ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

স্পেনের বাতিঘর ইয়ামাল

স্পেনের বাতিঘর ইয়ামাল
×

সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫৯

পরশ পাথরের ছোঁয়ায় লোহা সোনা হয়। লিওনেল মেসির ছোঁয়ায় লামিনে ইয়ামাল। সেই যে ১৮ বছর আগে লকার রুমে প্লাস্টিকের বাথটাবে লামিনের শরীরে জল ছিটিয়ে হাত বুলিয়েছিলেন মাথায়, শিশু ইয়ামাল আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়েছিলেন সেদিনই। মেসির মতো বার্সেলোনা ফুটবল একাডেমিতে সুযোগ পাওয়া, বিশ্বকাপে ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার চিত্রনাট্যও তো ঈশ্বরের খেলা। মেসি-ইয়ামালের পুনর্মিলনী এভাবেও যে হতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। ভালোবাসা একপাশে সরিয়ে রেখে দেখাদেখি হবে তাদের। শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে উদীয়মান সূর্যের মতো তেজদ্দীপ্ত হবেন ইয়ামাল। মার্কিন মুলুক থেকে স্পেনের বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে দেশে ফেরার ইচ্ছা যে তাঁর। মেসির জন্য ভালোবাসার লাল গোলাপ তুলে রাখবেন অন্য সময়ের জন্য।

এই স্প্যানিশ তারকা অসাধারণের মধ্যেও সাধারণ, যাঁর পায়ে লুটায় ফুটবলের সাফল্য। বিশ্বজোড়া পরিচিতি, তারকা খ্যাতি, সম্মান, প্রাচুর্য– কোনো কিছুর অভাব নেই। এই উনিশের ইয়ামালকেই তো তুলনা করা হচ্ছে লিওনেল মেসির সঙ্গে। ফুটবলের প্রতাপশালী রাজার সঙ্গে যুবরাজের তুলনা। উনিশ আর ঊনচল্লিশ– প্রজন্মের পার্থক্যে অসম হলেও খেলার মাঠে সমান। ছেড়ে কথা বলবেন না কেউ কাউকে। তারা দুজনেই যে বিশ্বকাপে এসেছেন দেশের ঝান্ডা ওড়াতে, দেশ ও জাতিকে গৌরবান্বিত করতে। তাই কাজী নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার ভাষায় মেসি-ইয়ামালের দীপ্ত উচ্চারণ– বল বীর, বল উন্নত মম শির!

ইয়ামাল যে চোখ তুলে কোনো দিন মেসিকে ভালো করে দেখারই সুযোগ পাননি, টিভি আর ছবিতে ফুটবলের মহানায়ককে দেখা– তাঁকেই চোখ রাঙাবেন ময়দানি লড়াইয়ে। এই প্রতিযোগিতা বিব্রত করবে ইয়ামালকে। কারণ, বিশ্বকাপ ফুটবলে স্পেনের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পড়েছে তাঁর কাঁধে। দেশ ও জাতির সম্মানে সেই পবিত্র দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। চোখে-মুখে কৈশোরের সারল্য আর স্মিত হাসি নিয়ে নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হাজির হবেন। রেফারি ফাইনালের বাঁশি ফুঁ দেওয়ার মুহূর্তে পেছনের সব ভুলে যাবেন ইয়ামাল। ফাইনাল ম্যাচ সামনে রেখে তিনি সে বার্তা দিয়েছেন মিডিয়াকে, ‘আমি নিজের কাছে অনেক বেশি প্রত্যাশা করি। আমি যা করছি, তাতে আমি কখনোই সন্তুষ্ট নই।’

এই বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে একটি গোল করেছেন ইয়ামাল। গোলে অ্যাসিস্ট করেননি একটিও। তবুও স্পেনের সেরা খেলোয়াড় তিনি। কারণ, প্রভাববিস্তারী একজন ফুটবলার ইয়ামাল। কখনও গেম বানিয়ে দেন, কখনও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ তছনছ করেন বল নিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে বক্সে ঢুকে পড়ে। তাঁকে পাহারা দিতে গিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ অরক্ষিত হয়ে পড়ে অন্যদিকে। মিকেল ওয়াইরসাবাল, মিকেল মেরিনোরা গোল করেন সুযোগবুঝে। আজ রাতের ফাইনালে ইয়ামালকেই পাহারায় রাখতে হবে আর্জেন্টিনাকে।

