ভাত-মাছ উঠে গেছে আছে শুধু বালু
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পাতলাবন। পেছনে ভারতের গারো পাহাড়। বালুতে পরিত্যক্ত হতে চলেছে গ্রামটি - সমকাল
রাজীব নূর
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ মে ২০২২ | ০৪:২৬
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামের একাংশের নাম বদলে গিয়ে হয়েছে 'আনচেংগ্রি'। শব্দটির অর্থ বালুকাময় ভূমি। 'আনচেং' মান্দি (গারো) শব্দ। আর 'গ্রি' এসেছে হাজংদের গিরি শব্দ থেকে। বাংলার মতো হাজংদের ভাষাতেও পাহাড়-পর্বত অর্থে গিরি ব্যবহৃত হয়। লেখক-গবেষক মতিলাল হাজং বললেন, 'গিরি দিয়ে হাজং ভাষায় ভূমি এবং ভূস্বামীও বোঝায়। আনচেংগ্রির শাব্দিক অর্থ বালুকাময় ভূমি হলেও ভাষার ব্যবহারে এটাই হবে বালুতে পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া ভূমি।'
এলাকাটায় বেশি বেশি বালু পড়ছিল বলে মানুষের মুখে মুখে নামের এ পরিবর্তন ঘটেছে বলে জানা গেল। কলমাকান্দারই খারনই ইউনিয়নের কচুগড়ার পাশে আনচেংগ্রি নামের আরও একটি গ্রাম আছে। বোঝা গেল, গারো পাহাড় থেকে বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে বালু নেমে আসার ঘটনা নতুন নয়। নতুন হচ্ছে পাহাড় ধসের ঘটনা এবং ব্যাপকহারে বালু আসা। এই বালু আন্তঃসীমান্ত নদী, পাহাড়ি ছড়া ও বিলগুলো দিয়ে হাওরে এসে কৃষিজমি নষ্ট করছে।
সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই সাতটি প্রশাসনিক জেলার হাওরাঞ্চল আয়তনে বাংলাদেশের ছয় ভাগের এক ভাগ। গারো পাহাড়ের পাদদেশের চন্দ্রডিঙ্গা, সন্ন্যাসীপাড়া, পাঁচগাঁও, চেংগ্নি, পাতলাবানসহ কিছু গ্রাম ঘুরে জানা গেছে, সীমান্তের ওপারের উন্মুক্ত কয়লা ও চুনাপাথরের খনি এবং রাস্তাঘাটের অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ২০০৮ সাল থেকে বালু ও নুড়ি আসা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ওই বছরের জুলাই মাসের এক রাতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামের মানুষ ওপারে পাহাড় ধসের শব্দ শোনেন এবং পরের দিন দেখতে পান সীমান্তসংলগ্ন চানপুর গ্রামের অনেক কৃষিজমি বালুতে ভরাট হয়ে গেছে। বালুতে ঢাকা পড়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যায় বেশকিছু ঘরবাড়ি।
মতিলাল হাজং পাহাড় ধসের কারণ হিসেবে মেঘালয়ের উন্মুক্ত খনি এবং পাহাড়ি বন ধ্বংস করার কথা উল্লেখ করেন। সত্তরোর্ধ্ব এ মানুষটির জন্ম নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায়। সেই থেকে কখনও স্থায়ীভাবে এলাকা ছেড়ে যাননি। তিনি বলেন, 'শৈশবে উত্তরে তাকালে সবুজ পাহাড় চূড়া চোখ জুড়িয়ে দিত। এখন পাহাড়গুলোকে মনে হয়ে মাথা ছিলা মোরগের মতো। পাহাড়ি বন ছাকনির মতো বালু ও পাথর পাহাড়েই আটকে রাখত। পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা ভারতের চেরাপুঞ্জি। সুনামগঞ্জ সীমান্তের খুব কাছের চেরাপুঞ্জি থেকে বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ছোট ছোট ঝরনা ও নদী দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। এই পানির সঙ্গে আসে কোটি কোটি টন বালু, নুড়ি ও চুনাপাথর।'
কলমাকান্দার চন্দ্রডিঙ্গার একপ্রান্তের পাহাড়ে ডিঙ্গাসদৃশ কিছু একটা দৃশ্যমান হয়, যা লোকশ্রুতি অনুযায়ী চাঁদ সওদাগরের ডিঙ্গা। বলা হয়ে থাকে, পৌরাণিককালে চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামটি ছিল কালীদহ সায়রের নিচে। চাঁদ সওদাগরের ডুবে যাওয়া সপ্তডিঙ্গার একটির মাস্তুল চন্দ্রডিঙ্গা টিলার শিলাস্তরে অঙ্কিত হয়ে আছে।
