ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

রোনালদোর শাপমোচন, মডরিচের বিদায়

রোনালদোর শাপমোচন, মডরিচের বিদায়
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৯

অলস বিকেলের চেনা ছবি–পার্কের একটা পুরোনো কাঠের বেঞ্চ, যেখানে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দুজন বুড়ো বন্ধু রোজ পাশাপাশি বসেন। নিজেদের সোনালি যৌবনের গল্প বলেন, সুখ-দুঃখের স্মৃতি ওড়ান। কিন্তু নিয়তির নিয়ম বড় বালাই। একদিন বেঞ্চের এক পাশটা শূন্য। অন্যজন একা বসে শূন্যতার সেই অমোঘ বাস্তবতাটা মুখ বুজে মেনে নিচ্ছেন। বিশ্বকাপের সেই কাঠের বেঞ্চটিতে একাই রোনালদো, মডরিচ আর আসবেন না এখানে।

পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের শেষ বাঁশিটা যখন বাজল, তখন মাঝমাঠে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লুকা মডরিচের শূন্যদৃষ্টি আসলে একটা রূপকথার যুগের অবসান ঘোষণা করছিল। তাঁর পাশেই চোয়ালশক্ত করা আরেক বন্ধুর শাপমুক্তির গল্পটাও লিখছিল! আসলে বিশ্বকাপের নকআউটে গোল না থাকার যে খামতিটা এত দিন তাঁর অতিমানবীয় ক্যারিয়ারে একটা বড়সড় দাগ হয়ে ছিল, পেনাল্টি স্পটের ওই এক শটে এক লহমায় তা ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সব সমালোচনা, সব বিতর্ক বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই বিশ্বকাপেরও আসল ভাগ্যটা আসলে নিজের পায়েই লিখছেন সেই রোনালদোই! গোল হওয়া-বাতিল হওয়ার স্নায়ুচাপ, কান্না আর স্বস্তির পরীক্ষা–সব মিলিয়ে টরন্টোতে এদিন প্রযুক্তিনির্ভর ফুটবলের চরম এক বাস্তবতার রোমাঞ্চ উপভোগ করল বিশ্বকাপ। যেখানে রাউন্ড অব থার্টি টুতে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় গেল পর্তুগাল। এই পর্বে তাদের মুখোমুখি হতে হবে ইউরোপজয়ী স্পেনের।

ম্যাচের শুরু থেকেই বাতাস যেন এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপে ভারী হয়ে উঠেছিল। এক ইঞ্চি জমিও কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ। একদিকে পর্তুগালের তরুণ তুর্কিদের গতি আর বিষাক্ত আক্রমণ, অন্য প্রান্তে ক্রোয়েশিয়ার জমাট রক্ষণের দেয়ালে ফাটল ধরানোর মরিয়া চেষ্টা। রঙ্গমঞ্চের আসল নাটকটা জমতে শুরু করে প্রথমার্ধের সেই বাতিল গোলটা দিয়ে। বল জালে জড়িয়েই যখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো তাঁর চেনা উল্লাসে মেতে ওঠেন, ঠিক তখনই ভিএআরের নিষ্ঠুর আঙুল অফসাইডের লাইনে আটকে দেয় তা। কিন্তু ট্র্যাজেডি যেন তখনও বাকি ছিল। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই পর্তুগালের খেলায় দেখা গেল এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি–অতিরিক্ত ‘রোনালদো-নির্ভরতা’। বাম প্রান্ত দিয়ে ডিফেন্স চিরে বক্সে ঢুকে নুনো মেন্ডিসের সামনে যখন নিজে শট নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ, তখন তিনিও নিজে গোল না করে রোনালদোকে পাস দিতে গিয়ে সুযোগটি নষ্ট করলেন। আর অতিমাত্রায় নিখুঁত হতে গিয়ে সেই সহজ সুযোগগুলো হেলায় হারানোর কী নির্মম খেসারত দিতে হয়, তা পর্তুগাল টের পেল ম্যাচের ৫৩ মিনিটে। রক্ষণভাগের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে চাবুকের মতো শটে গোলটি করে বসলেন ক্রোয়েশিয়ার ইভান পেরিসিচ। এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল পর্তুগিজ গ্যালারি, যেন অতিরিক্ত ভক্তি আর সুযোগ হাতছাড়া করার প্রায়শ্চিত্ত করতেই তখন পিছিয়ে পড়তে হয়েছিল সিআর সেভেনের দলকে।

