ভূমিবিরোধ ও দুর্নীতি-২
সিলেটে জালিয়াতরাই শক্তিশালী
মুকিত রহমানী, সিলেট
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ১৫:০১ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ১৫:১৮
ভূমি জালিয়াতি নিয়ে দেশের আলোচিত ঘটনা ছিল সিলেটের তারাপুর চা বাগানের দেবোত্তর সম্পত্তি মামলা। ১৯৮৯ সালে বাগানের প্রায় ৪২১ একর ভূমি সিলেটের ধনাঢ্য ব্যক্তি রাগীব আলী কীভাবে জালিয়াতি করে মালিক হন, তা বের হয়ে আসে দীর্ঘ তদন্ত ও মামলা-মোকদ্দমার পর। ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগে তখনকার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ পাঁচ বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বহুল আলোচিত ওই মামলায় ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে রাগীব আলী তথা ইজারাদার তার ছেলে আব্দুল হাইকে ছয় মাসের মধ্যে বাগান ও বাগানের মধ্যকার স্থাপনা সরানোর নির্দেশ দেন। ছয় মাস গিয়ে তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজও রাগীব আলীকে ছাড়তে হয়নি সেই সম্পত্তি। পরে বাগানের ভূমি আত্মসাৎ ও মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতি মামলায় রাগীব আলী ও তার পরিবারের সদস্যদের সাজাও হয়।
শুধু যে দেবোত্তর সম্পত্তি জালিয়াতি হয়েছে তা নয়, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা, অর্পিত সম্পত্তি ও বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত মামলা ও জালিয়াতি-প্রতারণা হচ্ছে অহরহ। ভূমি জালিয়াত চক্রের কারণে বছরের পর বছর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন মালিক, ইজারাদার ও গ্রহীতারা। সর্বশেষ হিসাবমতে, সিলেটের সহকারী কমিশনার (ভূমি), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আদালতে দুই হাজার বিভিন্ন ধরনের মামলা চলমান রয়েছে। সেটেলমেন্টে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আরও ১০ হাজারের মতো ৩০ ও ৩১ ধারাসহ বিভিন্ন ধরনের মামলা। কখনও কাগজপত্র জাল করে, কখনও টাকার বিনিময়ে ভুল তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এসব করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে সংশ্নিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাত।
সিলেটে সরকারি মালিকানাধীন ন্যাশনাল টি কোম্পানি লাক্কাতুরা চা বাগানের ২৬ একর ভূমি স্মারক জালিয়াতির মাধ্যমে সম্প্রতি নামজারি করে নেয় একটি চক্র। ২০০ কোটি টাকা মূল্যের ওই জায়গা ২০১৭ সালে শামসুজ্জামান চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির অনুকূলে নামজারি করা হয়। স্থানীয় তহশিল অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কাজটি সম্পন্ন করেন শামসুজ্জামান। জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ার পর গত ফেব্রুয়ারিতে জেলা প্রশাসক সেই নামজারি বাতিল করেন। এ ব্যাপারে ন্যাশনাল টি কোম্পানির এমডি আবদুল আউয়াল বলেন, 'লাক্কাতুরা চা বাগানের ভূমি সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে।' তিনি বলেন, কেবল জাল নামজারি বাতিল করলেই হবে না, এ জমি জালিয়াতির পেছনের চক্রকে ধরতে হবে। চা বাগানের জায়গা নামজারি সম্পন্নের সময় সিলেট সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে দায়িত্বে থাকা খালেদা খাতুন রেখা কর্মস্থল পরিবর্তন করায় তার বক্তব্য মেলেনি। তবে সদর উপজেলা ভূমি অফিসের নাজির দেবাংশু চক্রবর্তী জানান, তহশিল অফিসের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নামজারি করা হয়ে থাকে। অফিসের কেউ এর সঙ্গে জড়িত নয় বলে তিনি জানান।
