ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

নামেই শিল্পনগরী, নাজুক সেবা

নামেই শিল্পনগরী, নাজুক সেবা
×

মোস্তফা কামাল, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৯ ডিসেম্বর ২০২২ | ০০:৫৯

কিশোরগঞ্জের উদ্যোক্তাদের জন্য ৩৪ বছর আগে ১৫ একর জায়গায় শিল্পনগরী স্থাপন করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে শহরতলির মারিয়া এলাকায় ওই জমি অধিগ্রহণের পর পর্যায়ক্রমে নানা প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৫০টি প্লট। প্রায় তিন যুগ পরে এসে শিল্পনগরীটি অবহেলিত। যে মাত্রায় কারিগরি উন্নয়ন হওয়া উচিত ছিল, তার ছিটেফোঁটাও হয়নি বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য। নানা সংকটে ধুঁকছে শিল্পনগরীটি।
কিশোরগঞ্জ শহরের নগুয়া মোড় থেকে যে সড়কটি বিন্নাটি চৌরাস্তায় মিশেছে, সে সড়ক ধরে প্রায় দুই কিলোমিটার এগিয়ে গেলে পূর্বপাশে পড়বে মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদ। এর উল্টোপাশেই অবস্থান বিসিক শিল্পনগরীটির। সরেজমিন দেখা গেছে, নগরীর ভেতরে থাকা সড়কগুলো এখানে-ওখানে ভাঙা। কোথাও আবার ঘন ঘাসে ঢেকে আছে। সীমানা প্রাচীর না থাকায় পুরো এলাকাই অরক্ষিত। পরিবহন ব্যবসায়ীরা প্রভাব খাটিয়ে একটি অংশে নিয়মিত যানবাহন পার্কিংয়ের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছেন।

বিসিক জেলা কার্যালয় সূত্র জানায়, ১৫ একরের এ শিল্পনগরীতে তিন শ্রেণিতে ১৫০টি প্লট রয়েছে। সাড়ে ৪ হাজার বর্গফুটের 'এ' শ্রেণির প্লট ৬৫টি, ৩ হাজার বর্গফুটের 'বি' শ্রেণির প্লট ৬০টি ও অনির্ধারিত আয়তনের 'এস' শ্রেণির প্লটসংখ্যা ২৫। এর মধ্যে খাদ্য ও খাদ্যজাত সামগ্রীর জন্য 'এ' শ্রেণির ১৭টি, 'বি' শ্রেণির সাতটি ও 'এস' শ্রেণির তিনটি প্লট বরাদ্দ হয়েছে। বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্যের জন্য বরাদ্দ হয়েছে 'এ' শ্রেণির সাতটি, 'বি' শ্রেণির ৩৩টি ও 'এস' শ্রেণির ১০টি প্লট। রসায়ন (ঔষধ) শিল্পের জন্য 'এ' শ্রেণির প্লট বরাদ্দ হয়েছে ২০টি। এর বাইরে বিভিন্ন পণ্যের শিল্পের জন্য 'এ' শ্রেণির ছয়টি, 'বি' শ্রেণির ২০টি ও 'এস' শ্রেণির ৯টি প্লট বরাদ্দ হয়েছে। প্রকৌশল শিল্পের জন্য বরাদ্দ হয়েছে 'এ' শ্রেণির ১৫টি ও 'এস' শ্রেণির তিনটি প্লট। ১৫০টি প্লট নানা প্রতিষ্ঠান ৯৯ বছরের জন্য বরাদ্দ পেয়েছে। তবে এখানে মোট শিল্প ইউনিটের সংখ্যা ৭০। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো কোনোটি একাধিক প্লট পেয়েছে।

এ শিল্পনগরীতে কর্মরত কয়েকশ মানুষের ব্যবহারের জন্য রয়েছে একটিমাত্র পানির পাম্প। যা আবার আট মাস ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। ফলে সবাইকে পানির জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাদের পানের জন্য বোতলজাত পানি আর গোসল ও হাত-মুখ ধোয়ার জন্য পুকুরই ভরসা।

বিসিকের জেলা কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) শেখ মো. সোহরাব উদ্দিন এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, একটিমাত্র পাম্প থেকেই পুরো শিল্পনগরীর পাশাপাশি বিসিক কার্যালয়েও পানি সরবরাহ করা হতো। সেটি বিকল হয়ে পড়ায় পানির জন্য সবার খুব কষ্ট হচ্ছে। পুকুরের পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু সব ধরনের কাজে তো এ পানি ব্যবহার করা যায় না। বাইরে থেকে পানি আনতে হচ্ছে।

