ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

শুক্কুর আলীর শিকলে বাঁধা জীবন

শুক্কুর আলীর শিকলে বাঁধা জীবন
×

টাঙ্গাইলের দিগরবাইদ পশ্চিমপাড়া গ্রামে এভাবেই ১৫ বছর ধরে শিকলবন্দি শুক্কুর আলী-সমকাল

আনছার আলী, মধুপুর (টাঙ্গাইল)

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২০ | ১২:৪৫

সুস্থ-স্বাভাবিক থাকলে শুক্কুর আলী আজ থাকত ৩৩ বছরের টগবগে যুবক। ঘর-সংসার শুরু করলে ছেলেমেয়ের বাবাও হতো। এর কোনো স্বাদ-আহদ্মাদই শুক্কুরের কপালে জোটেনি। সেই কিশোর বয়স থেকে ১৫ বছর ধরে শুক্কুর আজ শিকলবন্দি। অথচ কিশোর শুক্কুর একসময় মাঠ-ঘাট-বনবাদাড় দাপিয়ে বেড়াত।
শুক্কুর আলী টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার আলোকদিয়া ইউনিয়নের দিগরবাইদ পশ্চিমপাড়া গ্রামের দরিদ্র শাহজাহান আলী ও রহিমা দম্পতির চতুর্থ ছেলে। ১৯৮৭ সালে জন্ম নেওয়া শিশুটি সুস্থ ও স্বাভাবিকই ছিল। বয়স ১৪-১৫ বছর থেকেই অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। গায়ে কাপড় রাখত না। বাড়ি থেকে পালিয়ে যেত। মা-বাবা বাধ্য হয়ে তাকে বাড়ির পাশের একটি গাছে সারাদিন শিকলে বেঁধে রাখে। সারাদিন গাছের সঙ্গে পশুর মতো বাঁধা থেকে সন্ধ্যায় ছোট একটি ঘরের খুঁটিতে আবারও শিকলে বাঁধা হয় তাকে। ঘরের মেঝের খড়-চাটাইয়ের বিছানায় শুয়ে থাকলেও প্রায়ই নিদ্রাহীন রাত কাটে তার। সকালে আবারও গাছের সঙ্গেই বাঁধা পড়ে। ১৫ বছর ধরে চলছে শুক্কুর আলীর এমন শিকলবন্দি জীবন।
গতকাল সোমবার সরেজমিনে পশ্চিমপাড়া গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় শুক্কুর সম্পর্কে নানা তথ্য। দিগরবাইদ বাজারের দোকানি শামীম জানান, দরিদ্র মা-বাবার আদরের ছেলে শুক্কুর কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে ২০০০ সালে ভর্তি হয় আলোকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। সংসারে অভাব-অনটন থাকায় কিশোর শুক্কুর লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ শুরু করে। লেখাপড়ায় যেমন শিক্ষকদের  নজরে এসেছিল, কাজের প্রতিও ছিল আন্তরিক। দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া আর এগোয়নি। একসময় আয়-রোজগারের প্রতিই মনোযোগ দেয় সে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের  দিকে নিজেদের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে বিক্রির দায়ে পরিজনের হাতে বেশ পিটুনির শিকার হয় শুক্কুর। এতে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পায়। তখন থেকেই অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। বাড়ি থেকে কাউকে না বলে বেরিয়ে গিয়ে নিখোঁজও থেকেছে কয়েকবার। ছেলেটির যে উন্নত চিকিৎসা করাবে, সে সামর্থ্যও তাদের ছিল না। তার পাগলামো দিন দিন আরও বাড়তে থাকে। তাই বাধ্য হয়ে ২০০৫ সাল থেকে তাকে শিকল পরিয়ে রাখা হচ্ছে। সেই থেকে রাতে একটা ছোট ঘরে খুঁটিতে এবং সকালে বাড়ির পেছনের গাছে বেঁধে রাখা হয় তাকে। দিন দিন তার অবস্থার অবনতি ঘটছে। এখন গায়ে কোনো কাপড়ই রাখে না।
শুক্কুরের ভাতিজা স্বপন মিয়া জানান, চাচা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে বাড়ি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া যায়। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে এখন এমনভাবে রাখা হচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাঈদ তালুকদার দুলাল বলেন, যুবককে শিকল বেঁধে রাখা হয়েছে- এমন তথ্য তার জানা নেই। তবে সরকারি কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা করা হবে।
মধুপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। কেউ জানালে প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। আর চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ থাকলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×