ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

আকবরের শোকের বাড়ি এখন সুখের নীড়

আকবরের শোকের বাড়ি এখন সুখের নীড়
×

আকবরের জার্সি হাতে তার বাবা-মা ও ভাইয়েরা- সমকাল

মেরিনা লাভলী, রংপুর ও বিপুল সরকার, দিনাজপুর

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০৯:০৮ | আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০৯:২৭

বসন্তের নবপ্রাতে রুক্ষ বৃক্ষে যেমন উঁকি দিচ্ছে কচি পাতা; ঝিরঝির কাঁপছে স্নিগ্ধ হাওয়ায়, বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে, মাঠে-ঘাটে, আনাচে-কানাচে তেমনই হর্ষধ্বনি। শিশু-বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সবাই আনন্দে উদ্বেলিত; উল্লাসে বিস্ফোরিত। এ আনন্দ, এ উল্লাস বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম বিশ্বজয়ে, হোক সেটা যুবাদের। তবে যিনি এই জয়ের নায়ক, সেই আকবর আলীর বাড়িতে আনন্দের রংটা অন্যদের থেকে আলাদা হবে, এটাই স্বাভাবিক। আকবরের রংপুরের পশ্চিম জুম্মাপাড়ার বাড়িটা যেন এক তীর্থক্ষেত্র। যুদ্ধক্ষেত্রে যিনি বীর, তার বাড়ি তীর্থক্ষেত্র হবে- এটাই ইতিহাসের নিয়ম। তাই সব পথ, সব মত এসে মিশেছে আকবরের বাড়িতে। সঙ্গে জনতার জয়োল্লাস- 'বাংলাদেশ বাংলাদেশ, আকবর আকবর, আকবর দ্য গ্রেট'।

সোমবার সকাল থেকেই এমন দৃশ্য আকবরের পশ্চিম জুম্মপাড়ার বাড়ির সামনে। এদিন রংপুরবাসী এখানে জড়ো হয়ে শহরে বের করে বিশাল আনন্দ মিছিল। এদিকে যুব ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ে আরেক গর্বের নাম দিনাজপুরের বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)। এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের অধিনায়ক আকবরসহ আট খেলোয়ারই এসেছেন এই প্রতিষ্ঠান থেকে। তাই আনন্দের জোয়ারে ভাসছে দিনাজপুরের বিকেএসপিও।

গত একটি মাস কী ভয়ঙ্কর শোকের মধ্যেই না পার করেছে আকবরের পরিবার। গত ২২ জানুয়ারি যেদিন পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা চলছিল, সেদিন আকবরের বোন খাদিজা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। একমাত্র মেয়ের অকাল মৃত্যুতে শোক নেমে আসে পুরো পরিবারে। প্রিয় বোনকে হারিয়েও মনের ভেতর তীব্র শোককে দূরে ঠেলে দিয়েছেন অপ্রতিরোধ্য আকবর। শোককে শক্তিতে পরিণত করে ২২ গজের পিচে দেশের হয়ে লড়াই করে গেছেন বীরবিক্রমে। তার সেই দৃঢ় মনোবলে বাংলাদেশ আজ অনূর্ধ্ব-১৯ কিক্রেটে বিশ্বজয়ী। পুরো বাংলাদেশের সঙ্গে নিজের শোকার্ত পরিবারেও তিনি এনে দিয়েছেন আনন্দের বারতা। ক্রিকেটে দেশের হয়ে প্রথম ইতিহাস রচনাকারীদের সেনাপতি হিসেবে নাম লেখালেন তিনি।

আকবরের মা শাহিদা বেগম সমকালকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই আশা ছিল সে ক্রিকেটার হবে। পরিবারের সবাই তাকে উৎসাহ দিতাম। সব সময় ব্যাট-বল নিয়ে ছুটতো। ছেলের হাত ধরে বিশ্বকাপ জয় করল বাংলাদেশ। এই দুঃখের দিনে আমাদের এটি বড় পাওয়া। আমার মেয়ে হারানোর বেদনা কিছুটা হলেও কমেছে। আবর আরও উপরে উঠুক, দেশবাসীকে আরও বড় স্বপ্ন পূরণের স্বাদ দিক- এটাই প্রত্যাশা।