সিলেট নগরীর ১৮৩/১ পশ্চিম পীরমহল্লার বাসিন্দা সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হরিণাপাটি গ্রামের মরহুম রাজাওর রহমান চৌধুরীর ছেলে বখতিয়ার রাজা চৌধুরীর জীবনে অন্ধকার নিয়ে এসেছে সিলেটের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও অবসরপ্রপ্ত শিক্ষক বখতিয়ার রাজা চৌধুরী তার ২৫ একর জমির মালিকানাই হারিয়েছেন। তার সৎভাই আনোয়ার রাজা চৌধুরী আদালতের একটি রায়কে জালিয়াতি করে চলমান জরিপকালে সেটেলমেন্টে উপস্থাপন করে তার মায়ের পুরো অংশ প্রায় ২৫ একর জমি গ্রাস করেন। তিনি সমকালকে বলেন, ২০০৭ সালে সেটেলমেন্ট জরিপের সময় সিলেট শহরে থাকা সত্ত্বেও দুই ভাইয়ের নামে মাঠ পর্চা সঠিকভাবেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তসদিকের সময় বিপুল পরিমাণ টাকার বিনিময়ে সেটেলমেন্ট কর্মকর্তারা তাদের মা-বাবার রেকর্ডীয় জমি আনোয়ার রাজা চৌধুরীসহ কতিপয় লোকের নামে করিয়ে দেন। তার ছোট ভাই হুসেন রাজা চৌধুরী সেটেলমেন্ট অফিসে দ্বারে দ্বারে ঘুরে অসুস্থ হয়ে অবশেষে মৃত্যুবরণ করেন। তসদিক অফিসার হুমায়ূন কবির তাদের কাছে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় বাড়ি ও জমি থেকে বঞ্চিত হন তিনি। তিনি জানান, ১১ জুলাই তৃতীয়বারের মতো সরেজমিন তদন্ত করতে সিলেটের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার সৈয়দ ফারুক আহমদসহ ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সুনামগঞ্জে যান। কিন্তু গ্রামে না গিয়ে ও বক্তব্য না শুনে একটি বাজারে বসে তদন্ত শেষ করে সিলেট চলে আসেন। তসদিক অফিসারকে পাওয়া না গেলেও জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার সৈয়দ ফারুক আহমদ অভিযোগ প্রসঙ্গে জানান, যারা মালিক তাদের নামেই ভূমি দেওয়া হয়েছে। কারও কাছ থেকে বাড়তি সুবিধার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
৪০ বছর ধরে 'ভূমিহীন' 'ভূমিখেকো' লড়াই চলছে সিলেট সদরের খাদিমপাড়ার বহর কলোনি এলাকায়। সরকারি ৩০ একর জমি দখল নিয়ে বছরের পর বছর চলছে উভয়পক্ষের টিকে থাকার লড়াই। সদর উপজেলার বহর মৌজার জেএল নং-৭০, খতিয়ান-১ ও ১৪২ নং দাগে ৩৮ একর ভূমি রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ আমলে ওই জায়গা থেকে মোহাজেরদের জন্য ৮ একর ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করেন তৎকালীন এডিসি (রাজস্ব)। বাকি ৩০ একরের মধ্যে ১৯৬৬ সালে আলাউদ্দিন ও আনোয়ার আহমদ ৯ একর ৭৫ শতক করে এবং আবদুল হান্নান, আবদুল খালিক ৪ একর ৮৮ শতক করে ও রহমান আলী ৯৯ শতক ভূমি বাগান করার নামে বন্দোবস্ত নেন। অবশিষ্ট ১৪ একর ৩৮ শতক থেকে যায় বন্দোবস্তহীন। বন্দোবস্ত গ্রহীতারা ৮০ ও ৯০ দশকে বাগান না করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে জমি বিক্রি করে দেন। অথচ বিভিন্নজনের কাছে বিক্রির আগেই ১৯৯৭ সালে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বন্দোবস্ত বাতিল করেন। এ ছাড়া সরকারি জায়গা বন্দোবস্ত নিয়ে বিক্রি করার কোনো নিয়মও নেই। এ পর্যন্ত বন্দোবস্ত গ্রহীতাদের দাতা দেখিয়ে ওই জায়গার অর্ধশত দলিল সম্পাদিত হয়েছে। বহর পশ্চিম ভূমিহীন সমিতির সভাপতি শাহ নজরুল ইসলাম চিশতি সমকালকে বলেন, 'বন্দোবস্তের জায়গা বিক্রির বিধান নেই। আমরা বছরের পর বছর ধরে বন্দোবস্ত নেওয়ার চেষ্টা করছি আর ভূমিখেকোরা আমাদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছে। বিষয়টির কোনো সুরাহা হচ্ছে না।' এ প্রসঙ্গে বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাছির উল্লাহ খান জানান, বহর এলাকার জায়গা বন্দোবস্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে তার খোঁজ নেওয়া হবে। চলমান মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৯৬৩ সালে কোম্পানীগঞ্জের বনপুর মৌজার ১, ৩, ৪, ৫, ৮, ৯, ১০, ১১ নং দাগে ২০ একর অকৃষি ভূমি ২৫ বছরের বন্দোবস্ত গ্রহণ করে সেখানে একটি বাগান সৃষ্টি করেন নগরীর মিরের ময়দানের বাসিন্দা সাবেক এডিএম ও জেলা প্রশাসক মরহুম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাগানটি এডিএমের বাগান হিসেবে পরিচিত। ইজারার মেয়াদ থাকাবস্থায় মালিককে না জানিয়ে ২০০৫ সালে স্থানীয় ভূমি অফিস ইজারা বাতিল করে। সর্বশেষ ২০০৯ সালে বাগান মালিক সিরাজুল ইসলামের ছেলে অবসরপ্রাপ্ত সচিব সাইফুল ইসলাম চৌধুরী হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নং-৩৪৮৩) করেন। