ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

স্পেন-আর্জেন্টিনা

ডাগআউটে গুরু-শিষ্যের লড়াই 

ডাগআউটে গুরু-শিষ্যের লড়াই 
×

আহসান হাবিব সম্রাট

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১১:৪৭

৯ বছর আগে রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন (আরএফইএফ) সাবেক তারকার ফুটবলারদের জন্য একটি কোচিং কোর্সের আয়োজন করেছিল। যেখানে শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিচ্ছিলেন স্পেন জাতীয় দলের বর্তমান কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তে। সেই কোচিং কোর্সের অন্যতম শিক্ষার্থী ছিলেন আর্জেন্টিনার বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনি। নিয়তির খেলা বড়ই অদ্ভুত। বিশ্বকাপের ফাইনালে আজ রাতে নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান সময়ের দুই সেরা দল কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দুই দলের ডাগ আউটে থাকবেন এই দুই সাবেক শিক্ষক ও ছাত্র। এ কারণে বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে গুরু-শিষ্যের অন্যরকম লড়াইও দেখতে যাচ্ছেন ফুটবলপ্রেমীরা। 

ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফুটবলারদের সেই কোচিং কোর্সের বিষয়ে ফুয়েন্তে বলেন, ‘এটি ছিল অনেকটা স্কুলের মতো। বাচ্চাদের মতো কিছু ছাত্র সামনের বেঞ্চে এবং কিছু ছাত্র পেছনের দিকের বেঞ্চে বসে ক্লাস করত। লিও (স্কালোনি) ছিল সামনের বেঞ্চে বসা ছাত্রদের অন্যতম। এখন বলাই যায় যে, কোচিং কোর্সে অংশ নেওয়াদের মধ্যে সেই সবচেয়ে ভালো করেছে। কিন্তু তখন তাঁর মধ্যে এতটা ধীরস্থিরতা ও প্রজ্ঞার ছাপ দেখা যায়নি। সে ছিল চঞ্চল প্রকৃতির এবং প্রায় সময়েই শিক্ষকদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হতো। তবে বিষয়টিকে অন্যভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সে আসলে সবসময় যুক্তিতর্কের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করত।’ 

১৯৮০ সালে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের হয়ে লা লিগা শিরোপা জেতা ফুয়েন্তে ১৯৯৭ সালে স্পেনের বাস্ক অঞ্চলের ক্লাব ‘পতুর্গালেটে’র হয়ে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন। ২০০০ সালে তিনি একই অঞ্চলের ‘অরেরা’ ক্লাবের কোচের দায়িত্ব নেন। সেখানে এক বছর থাকার পর সেভিয়া যুব দলের দায়িত্ব নেন। চার বছর সেভিয়ায় কাটানোর পর এক মৌসুম অ্যাথলেটিক বিলবাও যুব দলের কোচ ছিলেন। পরে দুই মেয়াদে চার বছর বিলবাও অ্যাথলেটিক সিনিয়র দলের কোচ ছিলেন। ২০১১ সালে আলাভেজ ক্লাবে যোগ দিয়ে দুই মৌসুম কাটানোর পর স্পেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচের দায়িত্ব নেন। ২০২২ সালে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় এক দশক লা রোজাদের বয়সভিত্তিক দলগুলোর কোচ ছিলেন ফুয়েন্তে। তাঁর অধীনে স্পেন উয়েফা অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ, উয়েফা অনূর্ধ্ব-২১ চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০২০ সালে টোকিও অলিম্পিক আসরে রানার্স আপ হয়ে রৌপ্য পদক জেতে। জাতীয় দলের কোচ হিসেবেও সফলতার পরিচয় দেন দেশটির উত্তরাঞ্চলের হারো অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করা ফুয়েন্তে। ২০২৩ সালে স্পেনকে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপা এনে দিয়ে পরের বছরেই উয়েফা ইউরো আসরে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন। ভিনসেন্ট দেল বক্সের পর দ্বিতীয় স্প্যানিশ কোচ হিসেবে ইউরো ও বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের মিশনে রয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী এই কোচ। 
 
অপরদিকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে সাতটি ম্যাচ খেলা লিওনেল স্কালোনি ২০১৬ সালে সেভিয়া দলের সহকারী কোচ হিসেবে যোগ দেন। পরের বছর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে কোচ জর্জ সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান। একই সঙ্গে দেশটির অনূর্ধ্ব-২০ যুব দলের হেড কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্কালোনিকে। ২০১৮ বিশ্বকাপে অ্যালবিসেলেস্তে দলের বাজে পারফরম্যান্সে কোচ জর্জ সাম্পাওলি চাকরি হারালে অন্তর্বর্তী হেড কোচের দায়িত্ব পান তিনি। জাতীয় দল বা ক্লাবের সিনিয়র দল পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেকেই সে সময় এই তরুণ কোচের সামর্থ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। মাত্র কয়েক বছরেই আর্জেন্টিনাকে বিশ্বসেরা দলে পরিণত করেন স্কালোনি। প্রথমে ২০২১ কোপা আমেরিকা জিতে বড় আসরে আলবিসেস্তেদের ২৮ বছরের শিরোপা খরার অবসান ঘটান। পরের বছর মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিনালিসিমা’ ট্রফির পাশাপাশি কাতার বিশ্বকাপ জয়ে ডাগ আউটে নেতৃত্ব দেন তিনি। ২০২৪ সালে ব্যাক টু ব্যাক কোপা শিরোপা জয়ের পর দলকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন স্কালোনি।

ফুয়েন্তে ও স্কালোনির বিশেষ সম্পর্ক

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর আর্জেন্টিনার জন্য শুভকামনা জানিয়েছিলেন স্পেন কোচ ফুয়েন্তে। বলেছিলেন, ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে আর্জেন্টিনাকে চান তিনি। এ ছাড়া স্কালোনি সম্পর্কে তিনি বলেন,‘ লিওনেল (স্কালোনি) কোচিং কোর্সের একজন খুবই নিবেদিত শিক্ষার্থী ছিল। যার মধ্যে শেখার প্রবল আগ্রহ ছিল। সে সবসময়েই ফুটবলকে বোঝার ও খেলাটির উন্নয়নের প্রতি আগ্রহী ছিল। কোচ হিসেবে তাঁর বিকাশ প্রক্রিয়ায় অংশ হতে পারাটা আমার জন্য সত্যিই সম্মানের বিষয়।’

অপরদিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে স্কালোনি বলেন, ফাইনালে উঠতে না পারলে গুরুকে কল দেবেন তিনি। পরে থ্রি লায়ন্স দলকে হারিয়ে টুর্নামেন্টের ফাইনাল নিশ্চিত করার পর ফুয়েন্তের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক থাকার কথা জানিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন কোচ। স্কালোনি বলেন, ‘লুইস (ফুয়েন্তে) শুধু আমার কোচিং কোর্সের শিক্ষকই ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে বরাবরই আমার খুব হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এখন আমরা ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছি।’ তবে ফাইনালের মহারণে তিনি যে গুরুকে হারাতেই লড়বেন সেটিও পরিষ্কার জানিয়ে দেন তিনি, ‘তিনি (ফুয়েন্তে) আমার মেন্টর। আমার অনেক কিছুই তাঁর কাছ থেকে শেখা। তবে রোববারের জন্য আমি দুঃখিত। কারণ সেদিন আমি তাঁকে হারানোর চেষ্টাই করবো।’ আজ রাতে বিশ্বকাপের ফাইনালে গুরু-শিষ্যের এই লড়াইয়ে কে শেষ হাসি হাসেন সেটাই দেখার অপেক্ষায় পুরো ফুটবলদুনিয়া। 

আরও পড়ুন

×