স্টিফেনে কানাডার ইতিহাস
সাখাওয়াত হোসেন জয়
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ১১:০৫
যেন সিনেমার কোনো গল্প। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বদলে যায় দৃশ্যপট। লস অ্যাঞ্জেলেসে ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল, তখনই রং বদলে দেন স্টিফেন ইউস্তাকিউ। বক্সের বাইরে থেকে তাঁর বুলেটগতির শট জালে জড়াতেই পাগলের মতো ছুটতে থাকেন কানাডার ফুটবলাররা। পুরো স্টেডিয়ামে তখন দুই রকমের প্রতিচ্ছবি। স্বপ্নপূরণের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন কানাডার খেলোয়াড়রা। বিপরীতে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় টিম দক্ষিণ আফ্রিকা। স্বপ্নপূরণের নায়ক স্টিফেনকে ঘিরে সতীর্থদের উদযাপনের দৃশ্যটি কানাডার ফুটবলের পালে লাগে হাওয়া। রোববার রাতে বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোতে উঠেছে কানাডা।
অধিকাংশ সময় বল দখলে রেখে, পাল্টা আক্রমণনির্ভর ফুটবল খেলে দক্ষিণ আফ্রিকা। রক্ষণ জমাট হওয়ায় এবং পোস্টে রনওয়েন উইলিয়ামসের মতো বিশ্বস্ত একজন থাকায় হয়তো অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকারে ম্যাচ টেনে নেওয়ার আশায় ছিল দলটি; তাদের সেই আশা ভেঙে দিলেন ইউস্তাকিউ। পুরো ম্যাচে গোলের জন্য ১২টি শট নিয়ে সাতটি লক্ষ্যে রাখতে পারে জেসি মার্শের দল। দক্ষিণ আফ্রিকার ছয় শটের একটিই লক্ষ্যে ছিল। কানাডার ঐতিহাসিক সাফল্যের রূপকার স্টিফেন।
অথচ ২৯ বছর বয়সী এ মিডফিল্ডারের সাফল্যের গল্পের পেছনে রয়েছে ট্র্যাজেডি। এক বছরের ব্যবধানে হারান বাবা এবং মাকে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে পোর্তোর হয়ে সান্তা ক্লারার বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালীন ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর মা এসমেরালদা। ঠিক এক বছর পর হৃদ্রোগে বাবাকেও হারান তিনি। যাদের কারণে ফুটবলার হয়েছেন সেই বাবা-মাকে হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন স্টিফেন। তবে সময়ের সঙ্গে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই কানাডা পৌঁছে গেছে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে।
ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায় ইউস্তাকিওকে, ‘আমি যা কিছু করি, সবকিছু আমার পরিবারের জন্য। আমার বাবা-মা, আমার প্রেমিকা, আমার মেয়ে, আমার ভাই এবং দেশের বন্ধু–সবার জন্য।’
কানাডার জয়ের নায়কের প্রশংসা ঝরেছে কোচ জেসি মার্শের কণ্ঠে, ‘অসাধারণ কিছু মানুষের এই দলে স্টিফেনের চেয়ে বেশি এই মুহূর্তের যোগ্য কাউকে আমি ভাবতে পারছি না। হয়তো এমন একটি মুহূর্তের সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য সে-ই। আমি তার জন্য সত্যিই দারুণ খুশি। আমার বিশ্বাস, কোথাও থেকে তাঁর বাবা-মা তাকিয়ে ছিলেন এবং তারা এই দৃশ্য দেখেছেন।’
ইউস্তাকিও ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন কানাডা বয়সভিত্তিক দল দিয়ে। পরে পর্তুগাল অনূর্ধ্ব-২১ দলের জার্সি গায়েও জড়িয়েছিলেন তিনি। ২০১৭-২০১৮ সাল পর্যন্ত পর্তুগালের হয়ে ৭ ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। চাইলে পর্তুগালের হয়ে জাতীয় দলের ক্যারিয়ার গড়তে পারতেন। কিন্তু স্টিফেন পুনরায় ফিরে আসেন কানাডায়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ীভাবে কানাডার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর কনকাকাফ নেশনস লিগে জাতীয় দলে অভিষেক হয় এবং ২০২১ গোল্ড কাপে করেন প্রথম আন্তর্জাতিক গোল।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ, ২০২৩ কনকাকাফ নেশনস লিগের ফাইনাল এবং পোর্তোর হয়ে ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও খেলেছেন এই মিডফিল্ডার। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়ের পর উচ্ছ্বসিত স্টিফেন, ‘এই জয়টা পাওয়ার জন্য আমরা জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছি। আমরা এই ঐতিহাসিক জয় সব কানাডিয়ানের উদ্দেশে উৎসর্গ করতে চাই।’
- বিষয় :
- কানাডা
- দক্ষিণ আফ্রিকা
- ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬
