ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রত্নসম্পদ শেখেরটেক হারিয়ে যাচ্ছে ভাঙনে

প্রত্নসম্পদ শেখেরটেক হারিয়ে যাচ্ছে ভাঙনে
×

জোয়ারের পানিতে ভেসে যাচ্ছে শেখেরটেকের বিভিন্ন অবকাঠামো ও গাছপালা। প্রায় হাজার বছর আগে সুন্দরবনের গহিনে মানববসতি ছিল বলে ধারণা করেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা- সমকাল

হাসান হিমালয়, খুলনা

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ১৪:৫১ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ১৫:১৫

সুন্দরবনের ভেতরে প্রায় চারশ' বছরের পুরনো প্রত্নসম্পদ 'শেখেরটেক'। প্রায় ১১০০ বছর আগে গভীর সুন্দরবনের এই অংশে মানুষের বসতি ছিল বলে ধারণা করছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

এ ছাড়া পর্যটকদের আগ্রহ থাকায় শেখেরটেককে ঘিরে একটি পর্যটন কেন্দ্র তৈরির প্রকল্পও নিয়েছে বন বিভাগ। প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে নদী ভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে পুরো স্থাপনা। এরই মধ্যে স্থাপনার প্রায় ২৫ ফুট অংশ বিলীন হয়ে গেছে শিবসা নদীতে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে পুরো এলাকাই এক সময় নদীতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্টরা। এতে অজানাই রয়ে যাবে সুন্দরবনকেন্দ্রিক শত শত বছরের পুরনো মানব সভ্যতার ইতিহাস।

পশ্চিম সুন্দরবনের নলিয়ান ফরেস্ট অফিস হয়ে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করেছে শিবসা নদী। নদী দিয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার নিচে নামলেই বন বিভাগের আদাচাই টহল ফাঁড়ি। এর ৫-৭ কিলোমিটার নিচে নদীর পূর্বপাড়ে শেখেরটেকের অবস্থান।

গত ৮ অক্টোবর শেখেরটেকে গিয়ে দূর থেকে পুরনো ইটের অবকাঠামো দেখা গেল। নদী থেকে নিচে নামতেই বুঝলাম বিশাল গাবগাছ পড়ে আছে। আশপাশের ইটগুলো জোয়ারের পানিতে প্রতিনিয়ত ভেসে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও একটি ইটের তৈরি সীমানা প্রাচীর ছিল। ভাঙনে হারিয়ে গেছে সেটি। ত্রিকোণ আকৃতির এই এলাকা সুন্দরবনের অন্যান্য এলাকা থেকে অনেক উঁচু।

আশপাশ ঘুরে দেখা গেছে, শেখেরটেক জুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রচুর ইট। অক্ষত কয়েকটি ইট পড়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে কোনো স্থানেই  দেয়াল বা মেঝের চিহ্ন নেই।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৪-০৫ সালে শেখেরটেক নিয়ে তাদের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাটির শক্ত গঠন এবং বাদামি আভা দেখে অনুমান করা যায়, এখানে মানববসতি ছিল। ইটের পরিমাপের ওপর নির্ভর করে বিলুপ্ত স্থাপনা মধ্যযুগীয় নির্দশন বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশিষ্ট গবেষক সতীশ চন্দ্র মিত্র তার যশোর-খুলনার ইতিহাস বইতে সুন্দরবনের শেখেরটেকের বর্ণনা দিয়েছেন। বইতে তিনি অনুমান করেন, ১৮০০ সালেও সুন্দরবনের ওই এলাকায় উঁচু প্রাচীরের অস্তিত্ব ছিল। তার ধারণা, এটিই বারোভূঁইয়াদের নেতা রাজা প্রতাপাদিত্যের শিব দুর্গ।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান সমকালকে বলেন, 'সুন্দরবনের আশপাশে অনেক এলাকায় কিছু নির্দশন পাওয়া গেছে, যেগুলো খ্রিষ্টীয় হাজার বা ১১০০ সালের দিকে ব্যবহার হতো। শেখেরটেকের ইট ও স্থাপনার গঠন দেখে মনে হচ্ছে মোগল আমলের শেষ দিকের স্থাপনা। শেখেরটেক নিয়ে এ বছরই কিছু কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কাজ করলে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।'

শেখেরটেক এলাকা সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন। এখানকার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বশির আল মামুন সমকালকে বলেন, 'শেখেরটেকে একটি ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র করতে ২০১৭ সালে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।'

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. মঈনুদ্দিন খান সমকালকে বলেন, 'নদী ভাঙনের বিষয়টি প্রাকৃতিক। সুন্দরবনের ভেতরে খরস্রোতা ওই এলাকায় ভাঙন ঠেকানো সম্ভব কি-না, সেটা পানি উন্নয়ন বোর্ডই বলতে পারবে। শেখেরটেকে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। সেটি পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। প্রকল্প অনুমোদনের পর সরেজমিন গিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'

আরও পড়ুন

×