তিনি জানান, বিকল্প পাম্পটি মেরামতের জন্য তাঁরা ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। কার্যালয়ে আলাদা একটি পাম্প স্থাপনে ৪ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এ ছাড়া তাঁদের কার্যালয় ভবনটি পুরোনো হওয়ায় সংস্কার ও সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সাড়ে ১৯ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে।

প্রধান যে সমস্যা তাঁর কথায় ওঠে আসে তা হলো- গ্যাস সংকট। সোহরাব উদ্দিন জানান, এ শিল্প এলাকায় গ্যাসভিত্তিক যেসব কারখানা রয়েছে, তা থেকে তাঁরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। যা পাওয়া যাচ্ছে, এর চাপ খুব কম। এর সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এ সমস্যার কথা ওঠে আসে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-সংশ্নিষ্টদের বক্তব্যে। ওই শিল্প এলাকায় কারখানা রয়েছে এমএম খান ফুড প্রোডাক্টের। প্রতিষ্ঠানটির আউটলেট ম্যানেজার রাফিউর রহমান নিলয় জানান, গ্যাসের চাপ কয়েক মাস ধরে খুব কম পাচ্ছেন। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদা জানিয়ে মাসখানেক আগে লিখিত চিঠি দিয়েছেন। এখনও সমাধান হয়নি, পাল্টা চিঠিও পাননি।

তিনি আরও জানান, সীমানা প্রাচীর না থাকায় তাঁদের কারখানার কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেক সময় চুরিও হয়। যে কারণে একটি পুলিশ ফাঁড়ি অথবা আনসার ক্যাম্প স্থাপনের দাবি তাঁর।

বিষয়টি স্বীকার করেন এজিএম শেখ মো. সোহরাব উদ্দিনও। তিনি বলেন, সীমানা প্রাচীর না থাকায় পুরো এলাকা অরক্ষিত থাকে। এলাকার প্রভাবশালী লোকজন পার্কিংয়ের স্থান হিসেবে ব্যবহার করে। প্রায়ই ট্রাক রেখে দেয়। কিছু বলাও যায় না। সন্ধ্যার পর স্থানীয় বখাটে ও মাদকাসক্তরাও আড্ডা জমায়। সীমানা প্রাচীর ও কয়েকটি ফটক নির্মাণের জন্যও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি।

এ ছাড়া পুরো এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। শুস্ক মৌসুমে তেমন দুর্ভোগ না হলেও বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। তখন যাতায়াতেও কর্মীদের সমস্যা হয় বলে জানান শেখ মো. সোহরাব উদ্দিন।

জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ও জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতির (নসিব) কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি মুজিবুর রহমান বেলাল জানান, বিসিক শিল্পনগরীতে নসিবের কয়েকজন সদস্যের টেক্সটাইল প্লট রয়েছে। ফলে তিনি তাঁদের খোঁজখবর রাখেন। তাঁর মনে হয়েছে, এতদিনে এ শিল্পনগরীর যতটুকু উন্নত হওয়া প্রয়োজন ছিল, তা হয়ে ওঠেনি। এর জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে দায়ী করেন তিনি। এ কারণে উদ্যোক্তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পান না।

মুজিবুর রহমান বেলাল বলেন, যেখানে ব্যবসায়ীদের ফাইলপত্র ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা দরকার, সেখানে এক ঘণ্টার কাজ এক মাসেও নিষ্পত্তি হয় না। এ ছাড়া প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ঋণসুবিধা দেওয়া হলে বিসিক এলাকায় প্রাণ সঞ্চার হবে বলে মন্তব্য তাঁর।

গ্যাসের চাপ কম থাকার বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড কিশোরগঞ্জের ব্যবস্থাপক তোরাব হোসেন বলেন, সারাদেশেই সরবরাহ কিছুটা কম আছে। এর প্রভাব এখানেও পড়েছে। তবে বিসিক শিল্প এলাকায় এমন হওয়ার কথা নয়। তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদাভেদে ঘণ্টায় ৫ হাজার, ৩ হাজার ও ২ হাজার ঘনফুট করে গ্যাস পাচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ পাননি তিনি।

আরও পড়ুন

×