ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

পাঁচ বছরে ১৬ শিরোপা

স্পেন কেন বর্তমান ফুটবলের সবচেয়ে অদম্য শক্তি?

স্পেন কেন বর্তমান ফুটবলের সবচেয়ে অদম্য শক্তি?
×

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১৩:০৭ | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৫০

দুই বছর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর এবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদও পেল স্পেন। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে লা রোহা।

এর আগে ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের পর ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতে একই কীর্তি গড়েছিল স্পেন। এবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করল তারা।

পুরুষদের পাশাপাশি স্পেনের নারী ফুটবল দলও তাদের আধিপত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্প্যানিশ নারীরা ২০২৩ সালে সিডনিতে অনুষ্ঠিত নারী বিশ্বকাপ জিতেছিল। এবার প্রথম কোনো দেশ হিসেবে একই সময়ে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নতুন ইতিহাস তৈরি করল স্পেন।

গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্পেনের আধিপত্য আরও বিস্তৃত হয়েছে। পুরুষ দল ২০২৩ সালে উয়েফা নেশনস লিগ, ২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেছে। অন্যদিকে নারী দল ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা দুইবার নেশনস লিগের শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে।২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে গত ৫ বছরে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত বিশ্ব ও ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় স্পেন ১৬টি শিরোপা জিতেছে। এর মধ্যে নারী ফুটবলে এসেছে ১১টি এবং পুরুষ ফুটবলে ৫টি ট্রফি।

স্প্যানিশ ফুটবল বিশ্লেষক গিয়েম বালাগে মনে করেন, এটি নিছক কোনো সাফল্য নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ আধিপত্য।

বিবিসি স্পোর্টকে বালাগে বলেন, এটা যেন সবকিছু একসঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যাওয়া। আমাদের সংস্কৃতিগতভাবে একটি নির্দিষ্ট ধারা রয়েছে এবং সবাই সেটিতে বিশ্বাস করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা থেমে থাকি না। এটি আরেকটি এভারেস্ট জয়ের মতো, কারণ ২০১০ সালে পুরুষ দল ইউরো জয়ের দুই বছর পর বিশ্বকাপ জিতেছিল। এবারও আমরা একই কাজ করলাম"।

দে লা ফুয়েন্তের নিয়োগ

লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যখন স্পেন প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়, তখন খুব কম মানুষই ধারণা করেছিলেন যে এত অল্প সময়ে তিনি নেশনস লিগ (২০২৩), ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪) এবং বিশ্বকাপ (২০২৬) জেতাতে পারবেন।

কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার পর লুইস এনরিকে স্পেনের দায়িত্ব ছাড়েন। এরপর স্প্যানিশদের দায়িত্ব নেন ফুয়েন্তে। তবে অনেকে স্পেনের এই সিদ্ধান্তকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন। কারণ, স্পেনের দায়িত্ব নেওয়ার আগে ফুয়েন্তে কখনও কোনো বড় ক্লাব পরিচালনা করেননি।১৯৯৪ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পর তিনি বিভিন্ন ক্লাবে প্রায় ১৫ বছর ধরে নানা দায়িত্ব পালন করেন। নিচের ধাপের লিগের কোচিং, যুব দলের দায়িত্ব এবং সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করার পর তিনি স্পেনের যুব দলগুলোর কোচ হন।

তবে দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্পেনের যুব ফুটবল সম্পর্কে তার গভীর ধারণা। অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ ও অলিম্পিক দলের দায়িত্ব পালন করায় বর্তমান সিনিয়র দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্ক ছিল।

বালাগে বলেন, তারা এমন একজনকে বেছে নিয়েছিল, যিনি স্পেনের খেলার ধরণ এবং পুরো ব্যবস্থাটি খুব ভালোভাবে বুঝতেন। এটি ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আমার মনে হয় না কেউ ভাবতে পেরেছিল তিনি এতটা সফল হবেন।

স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার হুয়ান মাতা বলেন, দে লা ফুয়েন্তে একাডেমি থেকেই এই খেলোয়াড়দের অধিকাংশকে চিনতেন এবং তারা দল হিসেবে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে। এটি শুধু বর্তমানের দল নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি অসাধারণ দল।

বর্তমানে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে স্পেন টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে, যা ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের ইতিহাসে কোনো দলের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড।

নারীদেরও জয়রথ ছুটছে

গত এক দশকে স্পেনের নারী ফুটবলেও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে এবং তারাও বড় মঞ্চের ম্যাচগুলোতে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করছে। তিন বছর আগে নারীদের বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেন যে শিরোপা জিতেছিল, সেটি ছিল এই টুর্নামেন্টে তাদের মাত্র তৃতীয় অংশগ্রহণ। তারা প্রথমবারের মতো নারী বিশ্বকাপে খেলেছিল ২০১৫ সালে।

এরপর স্পেনের নারী দল ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা দুইবার নেশনস লিগ জিতে সেই সাফল্যের ধারা বজায় রাখে। পুরুষ ও নারী—উভয় দলের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল গত এক দশকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে অসংখ্য শিরোপা জয়ের মাধ্যমে।স্পেনের সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে তাদের শক্তিশালী একাডেমি কাঠামো। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দল ধারাবাহিকভাবে ইউরোপ ও বিশ্ব শিরোপা জেতায় সিনিয়র দলের জন্য দক্ষ খেলোয়াড়ের ভাণ্ডার তৈরি হয়েছে।

নারী ফুটবলেও বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে স্পেন। বয়সভিত্তিক দল বৃদ্ধি, উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা, আলাদা একাডেমি এবং পেশাদার পরিবেশ তৈরির কারণে স্পেনের নারী ফুটবলও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে।

উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

স্পেনের ভবিষ্যৎ আরও আশাব্যঞ্জক বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই লামিন ইয়ামাল ও পাউ কুবারসি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। ফাইনালে দুজনকেই শুরুর একাদশে রেখে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন নজির গড়েছে স্পেন। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে দুজন কিশোর খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়েছে স্পেন।

একই বয়সে স্পেন নারী দলের খেলোয়াড় ভিকি লোপেজ বার্সেলোনার হয়ে তিনবার উয়েফা নারী চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। এছাড়া ফরোয়ার্ড সালমা পারাইয়ুয়েলো ২৩ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশটির জাতীয় দলের জার্সিতে ৫০টির বেশি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন।

এদিকে ইতিহাসের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছেন ইয়ামাল। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনাল খেলার সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর ৭ দিন। তার আগে কম বয়সে ফাইনাল খেলেছেন ব্রাজিলের পেলে (১৯৫৮ বিশ্বকাপ, ১৭ বছর ২৪৯ দিন) এবং ইতালির জিউসেপ্পে বার্গোমি (১৯৮২ বিশ্বকাপ ১৮ বছর ২০১ দিন)।অন্যদিকে ১৯ বছর ১৭৮ দিন বয়সে ফাইনালে স্পেনের শুরুর একাদশে থাকা পাউ কুবারসি জিতেছেন ২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার।

এবারের বিশ্বকাপের পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্টের মতে, এবার বিশ্বকাপে স্পেনের কাছাকাছিও যেতে পারেনি অন্য কোনো দল। ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির বিশ্বাস, শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো ও ধারাবাহিক প্রতিভা তৈরির কারণে আগামী কয়েক বছর বিশ্ব ফুটবলে স্পেনের এই আধিপত্য অব্যাহত থাকতে পারে।

আরও পড়ুন

×