চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, বাউবি শিক্ষার্থী সাব্বিরের চোখের আলো নিভে গেল
ছবি: সংগৃহীত
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ২৩:২৫
ছুটি শেষে বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন (২২)। পথে চলন্ত ট্রেনে দুর্বৃত্তের ছোড়া একটি পাথর তাঁর ডান চোখে লাগে। এতে কর্নিয়ার নিচের শক্ত হাড় ভেঙে গেছে। মাথায়ও গুরুতর আঘাত পেয়েছেন তিনি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এই চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফেরার সম্ভাবনা নেই।
গত মঙ্গলবার বিকেলে পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও কামারখন্দ উপজেলার মধ্যবর্তী দৌলতপুর ইউনিয়নের ছাগলা-পাগলাদহ রেলসেতু এলাকা।
ভুক্তভোগী সাব্বির হোসেন জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামের দুলাল হোসেনের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছোট। তাঁর বাবা একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে কর্মরত। বড় ভাই বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাবার সঙ্গে ঢাকা থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন সাব্বির।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতের পরিবারের লোকজন জানান, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উল্লাপাড়া স্টেশন ছাড়ে দ্রুতযান এক্সপ্রেস। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বাইরে থেকে ছোড়া একটি পাথর ট্রেনের জানালা ভেদ করে যাত্রী সাব্বিরের ডান চোখে লাগে। এতে রক্তাক্ত হয়ে পড়েন তিনি। আতঙ্কিত যাত্রীরা দ্রুত ট্রেনটি জামতৈল স্টেশনে থামিয়ে তাঁকে নামান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাতেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হয়।
চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে পরিবারের লোকজন জানান, আঘাতের তীব্রতায় সাব্বিরের ডান চোখের কর্নিয়া নষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর দৃষ্টিশক্তি আর ফেরানো সম্ভব নয়। মাথার আঘাতের সঠিক মাত্রা জানতে সিটি স্ক্যান করা হয়েছে।
সাব্বিরের বাবা দুলাল হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘চিকিৎসকরা বলেছেন, আমার ছেলের ডান চোখ আর ফিরবে না। চোখের কর্নিয়ার নিচের ওয়ালের হাড় ভেঙে গেছে। এখন রাজধানীর শ্যামলীর একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে হবে। এতে অন্তত দেড় লাখ টাকা লাগবে। আমি সামান্য নিরাপত্তা প্রহরী, এত টাকা কোথায় পাব? ছেলের চোখও গেল, চিকিৎসার খরচও জোগাতে পারছি না!’
সাব্বিরের বড় ভাই সুলতান হোসেন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের একটি চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ওর চিকিৎসা করাতে হবে। কিন্তু চিকিৎসার খরচ অনেক। আমাদের অত টাকা নেই। টাকা কোথা থেকে জোগাড় করবো বুঝতে পারছি না।’ পাথর ছোড়ার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সুলতান।
জানা গেছে, উল্লাপাড়া থেকে কামারখন্দের জামতৈল পর্যন্ত ছাগলা-পাগলাদহ রেলসেতু, চতরার দহ ও ঘাটিনা রেলসেতুসহ কয়েকটি নির্জন স্থানে নিয়মিত বখাটে ও মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এসব স্থান থেকে প্রায়ই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে পাকশী বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবুহেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে এখননও রেল কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছায়নি। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি জানান, রেলপথে দুর্ঘটনা ও নাশকতা প্রতিরোধে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের নিরাপত্তা বিভাগ নিয়মিত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং লিফলেট বিতরণ করছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা তুলনামূলক কম। তারপরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার সিরাজগঞ্জ বাজার রেলওয়ে থানার ওসি খাইরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ জামতৈল স্টেশনে গিয়ে আহতের খোঁজ নিয়েছে। কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা শনাক্তে কাজ চলছে। ভুক্তভোগী পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- সিরাজগঞ্জ