দুঃখী রাজপুত্রের মুকুটহীন বিদায়
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫২
নিয়তি বোধ হয় একেই বলে! ঠিক ১৬ বছর আগে, ২০১০ সালের এক মায়াবী রাতে এই হাডসন নদীর পাড়েই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের জার্সিতে প্রথম পা রেখেছিল এক লিকলিকে চেহারার, ঝাঁকড়া চুলের রোগা কিশোর। সেদিন তাঁর জাদুকরি পায়ের প্রথম আন্তর্জাতিক ছোঁয়ায় বিশ্ব চিনেছিল পেলের এক অনন্য উত্তরসূরিকে। অথচ কালের কী নিষ্ঠুর আবর্তন, আজ এতগুলো বছর পর, ২০২৬ সালের এক বিষণ্ন বেলায় সেই হাডসন নদীর পাড়ের মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই অশ্রুসজল চোখে বিদায় নিলেন ফুটবলের সেই ক্লান্ত রাজপুত্র! যেখানে শুরু হয়েছিল এক রূপকথার প্রথম পরিচ্ছেদ, ঠিক সেখানেই লেখা হলো তার করুণতম বিসর্জন। মাঝখানের বছরগুলোয় বয়ে গেছে কত কোলাহল, কত রঙের মেলা– অথচ আজ বৃত্তটা সম্পূর্ণ হলো এক মহাসমুদ্র সমান শূন্যতা আর একবুক হাহাকার দিয়ে।
‘এটাই হয়তো আমার ব্রাজিলের হয়ে শেষ ম্যাচ’– মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সেই দুঃখী এক রাজপুত্রের মতো সমস্ত হাল ছেড়ে দিলেন তিনি। অথচ তার চেয়ে বেশি বয়সে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন রোনালদো-মেসিরা। আসলে বারবার ইনজুরির বিশ্বাসঘাতকতা, কোচের উপেক্ষা– সমস্ত অস্থিরতা থেকেই তিনি মুক্তি চাইছেন। তাই তাঁর চেয়ে বেশি বয়সে মেসি-রোনালদোরা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন। তাদের জন্যও এটি বিদায়েরই বিশ্বকাপমঞ্চ। এরই মধ্যে মডরিচের চলে যাওয়া দেখেছে সবাই, হয়তো নেইমারও পারতেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা আরও লম্বা করার। কিন্তু মেসি-রোনালদোদের মতো প্রেরণাটা তিনি বোধ হয় আর পাচ্ছিলেন না।
টানা চারটি বিশ্বকাপে (২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) হেক্সা জয়ের স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাঠে নামা এই জাদুকর আজ কান্নাভেজা হলুদ জার্সি জড়িয়ে মাঠ ছাড়ছেন। নেইমারের এই ফুটবলীয় মহাকাব্য আসলে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের নাম। যেখানে প্রতিপক্ষের বুটের নির্মম আঘাত আর একের পর এক অভিশপ্ত ইনজুরি তাঁর শরীরকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে, কেড়ে নিয়েছে ক্যারিয়ারের সেরা সময়গুলো। কিন্তু ট্র্যাজেডি তো অন্য জায়গায়– শারীরিক সেই যন্ত্রণার চেয়েও তীব্র ছিল ফুটবলবিশ্বের একাংশের উপেক্ষা আর ঘরের মানুষেরই অবহেলা।
জাদুর বদলে বারবার তাঁর দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে নাটুকেপনার অপবাদ; প্রতিভার যথার্থ মর্যাদা দেওয়ার বদলে করা হয়েছে নির্মম সমালোচনা। একটা নির্মম সত্যকে আজ এড়ানো যাবে না। আর তা হলো ব্রাজিলের ডাগআউটে বসা মাস্টারমাইন্ডরা কখনোই এই জাদুকরকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদায় ব্যবহার করতে পারেননি। লুইস ফেলিপে স্কলারি থেকে শুরু করে আজকের তিতে– প্রত্যেক কোচই নেইমারকে বানাতে চেয়েছেন দলের একমাত্র ‘ত্রাতা’। পুরো দলের কৌশলের ঘাটতি ঢাকতে সব চাপ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর একার কাঁধে। আনচেলত্তি সেখানে উল্টো নেইমারকে উপেক্ষা করে ব্রাজিলকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল বিকল্পের। মূলত ব্রাজিলের মিডিয়া ও সমর্থকদের আবেগের চাপে নেইমারকে দলে নিয়েছিলেন তিনি; কিন্তু তাঁকে বিশ্বকাপে পর্যাপ্ত ম্যাচ টাইমই দেননি।
পেলের মতো তিনবার বা রোনাল্ডোর মতো দুবার বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরার পরম সৌভাগ্য তাঁর কপালে লেখেননি ফুটবল দেবতা। কিন্তু ট্রফির সংখ্যা দিয়ে কি আর সব জাদুর পরিমাপ হয়? পেলের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড নিজের করে নিয়েও নেইমার রয়ে গেলেন ফুটবলের ইতিহাসের সেই ট্র্যাজিক হিরো, যাঁর জীবনের গল্পে সবকিছু থেকেও শেষ পর্যন্ত ট্রফির রাজমুকুটটা অধরাই রয়ে গেল। আর এভাবেই, কোটি ভক্তের হৃদয়ে এক অনন্ত হাহাকার রেখে শেষ হলো অসম্পূর্ণ রূপকথার এক দুঃখী রাজপুত্রের অশ্রুসজল মহাকাব্য।
যদি নেইমারের চারটি বিশ্বকাপের খেরোখাতা খোলা যায়, তবে দেখা যাবে ফুটবল দেবতা তাঁর কপালে হেক্সার সুখ লেখেননি; লিখেছিলেন গ্রিক ট্র্যাজেডির চেয়েও নিষ্ঠুর এক চিত্রনাট্য! ২০১৪ সালে ঘরের মাঠের সেই বিশ্বকাপে যখন দেশজোড়া প্রত্যাশার চাপ, তখন হুয়ান জুনিগার সেই নির্মম ব্যাক ইনজুরিতে মারাকানার স্বপ্নটাই হুইলচেয়ারে বন্দি হয়ে গেল। ২০১৮-তে রাশিয়া যখন তাঁর জাদুর অপেক্ষায় মুখিয়ে, তখন প্রতিপক্ষের বুটের অবিরাম আঘাত আর ইনজুরির ধাক্কায় ছিটকে যেতে হলো কোয়ার্টার ফাইনালেই। অথচ বিশ্ব মনে রাখল কেবল তাঁর ইনজুরি নিয়ে অভিনয়ের অপবাদ। আর ২০২২-এর কাতার? ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে সেই অবিশ্বাস্য জাদুকরি গোল করে পেলের রেকর্ডের রাতে যখন ট্রফির গন্ধ পাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই টাইব্রেকারের সেই ক্রূর ভাগ্য লিভাকোভিচের গ্লাভসে বন্দি হয়ে গেল। ২০২৬-এর নিউইয়র্কের এই হাডসন নদীর তীরে এসে যখন বৃত্তটা সম্পূর্ণ হতে পারত, সেখানেও ব্রুনো গিমারেসের সেই অভিশপ্ত পেনাল্টি মিসের খেসারত দিয়ে মুকুটহীন রাজপুত্রকে মাঠ ছাড়তে হলো অশ্রুসজল চোখে।
পেলের মতো সর্বকালের সেরা মহাতারকা, রোনান্ডো নাজারিও কিংবা রোমারিওদের মতো কিংবদন্তিদের টপকে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার (৮০টি গোল) সিংহাসনটা আজ কার দখলে? ওই দুঃখী রাজপুত্র নেইমারের! শুধু কি গোলের সংখ্যা? দেশের মাটিতে উৎসবের জোয়ারে ভাসিয়ে ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপ জয় কিংবা ২০১৬ সালে মারাকানার চেনা আঙিনায় ব্রাজিলকে ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক সোনা এনে দেওয়া– সবখানেই তো ত্রাতা হিসেবে ছিলেন এই একজনই। অথচ নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, এতসব কীর্তি, এতগুলো জাদুকরি গোল করার পরও ফুটবল রোমান্টিকদের আড্ডায় তাঁর নামটা উচ্চারিত হবে এক ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে!
- বিষয় :
- নেইমার
- ব্রাজিল
- বিশ্বকাপ ফুটবল