সৈনিক থেকে স্বর্ণজয়ী ক্রীড়াবিদ
সাখাওয়াত হোসেন জয়, কাঠমান্ডু থেকে
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৩:৩৬
তেরো বছর আগে এসএ গেমসে কলম্বোর মাটিতে বেজেছিল জাতীয় সংগীত। মিজানুর রহমানের হাত ধরে তায়কোয়ান্দোতে স্বর্ণ জিতেছিল বাংলাদেশ। কলম্বোর আকাশে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ার দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন দিপু চাকমা। ২০১৩ সালের সেই দৃশ্যটা মন থেকে কখনোই সরাননি রাঙামাটির এ অ্যাথলেট। মনের মধ্যে স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন। একদিন তার হাত ধরে বিদেশের মাটিতে উড়বে লাল-সবুজের পতাকা।
এক যুগ পর সেই স্বপ্নটা বাস্তবে পরিণত হলো দিপুর। গতকাল কাঠমান্ডুর সাদদোবাদোর ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস কমপ্লেক্সে নিজের ইভেন্ট পুমসে স্বর্ণ জেতেন দিপু। সাউথ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশকে প্রথম সোনা এনে দেওয়া দিপুর উচ্ছ্বাসটা ছিল বাঁধভাঙা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় যখন পোডিয়ামে বেজে উঠল বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, তখন আবেগ ছুঁয়ে যায় তাকে। 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...'- জাতীয় সংগীতের সুরে পতাকার দিকে তাকিয়ে স্যালুট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ৩১ বছর বয়সী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এ অ্যাথলেট।
দেশের জন্য লড়াইয়ের সংগ্রাম করা সৈনিক দিপু এখন স্বর্ণজয়ী ক্রীড়াবিদ। সোমবার সোনালি হাসিতে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া দিপু ছেলেদের ২৯ প্লাস বয়সী ক্যাটাগরিতে ৮ দশমিক ২৮ ও ৭ দশমিক ৯৬ স্কোর গড়েন। প্রথমবারের মতো এসএ গেমস খেলতে এসেই করলেন বাজিমাত।
স্বপ্নও ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে পদক এনে দেওয়ার। সেই স্বপ্ন যে এত দ্রুত ধরা দেবে তা ভাবেননি দিপু। ২০১০ সালে সর্বশেষ এসএ গেমসের তায়কোয়ান্দো থেকে এসেছিল সোনার পদক। তিন বছর আগে শিলং ও গৌহাটিতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ আসরটি ছিল হতাশার। নয় বছর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এসএ গেমসের ক্যাম্পে থাকলেও জাতীয় দলে ছিলেন না। ২০১৬ সালেও ক্যাম্পে ছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে পুমসেতে অনুশীলন শুরু করলেও তখন এ ইভেন্টটি ছিল না।
যে কারণে স্বর্ণ জয়ের জন্য পাখির চোখ করেছিলেন নেপালের এসএ গেমসেই। হিমালয়ের দেশে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার আনন্দে আত্মহারা দিপু, 'দেশের বাইরে খেলতে এসেছি, দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছি। দেশকে কিছু দিতে পেরে গর্বিত। এই আনন্দ আমি আসলে এখনও বুঝতে পারছি না। আমার হাত ধরে যদি প্রথম সোনার পদক এসে থাকে, তাহলে এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।'
নিজের প্রিয় ইভেন্টে দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পাঁচটি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্য জয়ের স্বাদ পেলেও আন্তর্জাতিক আসরে এটাই প্রথম স্বর্ণ দিপুর, 'এর আগে কোনো অফিসিয়াল গেমসে কখনও স্বর্ণপদক পাইনি। অন্যান্য দেশে খেলতে গিয়ে স্বর্ণপদক পেয়েছি। এখানে জিতে অনেক গর্ববোধ করছি। আমি এখনও ঘোরের মধ্যে আছি। আসলে আমরা গোল্ড মেডেলের লক্ষ্য নিয়ে এখানে এসেছি। প্রস্তুতিও সে রকম ছিল।'
অথচ তায়কোয়ান্দো খেলার কথাই ছিল না দিপুর। কীভাবে এই খেলায় এসেছেন তার গল্প এভাবেই বলেন দিপু, 'আমার বড় ভাইয়ের ত্যাগের মাধ্যমে তায়কোয়ান্দোতে আসা। বড় ভাই ফরম নিয়ে গিয়েছিলেন তায়কোয়ান্দো শিখবেন বলে। কিন্তু পরীক্ষার কারণে তিনি ফরম পূরণ করতে পারেননি। তাই উনার পরিবর্তে আমিই ভর্তি হয়েছিলাম তায়কোয়ান্দোতে।' ২০০১ সালে রাঙামাটিতে তায়কোয়ান্দোর ওপর একটি ক্যাম্প হয়েছিল। সেখানে ফেডারেশনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল ইসলাম রানার নজরে পড়েন দিপু।
কিন্তু মাঝে তায়কোয়ান্দো থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন দিপু। এর মধ্যে ২০০৫ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর সব কিছুই ভুলে গিয়েছিলেন। এরপর ২০০৬ সালে কলম্বোয় অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে মিজানুর রহমানের স্বর্ণ জয়ের সাফল্য দেখে ২০০৮ সালে আবারও ফিরে আসেন তায়কোয়ান্দোতে। মিজানুর রহমানের অনুপ্রেরণায় আস্তে আস্তে নিজেকে তৈরি করেন। মাঝে ইনজুরিতে পড়েও হাল ছাড়েননি। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের সহায়তায় খেলে যান তায়কোয়ান্দো। তাই তো স্বর্ণটা উৎসর্গ করেছেন রানাকে।
'স্বর্ণপদকটি আমি রানা স্যারকে (মাহমুদুল ইসলাম রানা) উৎসর্গ করতে চাই। কারণ বেশ ক'বার আমি ইনজুরিতে পড়েছিলাম। বারবার রানা স্যারই আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। আমাকে উদ্দীপ্ত করেছেন। আগামীতে দেশের জন্য আমি আরও পদক জিতে আনতে চাই।'
- বিষয় :
- খেলা
- এসএ গেমস
- তাইকোয়ান্দো
- দিপু চাকমা