বালুতে ঢাকা পড়া চন্দ্রডিঙ্গার যে অংশের নাম এখন আনচেংগ্রি, সেটা ঠিক ডিঙ্গা পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত। চন্দ্রডিঙ্গা নামের জনপদটির বয়স নিশ্চিত হওয়া না গেলেও এর একাংশ এই আনচেংগ্রি যে ২০০০ সালের দিক থেকে নতুন নামে পরিচিত হতে শুরু করেছে, তা জিবিসি প্রাইমারি স্কুলের নামফলক থেকে ধারণা করা যায়। নামফলকটি লাগানো হয়েছে ২০০৬ সালে। জিবিসি স্কুল ফেলে ডিঙ্গা পাহাড়ে যাওয়ার পথে দেখা হলো আবদুল খালেক নামে এক কৃষকের সঙ্গে। মান্দি ও হাজং অধ্যুষিত গ্রামটিতে তিনি অন্তত ৬০ বছর আগে বাবার হাত ধরে এসে বসত গড়েছিলেন। তখন তার বয়স ছিল বছর দশেক। আবদুল খালেক বলেন, 'বাত (ভাত)-মাছের লাইগ্যা বাপ বালহা (ভালুকা) ছাইড়া আয়ছিল। অহন (বর্তমানে) বাত-মাছ সবই আছে হেন (ওখানে)। এনঅ হালি (এখানে শুধু) বালু।'
আবদুল খালেকের আক্ষেপ কঠিন পরিশ্রমে কলমাকান্দার চন্দ্রডিঙ্গায় যে জমিগুলোকে চাষাবাদের উপযোগী করেছিলেন তারা, সেগুলো এখন বালুতে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
শুধু কলমান্দা নয়, নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে বালু ঢাকা এমন অনেক জমি দেখা গেছে। পাহাড়ি ছড়া দিয়ে আসা বালুর কারণে কলমাকান্দার সীমান্তবর্তী এলাকার কবীর বিল, ফাটা বিল, আগুনঝরা, ডেঙ্গাহুলি, সেকান্দার, টলা বিলসহ অনেক বিল ইতোমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। বর্তমানে ধুলিঝড়া বিল ভরাট হতে শুরু করেছে। পাহাড়ি ছড়া, নদী, বিলগুলো হাওরে এসে পড়েছে।
বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের এক নেতা গত এপ্রিল মাসে মেঘালয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, ২০০৮ সালে মেঘালয়ের খাসি হিলের তিনপুলি এলাকার যে পাহাড় ধসে বাংলাদেশের তাহিরপুরের গ্রামগুলো আক্রান্ত হয়েছিল, সেখানে এখন আর উন্মুক্ত কয়লাখনি চোখে পড়ে না। তবে ইঁদুরের গর্তের মতো গর্ত করে কয়লা আহরণ হচ্ছে বলে শুনেছেন। স্থানীয় খাসিদের কাছে, যা লাইলাক নামে পরিচিত। তিনি ওই এলাকা পরিদর্শনের সময় দেখেছেন পাহাড় কেটে শিলং থেকে তুরা পর্যন্ত যে রাস্তা করা হচ্ছে, তাতে বালু নেমে আসছে ভাটিতে।
বাংলাদেশের মান্দিদের কেউ কেউ এই সব চোরাই কয়লাখনিতে কাজ করে বলে জানা গেল কলমাকান্দার পাতলাবান গ্রামে গিয়ে। জমিতে ফসল ফলানো যায় না বলে মাতৃতান্ত্রিক মান্দি সমাজের অনেক নারী চোরাচালানের কাজ করছেন, যা ওদের কাছে 'বর্ডার ব্যবসা' নামে পরিচিত।
সীমান্তের ওপারে শাকসবজি বিক্রি করে ফেরা বেবরিতা আজিম ও অনামিকা দাজেলের সঙ্গে পাতলাবানে ঢুকতেই দেখা হয়। তারা সেদিন ফেরার সময় কিছু প্রসাধন সামগ্রী কিনে এনেছিলেন। গ্রামের আন্দ্রেস রেমার দোকানে কথা হয় রিপন আফাংয়ের সঙ্গে। বছর চল্লিশের রিপন জানালেন, তিনি প্রায়ই কয়লাখনিতে কাজ করতে যান মেঘালয়ে। কঠিন কাজ তাই মজুরি বেশি।
দোকান মালিক আন্দ্রেসের ছেলে নিলান দাজেল মারা গেছেন কয়লাখনিতে কাজ করতে গিয়ে। পঙ্গু হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন রুইল নংমিন। আন্দ্রেস বলেন, 'এক সময় পাতলাবানের জমিগুলোতে বিস্তর ধান হতো। পাশের মহাদেও নদীতে মাছ মিলত। কাজের জন্য কাউকে দূরে যাওয়া লাগত না। এখন ধান চাষ তো দূরের কথা উঠোনের ফুল গাছও বাঁচানো যায় না বালুর জন্য।'
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী রাজাই গ্রামের বাসিন্দা এন্ড্রু জুয়েল সলমার বলেন, 'তাহিরপুরের চানপুর, রজনী লাইন, জঙ্গলবাড়ি, চারাগাঁও, মারাম, বুরুঙ্গাছড়া ও শান্তিপুর বালু-পাথরের ঢলের কারণে বেশি ভুগছে। প্রতি বর্ষায় আগের মৌসুমের চেয়ে বেশি কৃষিজমি বালু-পাথরে ঢাকা পড়ছে। আন্তঃসীমান্ত জাদুকাটা নদী অনেকাংশে ঢলের সঙ্গে আসা বালুর কারণে নাব্য হারিয়েছে। শুধু বালু নয়, ওপার থেকে এমন সব বিষাক্ত খনিজ পদার্থ আসছে, যাতে টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়েছে।'