তবে পর্তুগালের সেই অমানিশা কাটল ম্যাচের ৬৮ মিনিটে, এক পেনাল্টির হাত ধরে। কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে বক্সে যখন পজিশন নিচ্ছিলেন রেনাতো ভেইগা, ঠিক তখনই ক্রোয়েশিয়ার নিকোলা ভ্লাসিচ তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বক্সে ফেলে দেন। ভিএআর পরীক্ষার পর রেফারি যখন পেনাল্টির বাঁশি বাজালেন, তখন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে একটাই প্রশ্ন–ঘুচবে কি সেই আজন্ম আক্ষেপ? নিজের ক্যারিয়ারের দীর্ঘ ছয়টি বিশ্বকাপ এবং টানা আটটি নকআউট ম্যাচে গোল না পাওয়ার যে এক অদ্ভুত অভিশাপ পিছু তাড়া করছিল, ৪১ বছরের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পেনাল্টি স্পটে দাঁড়িয়ে এক লহমায় তা ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন। ডমিনিক লিভাকোভিচকে বোকা বানিয়ে বল সোজা জালে জড়াতেই স্টেডিয়ামজুড়ে আছড়ে পড়ল সেই চেনা ‘সিউউউ’ গর্জন।

কিন্তু রূপকথার তখনও বাকি ছিল। ১০৩ মিনিটে (যোগ করা সময়ের ত্রয়োদশ মিনিটে) ক্রোয়েশিয়ার ইভান পেরিসিচের বাড়ানো একটি ক্রস পর্তুগিজ ডিফেন্ডার রেনাতো ভেইগার মাথায় লেগে বক্সে ড্রপ খায়। সেখান থেকে মারিও পাশালিচ বলটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং তাঁর শরীর থেকে বল পেয়ে একদম কাছ থেকে ট্যাপ-ইন করে বল জালে জড়ান জোশকো গভার্দিওল। কিন্তু টেকনোলজির নিষ্ঠুর আতশ কাচের নিচে ধরা পড়ল–ক্রোয়েশিয়ার আক্রমণভাগের ফুটবলার সামান্য অফসাইডের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রেফারি যখন গোল বাতিলের চূড়ান্ত রায় দিলেন, তখন এক লহমায় যেন ওলটপালট হয়ে গেল দুই শিবিরের ভাগ্য! এক দল ভাসল নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার তীব্র উল্লাসে, আর অন্য দল–লুকা মডরিচ ও তাঁর ক্রোয়েশিয়া ডুবল এক অনন্ত বুকভাঙা অন্ধকারের অতলে।

ম্যাচ শেষের পর যখন চারপাশের উত্তেজনা কিছুটা থিতিয়ে এলো, তখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কণ্ঠেও ঝরে পড়ল এক অদ্ভুত স্বস্তি আর পরম শ্রদ্ধার সুর। ‘দিন শেষে আমরাই এই জয়টা পাওয়ার যোগ্য ছিলাম । লুকার সঙ্গে আমি কত শত ম্যাচ খেলেছি, আমরা প্রায় সমবয়সী। ও ফুটবলের এক চিরকালীন জীবন্ত কিংবদন্তি। মাঠেই আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বলেছি–সবকিছুর জন্য তোমাকে অভিনন্দন বন্ধু। আমি আশা করি, ক্যারিয়ারে আগামী বছরগুলোতে তুমি আরও অনেক উঁচুতে পৌঁছাবে। ওর বিপক্ষে আরও একবার খেলতে পারাটা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের।’ একচল্লিশের মহাতারকার এই প্রতিক্রিয়ায় যেন জয়ের দম্ভ নয়, বরং এক কিংবদন্তির প্রতি অন্য কিংবদন্তির নিখাদ ভালোবাসারই জয়।

আরও পড়ুন

×