আকবরের বাবা ফার্নিচার ব্যবসায়ী মো. মোস্তফা বলেন, আল্লাহ তাকে কবুল করেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জয়ে আমি অত্যন্ত খুশি, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তার এ সাফল্যের পেছনে ক্রিকেট বোর্ড, কোচদের অনেক অবদান রয়েছে। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রিকেটকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। মুজিববর্ষে বিশ্বকাপ জয় আমাদের জন্য একটি বড় পাওয়া।

তিনি বলেন, আকবরকে মাদ্রাসায় দিয়েছিলাম। বড় ছেলের পরামর্শে তাকে মাদ্রাসা থেকে এনে স্কুলে ভর্তি করাই। ছেলেকে ক্রিকেটে আনতে তার মায়েরও বেশ আগ্রহ ছিল। পরিবারের সবার চাওয়া ছিল সে বড় ক্রিকেটার হোক। বিকেএসপিতে ভর্তির সময় আকবরের ছোট চাচা ৫০ হাজার টাকা দিয়ে খেলার বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনে দিয়েছিল। এরপর বিকেএসপি থেকে বলা হয়েছিল, আকবর ৭০ মার্কস তুললে সব ফ্রি করে দেওয়া হবে। ছেলে পড়াশুনা ও খেলাধুলায় ১০০ মার্কস তুলে ফেলল। এরপর থেকে তার সবকিছুই ফ্রি করে দিয়েছিল বিএকেএসপি। মো. মোস্তাফা বলেন, ছেলের জন্য আজ আমি ধন্য। আমি চাই সব বাবা-মার সন্তান একেকটি আকবর হয়ে উঠুক।

আকবরের বড় ভাই মুরাদ হোসেন বলেন, আমি রংপুরে ক্রিকেট খেলতাম। এরপর খুলনায় গিয়ে প্রিমিয়ার লীগে খেলি। ঢাকায় দ্বিতীয় বিভাগেও খেলেছি। ২০১৭ সালে খেলাধুলা ছেড়ে দেই। আকবরের ক্রিকেটের প্রতি নেশা দেখে সিদ্ধান্ত নেই তাকে বিকেএসপিতে দেব। আমি নিজে না পারলেও আকবর পেরেছে। তার জন্য গর্ব বোধ করি।

আকবরকে ক্রিকেটে অনুপ্রেরণা দেওয়া আরেক ভাই আরমান হোসেন বলেন, ক্রিকেটের প্রতি বাবার একটু আপত্তি ছিল। আজ তাকে নিয়ে আমাদের পরিবারের সবাই খুশি।

এদিকে আরেক গর্বের নাম বিকেএসপির দিনাজপুর আঞ্চলিক কেন্দ্র। ২০২০ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক আকবর আলীসহ দলের আট খেলোয়ার জীবনের প্রথম হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এখান থেকেই। তারা হলেন- পারভেজ হোসান ইমন, প্রান্তিক নওরোজ নাবিল, শাহীন আলম, হাসান মুরাদ, আশরাফুল ইসলাম সিয়াম, শামীম পাটোয়ারী ও তানজিম হাসান সাকিব। বিশ্বকাপ জয়ে খুশি এখানকার শিক্ষক ও ক্রিকেট কোচরা।

বিকেএসপির দিনাজপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রের উপ-পরিচালক আখিনুর জামান বলেন, তারা এখান থেকে কিছু শিখে গেছে। এজন্য আমরা সত্যিই গর্বিত। কেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক ময়নুল ইসলাম বলেন, এখানে থাকা অবস্থায় আকবরের পারফরমেন্স বেশ ভালো ছিল। সবসময় নিজেকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। আকবর ছিল খেলাপাগল। সবসময় কথা বলারও চেষ্টা করত। মাইক্রোফোন হাতে পেলেই সবার আগে গিয়ে কথা বলত। তার মধ্যে শেখা ও জানার ছিল অদম্য কৌতূহল। কেন্দ্রের ট্যালেন্ট হার্টিং কোচ ইফরান জাহান সোহাগ বলেন, তারা বিকেএসপিকে গর্বিত করেছে। এভাবেই জাতিকে তারা সামনের দিকে নিয়ে যাবে এটাই প্রত্যাশা।

বিকেএসপির এই কেন্দ্রের ক্রিকেট কোচ আফতার ইমাম সোহেল আনোয়ার ডিয়ার বলেন, আকবর আলী নিজের যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তায় অনূর্ধ্ব ১৪, ১৬ ও ১৮তেও নেতৃত্ব দিয়েছে। আজ তারা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী। তাদের এ সাফল্যে আমরাও গর্বিত।

আরও পড়ুন

×