উদ্যোগ
নারীর বন্ধুতায় মিটছে নিরাপদ পানির তৃষ্ণা
বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরছেন নারীরা। খুলনার দাকোপ উপজেলার বারুইখালী এলাকার ছবি-সমকাল
জাহিদুর রহমান, দাকোপ (খুলনা) থেকে ফিরে
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২২ | ১২:০০
বারুইখালী। গ্রামটিতে যেতে মাড়াতে হবে খুলনার দাকোপ উপজেলা সদর থেকে ছয় কিলোমিটার পথ। পিচঢালা রাস্তা ধরে যেতে যেতে চোখে পড়ে জলহীন পুকুর, কোথাও কোথাও জংধরা টিউবওয়েল। তপ্ত রোদে সব শুকিয়ে কাঠ, কোথাও নেই তৃষ্ণার জল। এর মধ্যেই কলসি কাঁখে হাঁটছে একদল নারী।
দলবদ্ধ নারীর একজন হাজেরা খাতুন। আঁচলে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে হাজেরা জানান, পানির বেশি টানাটানি পড়ে গ্রীষ্ফ্মে। ছয় সদস্যের দরিদ্র পরিবারটির নিত্যকাজের পানি জোগানোর কাজটা বর্তায় তাঁর ওপর। খাওয়ার পানি আনেন দুই কিলোমিটার দূরের পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট থেকে।
হাজেরার সঙ্গে কথা বলতে বলতে পড়ন্ত বিকেল। কারও হাতে একটি-দুটি কলসি, কারও তিন থেকে পাঁচটি। কারও কাছে আবার বড় ড্রাম। দূরদূরান্ত থেকে সবাই ছুটছেন সুপেয় পানির খোঁজে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুপেয় পানির সংকট দূর করতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উপজেলায় অনেক উদ্যোগই নেওয়া হয়েছে। কোনোটিই তেমন কাজে আসেনি। প্রায় সব এলাকায় নলকূপ স্থাপন করা হলেও তাতে মিঠাপানি ওঠে না। একমাত্র বারুইখালী গ্রামের রিভার্স অসমোসিস বা আরও প্লান্টে খাবার উপযোগী পানি মিলছে। এটি ২০১৯ সালে স্থাপন করে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন। সংস্থাটির নবযাত্রা প্রকল্পের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহের এ কাজ চলছে। প্রকল্পে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসএআইডি। আশপাশের গ্রামের দৈনিক ২ হাজারের বেশি মানুষ এই প্লান্ট থেকে পানি সংগ্রহ করেন। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। এখানে ভূগর্ভস্থ নোনাপানি তুলে ছয়টি স্তরে পরিশোধন করে সরবরাহ করা হয়। এ প্লান্ট থেকে পানি নিতে প্রতি লিটারে ৪০ পয়সা দিতে হয়। মাসে এক পরিবারের পানির জন্য খরচ হয় ১৬০ টাকার মতো।
এই টাকা দিতে কোনো অসুবিধা নেই বলে জানান গৃহবধূ আরতী রানী রায়। তিনি বলেন, 'আগে গ্যাস, আমাশয়ে যে টাকা খরচ হইত, তার চেয়ে এই পানির দাম অনেক কম। এখন সেই সব অসুখ আর নেই। আর এখন ১৫ থেকে ২০ মিনিটে পানি পাচ্ছি।'
খুলনার দাকোপ ছাড়াও কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও কালিগঞ্জের ৪০টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ এখন হাজেরা ও আরতী রানীর মতো পানির কষ্ট ভুলেছেন। আরও প্লান্টসহ সাত ধরনের পানির আধারের মাধ্যমে এসব মানুষকে সুপেয় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। মা ও শিশুস্বাস্থ্য এবং পুষ্টি, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিস্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি চর্চা, কৃষি ?ও জীবিকায়ন, দুর্যোগ ঝুঁকি কমানো, সুশাসন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নারী-পুরুষ সমতা- এই পাঁচ বিষয় আছে নবযাত্রা প্রকল্পে। দাকোপের পানখালীর বারুইখালীতে আছে লবণাক্ততা দূরীকরণ প্লান্ট এবং চমক কমিউনিটি বেজড অর্গানাইজেশন (সিবিও) পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট। চার উপজেলায় আছে আর্সেনিক ও আয়রনমুক্ত প্লান্টও (এআইআরপি)। এ ছাড়া আরও পাঁচ পদ্ধতিতে পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করা হয়। এগুলোর মধ্যে আছে- গভীর নলকূপ, পোলার স্যান্ড ফিল্টার, সোলারপন্ড স্যান্ড ফিল্টার, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা ও সমাজভিত্তিক পানি সরবরাহ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পানি ব্যবস্থাপনায় মূল দায়িত্বে আছেন নারীরা। যেমন রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট ব্যবস্থাপনায় আছে ২২ সদস্যের কমিটি। এর মধ্যে সভাপতি, সচিব, কোষাধ্যক্ষসহ ১২ জনই নারী।
বারুইখালী গ্রামের চমক সিবিও রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শিল্পী গোলদার বলেন, 'সেই ছেলেবেলা থেকে পানির কষ্ট করতে দেখতিছি এ গ্রামের মানুষকে। আমরা নারীরা এই কষ্ট সবচেয়ে বেশি ভোগ করি। এই প্লান্ট সেই কষ্ট ভুলিয়েছে।'
নবযাত্রা প্রকল্পের ওয়াশ (পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) খাতের কারিগরি পরামর্শক মো. আয়াতুল্লাহ আল মামুন বলেন, চার উপজেলায় ১০টি রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট আছে। এসব স্থাপনা স্থানীয় মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার আগে দুই দফায় পানির মান পরীক্ষা করা হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচও) এই প্রকল্পের ল্যাবরেটরিতে গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়। মান নিশ্চিত হলেই উপকারভোগীদের কাছে স্থাপনা হস্তান্তরিত হয়। ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। ডিপিএইচওর সঙ্গে করা হয়েছে পার্টনারশিপ স্থাপন।
নবযাত্রা প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। শেষ হবে আগামী সেপ্টেম্বরে। এর মধ্যে প্রকল্পটির অর্জন নিয়ে জরিপ করেছে ওয়ার্ল্ড ভিশন। তাদের কর্ম এলাকায় আগে ৫২ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানি পেত, সেটি এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৯ শতাংশে।
- বিষয় :
- উদ্যোগ
- পানির তৃষ্ণা
- নিরাপদ পানি