লামাগাঁওয়ের উচ্চতাও বেড়েছে :হাওরের ৮৪ হাজার হেক্টর জলাভূমির সর্বত্র বালু জমে জমে উচ্চতা বাড়ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে নিচু এলাকা লামাগাঁওয়েরও উচ্চতাও বেড়েছে গত কয়েক বছরে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের একটি গ্রাম এটি। ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদ মুরাদ বলেন, 'আমাদের এলাকার নদীগুলো ভরাট হয়ে হাওরের সমান সমান হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নদী ও খালের গভীরতা হাওরের তলদেশের চেয়ে উঁচু হয়ে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।'
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব হাইড্রোলজিক্যাল (জলপ্রতিবেশগত) অঞ্চলের সোমেশ্বরী (সিমসাং), ভোগাই, উমিয়াম, নয়াগাং (খাসিয়ামারা), জালুখালি (চলতি), নিতাই, চিতল, জাদুকাটা-রক্তি, সুরমা, কুশিয়ারা, ধলা, সারী-গোয়াইন, পিআইন, সোনাই-বরদল, মনু, ধলাই, জুড়ী, লংলা, খোয়াই, সুতাং, সোনাই, কোরাঙ্গী, মহাদেও- এই ২৩টি ভারতীয় এলাকা থেকে উৎপন্ন নদী এবং সীমান্তবর্তী পাহাড় থেকে নেমে আসা নানান পাহাড়ি ছড়ার জলধারাই হাওর-জলাভূমির পানির মূল উৎস। এই নদীগুলোর অবস্থা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই যৌথ নদী কমিশনের বাংলাদেশ শাখার। এ নিয়ে জানতে চাইলে কমিশনের সদস্য মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, 'স্থানীয় প্রশাসন আমাদের কিছু জানায়নি। স্থানীয় প্রশাসন জানালে নিশ্চয়ই পাউবো (পানি উন্নয়ন বোর্ড) উদ্যোগ নেবে। পাউবো যদি নদীগুলো সংরক্ষণের জন্য ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন আছে মনে করে তবেই যৌথ নদী কমিশন বিষয়টি দেখবে।'
রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, 'ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে কাজ করার জন্য ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়েছিল। বছরে কমিশনের অন্তত চারটি বৈঠক হওয়ার কথা। হয় না একটাও। শুনতে পাই যৌথ নদী কমিশনে ভারত কর্তৃত্ব করে এবং কমিশনের বাংলাদেশ শাখা ভারতকে সন্তুষ্ট রাখতে গঙ্গা এবং ফারাক্কার মতো বিষয় নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করতে ভয় পায়। অন্য সব সীমান্ত নদীর খোঁজ পর্যন্ত তাদের জানা নেই। এটা একটা অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। জাতীয় স্বার্থেই যৌথ নদী কমিশনকে সক্রিয় করতে হবে।'
সীমান্ত নদীগুলো দিয়ে বালু এসে হাওরাঞ্চলে যে বিপন্নতা তৈরি করেছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) কিছু কাজ করছে। সংস্থাটির পরিচালক ও প্রাণ-প্রকৃতি গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, 'সমস্যা সমাধানে যৌথ নদী কমিশনের উদ্যোগ প্রয়োজন আছে। তবে আলোচনায় ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর মধ্যে মেঘালয়, আসাম ও ত্রিপুরাকে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলের নদীগুলো মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে আমাদের হাওরে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে আসাম এবং ত্রিপুরার কিছু সীমান্ত নদীও রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই সীমান্ত পাহাড়ি রাজ্যগুলোর বেশ কিছু আলাদা সাংবিধানিক বৈশিষ্ট্য ও নীতিকৌশল আছে। আন্তঃরাষ্ট্রিক কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই এইসব রাজ্যের শাসন কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগগুলোকে দ্বিরাষ্ট্রিক উন্নয়ন নীতিমালায় সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।'
- বিষয় :
- গারো পাহাড়
- গারো পাহাড়ের পাদদেশে
