিরো, ‘দেখো, এবারও আমরাই জিতব বিশ্বকাপ। অনেক কষ্ট করে এল তিতোর এই বম্বোটা নিয়ে এসেছি। আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই।’
যেখানে মেসি আছেন, লাউতারো ফর্মে– সেখানে এই ঢোল কীভাবে বিশ্বকাপ রেখে দেবে আর্জেন্টিনার কাছে? পাশে দাঁড়ানো বছর পঞ্চাশের পলিস্তিন বলতে থাকেন তাঁর ভাষায়। চামড়া থেকে সিনথেটিক পোশাক বদলিয়ে ৫৬ বছরের পুরোনো এই বাদ্যযন্ত্রটি আজকের এই চেহারায়। একদিকে আর্জেন্টিনার পাতাকা, অন্যদিকে ম্যারাডোনা-মেসির ছবি। আর্জেন্টিনার তিন-তিনটি বিশ্বকাপে (১৯৭৮, ১৯৮৬ আর ২০২২) সাক্ষী থেকেছে এই ‘বম্বো’। এ নিছক আর চার-পাঁচটা বাদ্যযন্ত্র নয়, এ হলো আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতির পরম পবিত্র দলিল। কিংবদন্তি সমর্থক কার্লোস পাসকুয়াল, যাঁকে লাতিন ফুটবলে লোকে ‘এল তুলা’ বলে চেনেন, সেই তুলার ঢোল। দুই বছর হলো ৮৩ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন; কিন্তু মৃত্যুর বেশ কিছু মাস আগে বন্ধুদের কাছে বলে গিয়েছিলেন– তিনি না থাকলেও যেন তাঁর এই বম্বোটা থাকে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে। কথা রেখেছেন সিরোর মতো তাঁর অনুরাগীরা। বুয়েন্স আয়ার্সের লোমাস দে জামেরায় তিতোর পারিবারিক সিন্দুক থেকে সৌভাগ্যের প্রতীক এই বম্বোটি নিয়ে এসেছেন।
১৯৭১ সালে স্পেনে নির্বাসিত থাকার সময় আর্জেন্টিনার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান দোমিঙ্গো পেরোন নিজে এল তুলাকে এই ড্রাম উপহার দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে এল তুলা প্রথম যখন এই ড্রাম গ্যালারিতে নিয়ে যান, তখনও গ্যালারিতে এই ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানোর সংস্কৃতি ছিল না। শেষবার কাতার বিশ্বকাপেও হুইলচেয়ারে বসে এই ড্রামের তালেই গ্যালারিকে নাচিয়েছিলেন। ম্যারাডোনা থেকে পোপ ফ্রান্সিস– প্রত্যেকের হাতের ছোঁয়ায় আশীর্বাদ পেয়েছে এই ‘এল তুলো’। এই বাদ্যযন্ত্রটি এল তুলা নিজে ভাটিকান সিটিতে নিয়ে গিয়েছিলেন পোপের কাছে। প্রতিবার বিশ্বকাপের আগেই নাকি তিনি এই সৌভাগ্যের যন্ত্রটি নিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন। ১৯৭৪ থেকে ২০২২– ১৩টি বিশ্বকাপের প্রতিটিতে আর্জেন্টিনার ম্যাচে গ্যালারিতে থাকতেন। তাঁর এই আবেগ আর ভালোবাসা দেখে ফিফা এল তুলাকে বছর চারেক আগে প্যারিসের এক অনুষ্ঠানে ‘দ্য বেস্ট ফ্যানস অ্যাওয়ার্ড’ দিয়েছিল।
তবে তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর নাতি-নাতনিরা নাকি প্রথমে এই ড্রাম দিতে রাজি হননি সিরোর কাছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া সিরো আরও কয়েকজন মিলে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রাণপুরুষের শেষ ইচ্ছা পূরণ করার চেষ্টায় লেগে থাকেন। ‘সৌভাগ্যের প্রতীক এই বম্বোটি। শুরুতে তাঁর পরিবার এটি দিতে রাজি হননি। পরে আমরা একটা স্পন্সরের চেষ্টা করি। শেষ পর্যন্ত উবারু আমাদের পাশে দাঁড়ায়। তাদের সহযোগিতায় ফের এই বাদ্যযন্ত্র আমরা যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসতে পেরেছি’– ড্রামটির গায়ে আলতো করে ছুঁয়ে বলতে থাকেন সিরো, যেন এটাই তাঁর বিশ্বকাপ ট্রফি।
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল
- আর্জেন্টিনা
- আলজেরিয়া
