কোয়ার্টারের পথ খুঁজে নেবেন এমবাপ্পে
সেকান্দার আলী
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ১০:২৪
ফরাসি ফুটবলের আকাশে যে তারার ফুল ফুটেছিল ১৯৯৮ সালে, তারই আলোর মিছিল হেঁটে চলছে মহাকালের পথে। সেখান থেকে একটি তারা ঝরে পড়ার আগেই হাত বদল হচ্ছে প্রতিনিধিত্বের ব্যাটন। প্রজন্মের উত্তরাধিকারী হিসেবে মাইকেল ওলিসেরা বিশ্বকাপ মঞ্চে খেলছেন শৈল্পিক ফুটবল। এই ফ্রান্সের মূল একাদশ আর রিজার্ভ খেলোয়াড়দের সক্ষমতার পার্থক্য পয়েন্ট শূন্য শূন্য এক। বিশ্বকাপে বাকি দলগুলোর থেকে এক ক্রোশ এগিয়ে দেখা হচ্ছে তাদের। স্বাভাবিকভাবে এমন প্রতিপক্ষ যে কোনো দলের জন্যই ভয়ংকর। কিলিয়ান এমবাপ্পেদের সঙ্গে কেউই তো পেরে ওঠেনি চলমান বিশ্বকাপে। শ্রেষ্ঠত্বের জয়গান গেয়ে উন্নীত হয়েছে সেরা ৩২-এ। ফিলাডেলফিয়ায় শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যে ম্যাচ খেলবে তাতেও জয়ের ছক কেটে রেখেছেন কোচ দিদিয়ের দেশম। খেলা শুরুর পর থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, মানু কোনো, অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি বা এনগোলা কন্তেকে দিয়ে এক একটি মাপা চাল দেবেন তিনি কিছু বোঝে ওঠার আগেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে।
গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে ম্যাচ শুরুর চার ঘণ্টা আগে হিউস্টনে উড়বে শেষ ষোলোর পতাকা। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় অ্যাটলাস সিংহ মরক্কোর মুখোমুখি হবে কানাডা। ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে মাঠে নামার আগে জেনে যাবে কে হলো তাদের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষ। মরক্কো-কানাডা আর ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে ম্যাচের দুই জয়ী দল মুখোমুখি হবে কোয়ার্টারে। কোনো সন্দেহ নেই দেশম-এমবাপ্পে জুটি বিশ্বকাপের শেষ ধাপ নিয়েও চিন্তা করে রেখেছেন। দেশম কেবল একজন ফুটবল গণিতের পণ্ডিত নন, লেখক, চিত্রকরও। কাকে কোন পজিশনে খেলালে বা কাকে কীভাবে উজ্জীবিত করলে সুফলা হবে ম্যাচ তা তো তিনি লিখে চলেছেন কবিতার ভাষায়। সেরা ৩২-এ সুইডেনকে পরাজিত করার ম্যাচে প্রথম গোলের পর এমবাপ্পেকে আলিঙ্গন করলেন, ম্যাচ শেষে জানালেন টুপিখোলা অভিবাদন। আবার প্রথম ম্যাচে উসমান দেম্বেলে গোল পাওয়ায় খুশি প্রকাশ করেছেন সংবাদ সম্মেলনে। ওলিসেকে নিয়েও তাঁকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। একটি বিশ্বকাপ দলকে কীভাবে উজ্জীবিত করতে হয় তাঁর থেকে ভালো কে জানে? তিনি নিজে বিশ্বকাপ জয়ী দলের অধিনায়ক (১৯৯৮), কোচ হিসেবেও জিতেছেন শিরোপা (২০১৮)।
কাতার বিশ্বকাপে এমবাপ্পের মতো হতাশ ছিলেন তিনিও। ওই ট্রফি পুনরুদ্ধার করতেই উত্তর আমেরিকায় বিশ্বকাপ খেলছেন তাঁরা। যাদের চোখ শিরোপায় তাঁরা প্যারাগুয়ে বাধা টপকাতে জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধা করবেন না। তবে যাদের বিপক্ষে খেলা দক্ষিণ আমেরিকার সেই দেশ প্যারাগুয়েও হেলাফেলা কোনো দল নয়। শেষ ৩২-এ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে এসেছে শেষ ষোলোয়। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনের জন্ম দেওয়া প্যারাগুয়েকে হালকাভাবে নেবে না ফ্রান্স। কোচ দেশমের মতে, ‘প্যারাগুয়ের ম্যাচটি আমি দেখেছি, তারা যা অর্জন করেছে তা কোনো দুর্ঘটনা নয়। দক্ষিণ আমেরিকার আদর্শ একটি দল তারা। মাঠের লড়াইয়ে শক্তিশালী ও অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দারুণ কিছু খেলোয়াড়ও আছে তাদের। আমি বলব, কোনো দলই ভাগ্যক্রমে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় পৌঁছায় না।’
ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে খুব বেশি ম্যাচ খেলেনি। তিনটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আর দুটি বিশ্বকাপ ম্যাচ। ফরাসিদের বিপক্ষে কোনো জয় নেই তাদের। ১৯৫৮-এর বিশ্বকাপে ৭-৩, ১৯৯৮-এর বিশ্বকাপে হেরেছে ১-০ গোলে। আর তিন প্রদর্শনী ম্যাচের প্রথম দুটিতে (২০০৮ ও ২০১৪) ড্র হয়েছে, হেরেছে শেষটিতে (২০১৮)।
ফ্রান্স শেষ ২৮ বছরে চারবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলে দুইবারের চ্যাম্পিয়ন। শেষ বিশ্বকাপেরও ফাইনালিস্ট তারা। সেখানে প্যারাগুয়ের সর্বোচ্চ সাফল্য ২০১০ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা। এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ৭-৩ গোলে বা ১৯৯৮ সালে ১-০ গোলে হারের প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহা কাজ করবে। কারণ, শক্তিশালী একটি রক্ষণভাগ রয়েছে প্যারাগুয়ের। রক্ষণশক্তি কাজে লাগিয়েই ফ্রান্সকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করবে টাইব্রেকারে। প্যারাগুয়ে কোচ গুস্তাভো আলফারোর এই কৌশল ভণ্ডুল করতে দিদিয়ের দেশমও নতুন ছক এঁকেছেন। ৪-২-৩-১ ফরমেশনে সাজানো হতে পারে একাদশ। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইন তছনছ করতে সামনে থাকবেন এমবাপ্পে। দেম্বেলে, ওলিসে উইং দিয়ে ঝড় তুলবেন। ফ্রান্স অধিনায়ক বলেন, ‘আমি জানি কোথায় আছি এবং কী করতে হবে। দলের সবাই জানে পরের ধাপে কী করতে হবে। কারণ আমাদের নতুন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে হবে।’ বিশ্বকাপে ফুটবলের কোরাস গায় ফ্রান্স। তাদের স্লোগান ‘ফ্রান্স ফার্স্ট’। জয়ই যাদের শেষ কথা, তাদের সমানে প্যারাগুয়ে কোনো বাধা হওয়ার কথা নয়।