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসাইন ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম দীর্ঘমেয়াদি ইজারা নবায়নসহ সরকারকে খাজনা গ্রহণের নির্দেশ দেন। খাজনা গ্রহণের নির্দেশ বাস্তবায়ন না করে জেলা প্রশাসন আপিল করে। উচ্চ আদালতের আপিলের রায়ও পান ইজারাদার। সুপ্রিম কোর্টে সম্প্রতি রিভিউ করে সরকার পক্ষ। রিভিউর শুনানি এখনও হয়নি। দীর্ঘ ১৪ বছরেও বাগান বুঝে পায়নি মালিক পক্ষ। পক্ষান্তরে স্থানীয় একটি পাথরখেকো চক্র বাগানের ভেতর থেকে গর্ত করে পাথর উত্তোলন করে আসছে। সাইফুল ইসলাম চৌধুরী আমেরিকায় থাকায় তার বক্তব্য মেলেনি। তার আত্মীয় সুজা চৌধুরী সমকালকে বলেন, বাগানটি ধ্বংসের পথে। ১৪ বছর ধরেই মামলা পরিচালনা করছি। সর্বোচ্চ আদালতের রায় থাকার পরও আমাদের খাজনা নেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় তহশিল অফিসের মদদে বিভিন্ন ব্যক্তি বাগানের জায়গা ২০১০ সালে একসনা ইজারা নেয় (যদিও পরবর্তীকালে নবায়ন হয়নি)। এটা কীভাবে ইজারা দেয় উপজেলা প্রশাসন? একজনের জায়গা আরেকজনকে ইজারা দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ ও আদালত অবমাননার শামিল। কয়েক মাস ধরে উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে ধরনা দিতে দিতে ক্লান্ত। সম্প্রতি একটি অভিযান করেই দায়িত্ব শেষ করেন প্রশাসনের কর্মকর্তা। তখনকার তহশিলদার সেলিম মোস্তফার সহায়তায় অবৈধভাবে বন্দোবস্তের কাজটি সম্পন্ন হয়। বর্তমানে তিনি কর্মস্থলে না থাকায় তার বক্তব্য মেলেনি।
নগরীর আখালিয়ার বাসিন্দা সাহেদ আহমদ ও সুজাত আহমদ শহরতলির চাতল এলাকায় ৩০ শতক জায়গা কেনেন ১৯৯১ সালে। একই মালিকের কাছ থেকে হিরন সত্তার নামে আরেক ক্রেতা '৯২ সালে একই দাগে জায়গা কেনেন। এ নিয়ে সেটেলমেন্টে মামলা চলে। সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও রায় তার বিপক্ষে যায় বলে জানিয়েছেন সাহেদ আহমদ। তিনি জানান, সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিন ও তার অধীন কর্মকর্তাদের কারণে শতশত লোক জায়গাজমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আমরা ন্যায়বিচার পাচ্ছি না।
সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজার এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুমের ৫৭ শতক জায়গা যোগাযোগীমূলে একাধিক দলিল তৈরি করে একটি চক্র। তারা জায়গা দখল করে নামজারিও করিয়ে নেয়। এক বিএনপি নেতা ওই জায়গার একাংশে কমিউনিটি সেন্টারও করেন। জায়গা বেহাত হওয়ায় তিনি আট বছর আগে নামজারি বাতিলের মামলা করেন। আপিল করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কাছে। ২০১২ সালে আপিলেও হেরে যান তিনি। অনেকটা অভিমান করে আর রিভিউ করেননি কাইয়ুম। তিনি সমকালকে জানান, টাকার কারণে তিনি মামলায় হেরে গেলেন।
নগরীর নয়াবাজার এলাকায় অপু ভট্টাচার্য টুকেরবাজার মৌজার খতিয়ান নং-৭৬ ও দাগ নং ৩৮ এর মোট ১০৬ শতক জায়গার মালিক। আদালতের ডিগ্রি পাওয়ার পর ২০১৭ সালে ৮০ ডিসিমেল জায়গা ?নামজারিও করিয়ে নেন। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল আহমদ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) আদালতে মামলা করেন। বাস্তবে তিনি ওই দাগের ২৬ ডিসিমেলের মালিক। কিন্তু ৮০ ডিসিমেলের মালিকানা দাবি করে হেলাল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছেন। ফলে অপু তার সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারছেন না। একই এলাকায় ৪২৩ ডিসিমেল জায়গার মালিক আশিষ চক্রবর্তী। দ্বিতীয় সাবজজ আদালতের ডিক্রিমূলে ২০১৭ সালে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নামজারিও করেন তিনি। উত্তরাধিকার দাবি করে ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে মামলা করে বসেন তন্ময় চক্রবর্তী নামে এক ব্যক্তি। ফলে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত পাননি আশিষ। এভাবে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে আছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে হাজারখানেক নামজারি ও বিবিধ মোকদ্দমা, এডিসিতে ৫-৬শ' ও অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে দুই শতাধিক এবং সেটেলেমেন্টে ১০ হাজারের মতো মামলা ঝুলে আছে বলে সংশ্নিষ্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে।
- বিষয় :
- ভূমিবিরোধ ও দুর্নীতি
- সিলেট
- জালিয়াত