ব্রাজিলের এক চিলতে রোদ কুনিয়া
ছবি-ফুটমব
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৫
সূর্য যেন এখানটাই একটু বেশিই মন খোলা, রাত ৮টা অবধি রোদ থাকে তার। ভোরের আলো ৫টায় ফের তার ডিউটি শুরু। চাঁদ এখানে বড্ড বেশি অলস, আর তাই তার জ্যোৎস্না নিয়ে রোমান্টিকতা তাই আমেরিকানদের মধ্যে খুব একা নেই। তবে শুক্রবার ফিলাডেলফিয়ার আকাশ যেন বাধ্য করল সবার চোখ তার দিকে টানতে, সেখানে জ্যেৎস্না ছিল এক মাথেউস কুনিয়া। হাইতির বিপক্ষে যার পায়ের জোড়া গোলে অমাবস্যা কেটে যায় ব্রাজিলের। কুনিয়ার রাজকীয় ছটায় ধরা পড়ে বিশ্বকাপে মেঘে ঢাকা এক ব্রাজিলের ছবি। হাইতিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ বত্রিশের রাউন্ড নিশ্চিত করে সেলেসাওরা। সেই সঙ্গে গ্রুপসেরা হওয়ার আাত্মবিশ্বাসটাও বাড়িয়ে নেন কার্লো আনচেলত্তির ছাত্ররা।
নেইমার নেই, চোট পেয়ে ম্যাচ থেকে উঠে যান রাফিনিয়া– এমন একটা মনখারাপের সন্ধ্যায় র্যাঙ্কিংয়ের প্রায় আশি ধাপ পিছিয়ে থাকা প্রতিপক্ষের সঙ্গে জয় নিয়ে দুশ্চিন্তাটা ছিল না বটে, তবে গোলসংখ্যা বাড়ানোর একটা পিছু ধাওয়াতো ছিলই। সেখানেই কিনা আনচেলত্তি তাঁর হাতে লুকিয়ে রাখা ট্রাম্প কার্ড বের করেন। মাথেউস কুনিয়া। যে কিনা দেশের হয়ে ২৩ ম্যাচ খেলে মাত্র একটি গোল করেছেন, তাকে নাম্বার নাইন পজিশনে পাঠিয়ে দেওয়া। তাঁকে ইগর থিয়াগোর মতো ফর্মে থাকা স্ট্রাইকারকে বসিয়ে নামিয়ে দেওয়া– যে কোনো কোচের চাকরি যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু কার্লো জানতেন, হাইতির মতো দলগুলো যখন ‘হাই-লাইন ডিফেন্স’ (মাঠের ওপরের দিকে রক্ষণ তোলা) খেলে, তখন বক্সের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা প্রথাগত ৯ নম্বরের চেয়ে এমন একজন ফরোয়ার্ড দরকার, যার গতি চিতার মতো আর উইংয়ে নেমে এসে স্পেস তৈরি করার ক্ষমতা অসামান্য।
কুনিয়া ঠিক সেই কাজটাই করলেন। তিনি শুধু দুটি গোলই করলেন না, নিজের মুভমেন্ট দিয়ে হাইতির রক্ষণভাগকে টেনে-হিঁচড়ে এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন, ভিনিসিয়ুস আর পাকেতারা ওড়ার জন্য পুরো আকাশটাই ফাঁকা পেয়ে গেলেন। কুনিয়ার এই ‘ফলস নাইন’ ও উইঙ্গারদের ড্রপ করার রসায়নটাই ছিল আনচেলত্তির আসল বাজি। ম্যাচ শেষে কার্লোর সেই চেনা বাঁ-দিকের ভ্রুটা যখন ওপরে উঠল, তখন যেন তিনি অলক্ষ্যেই সমালোচকদের বলে গেলেন ‘বাজির ঘোড়া চিনতে কার্লো আনচেলত্তি ভুল করে না!’
