দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ
অভিবাসী বৈচিত্র্যময় এক বিশ্বকাপ
ছবি-দ্য গার্ডিয়ান
অ্যান্ড্রু বিসলি
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ২৩:১২ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০০:৪৬
'জাতীয়তা বলে দেয় আপনি কোথা থেকে এসেছেন। সত্য বলতে, আমি চারটি দেশ থেকে এসেছি- ফ্রান্স, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া ও গ্রেট ব্রিটেন। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। কারণ আমার মধ্যে ভিন্ন চারটি সংস্কৃতি রয়েছে, যা আমাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে।' কথাগুলো মাইকেল ওলিসির। এবারের বিশ্বকাপে রেকর্ড সাত গোলের অ্যাসিস্ট করে একক আসরে করা পেলের রেকর্ড ভেঙেছেন তিনি। এই কীর্তি তিনি গড়েছেন ফ্রান্সের হয়ে, যদিও সেটি তার জন্মভূমি নয়।
খোলা চোখে তাকালে, এবারের বিশ্বকাপে অভিবাসী খেলোয়াড়দের অর্জন অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে নিবন্ধিত ফুটবলারদের মধ্যে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ নিজের জন্মভূমির বাইরে অর্থাৎ অন্যদেশের হয়ে খেলেন। সংখ্যাটি ২০১৮ সালের চেয়ে ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। আর এবার বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া ৪৮টি দলের ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৩.৬%) তাদের জন্মভূমির বাইরের দেশের জার্সিতে মাঠে নামেন। ৪৮ দল ও ১০৪টি ম্যাচের এই বিশাল টুর্নামেন্টে এটি অবশ্যই লক্ষণীয় দিক।
জন্মভূমির বাইরের দেশের জার্সি গায়ে চাপানো ফুটবলারদের পা থেকে এবার গোল ও অ্যাসিস্ট এসেছে ৭০টি, যার মধ্যে ১৯টি গোল ছিল এমন- যেখানে পাস দেওয়া ও গোলদাতা—উভয়ই জন্মসূত্রে অন্য দেশের। অথচ, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম আটটি আসরের মধ্যে ছয়টিতে মোট গোল ছিল ৮৯টির কম।
তবে সব গোলের গুরুত্ব এক নয়, বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে। বিশ্বকাপের একেকটি মুহূর্ত যেন জাতীয় চেতনার গভীরে গেঁথে যায়।
২০২৬ বিশ্বকাপ আসরের তিন আয়োজক দেশের হয়ে অভিবাসী খেলোয়াড়রা অসামান্য অবদান রেখেছেন। কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া হুলিয়ান কিনিয়োনেস মেক্সিকোর হয়ে টুর্নামেন্টের প্রথম গোল করেন। ওই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ ব্যবধানে হারায় মেক্সিকো। পরে নকআউট পর্বের দুটিসহ আরও তিনটি ম্যাচে জাল খুঁজে নেন এই স্ট্রাইকার।
যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে মালেক তিলমান করেন দুই গোল ও এক অ্যাসিস্ট। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে এক গোলের কারিগর হয়ে তিলমান যখন মাঠ ছাড়েন, তখন বদলি হিসেবে মাঠে নামেন জিও রেইনা (গোলও করেন)। অর্থাৎ ওই ম্যাচে জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এক খেলোয়াড়ের জায়গায় মাঠে নামেন এমন একজন, যিনি বেড়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডে।
উল্টো ঘটনাও ঘটেছে। জোনাথন ডেভিড তার জীবনের প্রথম কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্রে কাটালেও পরে কানাডা ফুটবলের নায়ক হয়ে ওঠেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কানাডার প্রথম জয়ে তিনি অসাধারণ হ্যাটট্রিক উপহার দেন। সব মিলিয়ে ১২ জন ফুটবলার তিন আয়োজক দেশের কোনো একটিতে জন্ম নিলেও এবারের বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করেছেন অন্য দেশের।
তবে উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের চেয়ে এগিয়ে ছিল ফ্রান্স। কোচ দিদিয়ে দেশমের ফরাসি স্কোয়াডে সুযোগ না পেয়ে অন্য দেশের জার্সিতে এবার বিশ্বকাপে খেলেছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ৭৪ ফুটবলার। কুরাসাও দলটি এক্ষেত্রে একেবারে ব্যতিক্রম, তাদের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ২৫ জনই নেদারল্যান্ডসে জন্মগ্রহণকারী।
স্পেনের হয়ে ফাইনালে জয়সূচক গোলের পেছনে অবদান রেখেছেন নিকো উইলিয়ামস। বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামসের চেয়ে এই টুর্নামেন্ট তার জন্য ছিল অনেক বেশি রঙিন। ইনিয়াকির দেশ ঘানা কেবল শেষ ৩২ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আবার ইনিয়াকির দল ঘানাকে আলো দেখান আমস্টারডামে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডার ডেরিক লুকাসেন, যার সৎ ভাই ব্রায়ান ব্রোবি আবার নেদারল্যান্ডসের হয়ে যৌথভাবে সর্বাধিক গোলদাতা।
দুই ভাই দেসিরে দুয়ে ও গুয়েলা দুয়ের জন্ম ফ্রান্সের অঁজের শহরে। দেসিরে খেলেছেন ফ্রান্সের হয়ে, আর গুয়েলা ছিলেন আইভরি কোস্ট স্কোয়াডে। একাই কাহিনি স্কটল্যান্ডের সটার পরিবারের প্রযোজ্য। এই পরিবারের দুই ভাই- হ্যারি খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে, আর জন ছিলেন স্কটল্যান্ড টিমে। আসলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সীমানার প্রাচীর এখন একেবারে অর্থহীন।
বিশ্বকাপের এই বহুমাত্রিকতাকে যদি একজন খেলোয়াড়ের মাধ্যমে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে হয়, তবে তিনি ২০ বছর বয়সী নেস্টোরি ইরানকুন্ডা। তানজানিয়ায় জন্ম নেওয়া এই তরুণের বর্তমান ক্লাব ওয়াটফোর্ড। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করে কানাডার মাঠে তুরস্কের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করেন তিনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে খেলার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান সিয়াটলে। তার অনবদ্য পারফরম্যান্স পর্তুগিজ ক্লাব স্পোর্টিং লিসবনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। হয়ত তার পরবর্তী ঠিকানা হতে যাচ্ছে পর্তুগাল।
ফুটবলে জাতীয়তার সংজ্ঞা আর কখনোই এতটা জটিল বা বৈচিত্র্যময় ছিল না। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জাতীয়তা আর কখনো এমন সহজভাবে মিলেমিশে এক হয়েও যায়নি।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিক
- বিষয় :
- ফুটবল