ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

খুলনা উপকূল

নতুন বেড়িবাঁধে ভাঙন কোটি টাকা জলে

নতুন বেড়িবাঁধে ভাঙন কোটি টাকা জলে
×

খুলনার দাকোপ উপজেলার গুনারী গ্রামের কালীবাড়ি এলাকায় শনিবার নতুন বাঁধের ৫০ মিটার অংশ নদীতে ধসে যায়-সমকাল

হাসান হিমালয়, খুলনা

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১৫:৪৫

টেকসই বেড়িবাঁধের জন্য খুলনা উপকূলের মানুষের কয়েক যুগের অপেক্ষা। একটা সময় তাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসে বিশ্বব্যাংক। প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয় খুলনার দাকোপের দুটি বাঁধ (৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডার)। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই কাজ শেষ হয় গত ৩০ জুন। তবে কাজ শেষ হওয়ার তিন মাস না যেতেই ধসে যাচ্ছে নতুন বাঁধ। গত আগস্টে বাঁধের ৩২ নম্বর পোল্ডারের একাধিক জায়গা ধসে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও পাঁচ এলাকা। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ৩৩ নম্বর পোল্ডারের বাজুয়া ইউনিয়নের চুনকুড়ি খেয়াঘাটের পাশে ১০০ মিটার বাঁধ ধসে যায়।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, যত বড় প্রকল্প, কাজ তত ভালো হয়নি। অধিকাংশ স্থানে পুরোনো বাঁধের ওপর মাটি দিয়ে কাজ শেষ করা হয়েছে। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলেও প্রায় এলাকায় কাজ করেছেন তাদের নিয়োগ করা দেশীয় উপ-ঠিকাদাররা। ফলে তদারকি ছিল দুর্বল।

বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দেওয়ায় এখন টনক নড়েছে পাউবোর। বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে নদীশাসনের নতুন প্রকল্প নিচ্ছে সংস্থাটি। ভাঙনকবলিত সাত কিলোমিটার অংশে নদীশাসন করতে আপাতত খরচ ধরা হয়েছে ১৫২ কোটি টাকা। এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

এলাকাবাসী জানান, বাঁধ নির্মাণের আগে ভাঙনের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নির্মাণের সময় গ্রামের মানুষ ও জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করে নদীশাসনের দাবি তোলেন। স্থানীয়রা সে সময় বলেছিলেন, খরস্রোতা নদীগুলো শাসন না করে বাঁধ নির্মাণ করলে তা টিকবে না। বাঁধের পেছনে শতকোটি টাকা খরচের আগে নদীশাসন জরুরি। ওই সময় গ্রামের মানুষের কথা গুরুত্ব দেননি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা।

কয়েক দিন ওই এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। উপকূলের মানুষ এখনও বলছেন, মাত্র সাত কিলোমিটার অংশ নদীশাসন করে পুরো বাঁধ রক্ষা করা সম্ভব নয়। কারণ প্রতিবছরই নতুন জায়গায় বাঁধ ভাঙছে। কিছু এলাকায় নদীশাসন করলে অন্য এলাকায় ভাঙন বাড়বে কিনা, তা নিয়েও কোনো সমীক্ষা হয়নি। সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার এই বাঁধ, উপকূলের মানুষ ও সম্পদ বাঁচাতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি অংশে নদীশাসন জরুরি। পাশাপাশি যেসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে, দ্রুত ওই অংশ মেরামত করতে হবে। তবে এবারও স্থানীয়দের কথা কানে তুলছেন না কর্মকর্তারা।

তিন মাস না যেতেই বাঁধে ধস: খুলনাসহ উপকূলীয় ছয় জেলার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৩ সালে। বিশ্বব্যাংক উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পে (সিইআইপি, ফেজ-১) অর্থায়ন করে। প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা দিয়ে ১৭টি বাঁধ (পোল্ডার) নির্মাণ করা হয়েছে। এর আওতায় দাকোপের ৩২ নম্বর পোল্ডারে ৪৯ দশমিক ৬৬ কিলোমিটার এবং ৩৩ নম্বর পোল্ডারে প্রায় ৫০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়।

বাঁধ নির্মাণ ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় ৩২ নম্বর পোল্ডারে ১৫ কালভার্ট ও স্লুইসগেট নির্মাণ, ৩ দশমিক ৩০০ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, ১৭ কিলোমিটার খাল খনন এবং দুই কিলোমিটার নদীশাসন করা হয়েছে। ৩৩ নম্বর পোল্ডারে বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ৬২ কিলোমিটার খাল খনন, ২১ কালভার্ট ও স্লুইসগেট, চার কিলোমিটার ঢাল সংরক্ষণ এবং ১ দশমিক ৩০০ কিলোমিটার নদীশাসন করা হয়েছে।

ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাজ শেষ হওয়ার তিন মাস না যেতেই বাঁধের বিভিন্ন অংশে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে বাঁধের ভাঙন রক্ষায় কাজ করছে পরামর্শক সংস্থা।

স্থানীয়রা জানান, গত ২৪ আগস্ট গুনারি কালীবাড়ি অংশে ৫০ মিটার ধসে যায়। এর আগে ধসে গেছে পাশের ১০০ মিটার বিভিন্ন অংশ। ধসে যাওয়া অংশের দুই পাশের মাটিতেও বড় ধরনের ফাটল চোখে পড়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, এতদিন ভাঙন ছিল শুধু ৩২ নম্বর পোল্ডারে। গত বৃহস্পতিবার ৩৩ নম্বর পোল্ডারেও শুরু হয়েছে ভাঙন। বাজুয়া ইউনিয়নের চুনকুড়ি খেয়াঘাটের পাশে ১০০ মিটার বাঁধ নদীতে ধসে যায়।

হতাশ স্থানীয়রা: নতুন দুটি বাঁধের সবচেয়ে বেশি ভেঙেছে ৩২ নম্বর পোল্ডার। এই বাঁধের ভেতরে সুতারখালী ও কামারখোলা ইউনিয়নের প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বাস। দ্বীপ ইউনিয়ন দুটির চারপাশেই খরস্রোতা শিবসা, ভদ্রা, ঢাকী ও সুতারখালী নদী। বাঁধের একটি অংশ ভাঙলেই দুটি ইউনিয়নের মানুষ, হাজার কোটি টাকার সম্পদ নোনাপানিতে তলিয়ে যাবে। এজন্য যে কোনো একটি স্থানে ভাঙন ধরলে ভীতি ছড়ায় সব মানুষের মনে।

সুতারখালী পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি নিরেন্দু মণ্ডল বলেন, বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হলে আমরা এলাকার মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিলাম। তবে কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা হতাশ। কিছু এলাকায় কাজ হয়েছে যাচ্ছেতাই। আমার বাড়ির সামনেই পুরোনো বাঁধের দু'পাশে মাটি দিয়ে কোনো রকম কাজ করেছে। তিনি বলেন, আমার বাড়ি, তেলিখালী বাজারে সামনে বালু দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করেছে। প্রতিবাদ করায় আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে সংশ্নিষ্টরা। পাউবো কর্মকর্তাদের জানিয়েও কাজ হয়নি।

দাকোপের গুনারী শীতল চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আদিত্য নারায়ণ সরদার বলেন, কাজ শুরুর সময়ই নদীশাসনের দাবিতে আমরা আন্দোলন করেছি। তারা আমাদের কথা শোনেনি। কোটি কোটি টাকা খরচের পর সেই টাকা পানিতে চলে যাচ্ছে। নদীশাসন না করলে যত টাকাই খরচ করুক, বাঁধ টেকানো যাবে না।

সুতারখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির বলেন, বাঁধে ধস লাগলে আমরা পাউবো কর্মকর্তাদের খবর দেই। কালীবাড়ি এলাকায় বাঁধ ধসের খবর আগে জানিয়েছি, তারা গুরুত্ব দেয়নি।

পাউবো যা বলছে: উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, এই অঞ্চলের নদীর গতি-প্রকৃতি ভিন্ন। সমীক্ষা করা হয়েছিল ২০১২-১৩ অর্থবছরে। ওই সময়ের নদীর গতি-প্রকৃতির সঙ্গে এখনকার কোনো মিল নেই। কাজ শুরুর সময় এসব এলাকায় ভাঙনের কোনো লক্ষণ ছিল না। নদীর স্রোত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে- এ কারণে নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন বাড়ছে।

তিনি বলেন, কাজ চলা অবস্থায় ভাঙন দেখেই দুটি পোল্ডারের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকায় নদীশাসন করা হয়েছে। নতুন করে আরও সাত কিলোমিটার এলাকায় তীর সংরক্ষণের জন্য প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। আপাতত ভাঙনকবলিত এলাকায় বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। সার্বিক পরিস্থিতি বোর্ডকে জানানো হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) সৈয়দ হাসান ইমাম। তিনি রাজধানীর পানি ভবনে বসেন। তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তিনি ফোনে যুক্ত হননি। 

আরও পড়ুন

×