গেল কয়েকটি বিশ্বকাপে মাঠের ঠিক এই পজিশনটা নিয়েই ভুগছিল ব্রাজিল। রোনালদো নাজারিওর পর সেভাবে আর এই পজিশনে কোনো আস্থা পাইনি সেলেসাওরা ২০০৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত রোনালদোকে দেখেছিল সমর্থকরা। এরপর আসেন ফ্যাবিয়ানো, তিনটি গোল করেছিলেন সেবার তিনি। তবে তাতেও শেষ আট পেরোতে পারেনি দল। ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এই বিখ্যাত ৯ নম্বর জার্সিতে নাম লেখা ছিল– ফ্রেড। পুরো আসরে মাত্র একটি গোল। এই নামটি ভীষণভাবে ভুলে থাকতে চান সমর্থকরা। ২০১৮ বিশ্বকাপে তিতের ব্রাজিল নতুন ঘরানার জন্ম দিয়ে গ্যাব্রিয়েল জেসুসকে মাঠের ওপর থেকে নিচে নামিয়ে খেলাতে থাকেন কোচ। কিন্তু সেবার গোলশূন্য থাকে ব্রাজিলের নাম্বার নাইন। রাশিয়াতে গত বিশ্বকাপে বরং রিচার্লিসন গোলের মুখ খুলেছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে তাঁর চোটে পড়াটাই বড় ধাক্কা দিয়েছিল দলকে। এবার সেই পজিশনেই আনচেলত্তির বাজি কুনিয়াকে নিয়ে।
ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জোয়াও পেসোয়া শহরের এক চিলতে ধুলোবালি মাখা মাঠ থেকে উঠে আসা সেই ছেলেটা– যার নিজের ঘরে বসে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ দেখার মতো একটা সস্তার স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল পর্যন্ত ছিল না! প্রতি শনি আর রবিবার বিশ্বসেরাদের খেলা দেখার জন্য তীব্র আকুতি বুকে নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে যে ছেলেটা দাদির ড্রয়িংরুমে গিয়ে ভিড় করত, আজ সে নিজেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পোস্টার বয়!
তবে লড়াইটা শুধু টিভির অভাবের ছিল না, ছিল এক চরম একাকিত্ব আর বুকভাঙা যন্ত্রণার। মাত্র ১৪ বছর বয়সে যখন সমবয়সী ছেলেরা মায়ের আঁচল ধরে বায়না করে, তখন ঘর ছেড়ে প্রায় ২০০০ মাইল দূরে করিতিবা ক্লাবের ক্যাম্পে চলে যান একা থাকতে। সেই ট্রমার ওপর আবার নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস– ছোট্ট ওই বয়সেই পরপর দুই বছরে একবার পা এবং একবার হাত ভেঙে ছিটকে যান মাঠ থেকে। পরিবার ছাড়া, চোটের ব্যথায় একা এক হোস্টেলের ঘরে শুয়ে কত রাত যে কেঁদেছেন কুনিয়া, তাঁর হিসাব কেবল তিনিই জানেন।
অথচ কুনিয়ার বাবা কারমেলো ছিলেন একজন কেমিস্ট, ফুটবলের রুক্ষ ব্যাকরণ তিনি বুঝতেন না। কিন্তু ছেলের মাথায় হাত দিয়ে সেদিন তিনি এমন এক অমর বাণী দিয়েছিলেন, যা কুনহার পুরো জীবনটাই বদলে দেয়। বাবা বলেছিলেন, “ফুটবল খেলো আপত্তি নেই বাবা, কিন্তু মনে রেখো—পা তো যেকোনো সময় অকেজো হতে পারে, কিন্তু মস্তিষ্ক আজীবন থেকে যায়।”
বাবার কথাটিই বোধ হয় তাঁর হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছেন। তাই হাইতির বিপক্ষে দুটি গোলে শুধু তাঁর পা নয়, মাথাও ছিল ভীষণভাবে পরিষ্কার। ডি বক্সের মধ্যে ডিফেন্ডারদের চোখের পলক ফেলার সুযোগ না দিয়ে, ছিটকে আসা বলটিতে নিখুঁত এক ট্যাপ-ইন করে বল জড়িয়ে দিলেন জালে। প্রথম ম্যাচের সমস্ত গুমোট মেঘ কেটে ফিলাডেলফিয়ার আকাশে তখন কেবলই স্বস্তির আলো। ৩৬ মিনিটে ভিনির বাড়ানো সেই রক্ষণচেরা মাপা পাস যখন কুনিয়ার পায়ে পৌঁছাল, হাইতির ডিফেন্ডাররা তখনও পজিশন সামলাতে ব্যস্ত। কিন্তু কুনিয়া সময় নষ্ট করেননি; ডান পায়ের এক দুর্দান্ত এবং গতিময় বুলেটে বল পাঠিয়ে দিলেন একদম টপ কর্নারে। গোলরক্ষকের ডাইভ দেওয়ার সাধ্য ছিল না। ২-০! আর এই গোলের পরেই কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে শুরু হলো কুনিয়া-ভিনি-পাকেতার সেই উন্মাতাল ‘সাম্বা-পাঙ্ক’ কার্নিভাল।
এবারের বিশ্বকাপে যার শুরু হয়েছে মাত্র, আর এই কার্নিভালে শিগগিরই দেখা যাবে নেইমারকে। তখন আমেরিকার ‘চাঁদ’ নয় সূর্য হয়েই ধরা দিতে পারে এই ব্রাজিল।
- বিষয় :
- ব্রাজিল
- বিশ্বকাপ ফুটবল