একটি জাতির মর্যাদার ভার ইয়ামালের ছোট্ট কাঁধে। আরেকটু বড় পরিসরে দেখা হলে ইউরোপ মহাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে মেটলাইফে বিজয় কেতন ওড়ানোর দায়িত্ব। বার্সেলোনার কোচ হান্সি ফ্লিক মনে করেন, ১৯ বছরের তরুণের জন্য এই চাপ বিশাল বোঝা। সেই ১৬ বছর বয়স থেকেই তো সমর্থকদের প্রত্যাশার চাপ নিচ্ছেন বার্সা তারকা। বার্সা কোচ চান, ফাইনাল ম্যাচটি উপভোগ করেন এই তরুণ ফুটবলার। হান্সি যেন ইয়ামালের ভবিষ্যৎ দেখে ফেলেছেন, ‘আমি নিশ্চিত যে সে ফুটবলবিশ্বের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হয়ে উঠবে।’ আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি ফাইনালের আগে ১৮ বছর আগের স্মৃতিতে ফিরে গেলেন, ‘সে যখন ছোট শিশু, তখন আমি তার সঙ্গে একটা ছবি তুলেছি। আর এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হওয়াটা অবিশ্বাস্য। সে এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। আমি তার সাফল্য কামনা করি। কারণ, তার ভালো হওয়া মানে বার্সেলোনারও ভালো হওয়া।’

মেসির প্রশংসা পেলেন স্প্যানিশ তারকা, ‘লামিনে অসাধারণ খেলোয়াড়। আমি ওর খেলা খুব কাছ থেকে দেখেছি। কারণ, সে এমন একটা ক্লাবে (বার্সেলোনা) খেলে, যাকে আমি ভালোবাসি এবং সব সময় যার মঙ্গল চাই। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম এক তারকা, পুরো ক্যারিয়ারই তো সামনে পড়ে আছে।’ শিরোপার কথা উঠতেই মুহূর্তে বদলে গেলেন মেসি, ‘তার সামনে ইতিহাস গড়ার হাতছানি। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, এবার অন্তত সে যেন সেটি করতে না পারে। আমি তার সাফল্য কামনা করি। আর ওই ছবিটা আসলেই অবিশ্বাস্য– জীবন অদ্ভুত!’ মেসি না চাইলেও ইয়ামাল শিরোপার জন্যই খেলবেন এবং সফল হওয়ার চূড়ান্ত চেষ্টা থাকবে। তবে মেসির পর্যায়ে নিজেকে ভাবছেন না ইয়ামাল, ‘মেসির পর্যায়ে পৌঁছানো অসম্ভব। হয়তো একদিন তাঁর মতো হতে পারব।’ ইয়ামাল সব সময় জোর দিয়ে বলেন, খেলার মাঠে কখনও চাপ অনুভব করেন না। ১৭ বছর বয়সে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেলে চাপ থাকার কথা নয়। বহু বছর আগেই মাতারোতে চাপ নির্বাসন দিয়ে এসেছেন বলে দাবি তাঁর। ফাইনালের আগে ইয়ামালের জন্য মূল্যবান পরামর্শ স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির, ‘আমার মনে হয়, নিজেকে প্রমাণ করার যে উদ্বেগ তার মধ্যে কাজ করছে, তার জন্য লামিনের কিছুটা শান্ত হওয়া দরকার। তবে বলসহ এবং বল ছাড়া সে যা করে, এ জন্য সে একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।’ তরুণ ইয়ামালের মনের অবস্থাটাও বুঝতে পারেন অধিনায়ক, ‘এটা সত্যি যে তাঁর বয়স ১৯ বছর এবং খেলার কিছু মুহূর্তে আমাদের তাঁকে শান্ত করতে হয়। সে একজন বেশ পরিণত তরুণ, কিন্তু খেলা বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর এখনও উন্নতির সুযোগ রয়েছে, যা তাঁর বয়সের জন্য সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।’

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ডাউনটাউনে চাটানুগার বেস ক্যাম্পে যেদিন পৌঁছাল স্পেন, সেদিন দেড় হাজারের মতো সমর্থক অপেক্ষায় ছিল প্রিয় দলকে স্বাগত জানাতে। যুক্তরাষ্ট্র পুরুষ ফুটবল দলের সাবেক জেনারেল ম্যানেজার বিল নাটাল সেদিনের সেই দৃশ্যের বর্ণনা করেন এভাবে, বাস থেকে নামার সময় স্পেনের বিশ্বমানের খেলোয়াড়রা উচ্ছ্বসিত হর্ষধ্বনি ও করতালি পাচ্ছিলেন। ভক্তরা কান-ফাটানো চিৎকারটি দেন তরুণ সুপারস্টারের লামিনে, লামিনে বলে। ইয়ামালও তাঁর টুপি খুলে বিনয়ের সঙ্গে হাত নাড়েন। তিনি আরও জানান, ১ হাজার ৫০০ লোকের মধ্যে ১ হাজার জনই ইয়ামালের জার্সি পরেছিল। এই দৃশ্য মেসির মতো লামিনের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে। বাঁ পায়ের ফুটবলশিল্পী শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে বাজিমাত করলে বিশ্ব পাবে নতুন মহা-তারকা।

আরও পড়ুন

×