ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নারায়ণগঞ্জ

মশায় অতিষ্ঠ নগরবাসী, বেড়েছে ডেঙ্গু

মশায় অতিষ্ঠ নগরবাসী, বেড়েছে ডেঙ্গু
×

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জামতলা এলাকার একটি বাড়ির ছাদে রোববার ছিটানো হচ্ছে মশা নিধনের ওষুধ - সমকাল

শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০২২ | ০৩:২২

মশা উৎপাতে অতিষ্ঠ নারায়ণগঞ্জবাসী। বেড়েছে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত নানা রোগ। সাধারণত বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও এবার শীতেও একই দশা। পলিথিন ও প্লাস্টিকে আটকে থাকা অল্প পানিতেই ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মশা মারতে ওষুধের বদলে শব্দতরঙ্গ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদনগর ১ নম্বর গলির বাসিন্দা কম্পিউটার টেকনিশিয়ান বেলাল আহমেদ বলেন, মশা এখন দিনরাত- উভয় সময়েই কামড়াচ্ছে। মাসে একবার ওষুধ ছিটায় সিটি করপোরেশন। কিন্তু ওষুধ ছিটানোর কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা যায় পরিস্থিতি আবার আগের মতো।

এ ব্যাপারে স্থানীয় কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না জানান, তাঁর এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। কিন্তু কাজ ততটা হচ্ছে না।

১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুল হক রতন স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, মশা তাড়াতে কয়েল, স্প্রে, বিদ্যুতে পোড়ানো লিকুইডসহ নানা কিছু ব্যবহার করছি। সন্ধ্যা হলে জানালা বন্ধ করে রাখছি। কিন্তু মশার অত্যাচার থেকে বাঁচা যাচ্ছে না। এলাকার ড্রেন এখনও পরিস্কার করা হয়নি।

একই এলাকার কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু বলেন, ফগার মেশিন ও ওষুধের কিছুটা সংকট রয়েছে। সিটি করপোরেশন এসব কিনতে টেন্ডার আহ্বান করেছে। ওষুধ পেলেই ছিটানোর ব্যবস্থা হবে। রুটিনমাফিক ড্রেন পরিস্কারের ব্যাপারে কাজ হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মশা নিধন কর্মকর্তা শ্যামল পাল জানান, ১৭০ জন নিধনকর্মীর মাধ্যমে প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা নিধন কার্যক্রম চলছে। করোনার সময় প্রায় ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে।

শুধু সিটি করপোরেশন এলাকায়ই নয়, মশার উপদ্রব বেড়েছে বাইরেও। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বৈরাগীর বাড়ি এলাকার বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান তোতা বলেন, মশারি টানিয়েও শান্তিতে ঘুমাতে পারেন না। তিনি বলেন, এলাকার টেক্সটাইল মিল, রোলিং মিলের দূষিত পানিতে মশা মোটাতাজা হয়। এ কারণে মশা বাড়ছে হুহু করে।

ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টু জানান, তাঁর এলাকা অনেক বড়। সে তুলনায় মশা মারতে সরকারি বরাদ্দ অপর্যাপ্ত। এটি মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধে বড় সমস্যা। আরেকটি সমস্যা- পরিবেশ দূষণ। ইউনিয়ন পরিষদ হলেও তাঁর এলাকায় অনেক শিল্পকারখানা আছে। এসব শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালির বর্জ্যে পরিবেশ দূষণের কারণে মশার প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে।

নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ডা. ফরহাদ হোসেন বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ মশার কামড়জনিত নানা রোগে আক্রান্তের উপস্থিতি বেড়েছে। এ মাসে দেড়শ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি জানান, ডেঙ্গুর ধরন তিনটি। হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীরা 'নরমাল' টাইপের ডেঙ্গুর আক্রমণের শিকার। যাদের শুধু জ্বর হয়। তিনি বলেন, আগে বর্ষাকালে ডেঙ্গু হতো। কিন্তু এখন শীতকালেও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের বিজ্ঞানের শিক্ষক মৃদুল কান্তি কুণ্ডু বলেন, মশার সমস্যা বৃদ্ধির মূল কারণ পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ। দুই ভবনের মাঝে খুব অল্প পরিমাণ জায়গা খালি রাখা হচ্ছে। এতে সিটি করপোরেশনের কর্মচারীদের পক্ষে সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে না। ওষুধ ছিটানোও সম্ভব নয়। এসব জায়গায় মশা জন্ম নিচ্ছে। বাসার পানির ট্যাঙ্ক থেকে উপচে পড়া পানি জমেও মশা জন্ম নিচ্ছে। তিনি জানান, মশা জন্ম নেওয়ার জন্য এক চা চামচ পরিমাণ পানিই যথেষ্ট। এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতাও মশার সমস্যা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। তিনি মশা মারার ক্ষেত্রে ওষুধ না ছিটিয়ে সাউন্ড ভাইব্রেশন ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ওষুধ ছিটালে পানি, মাটি পরিবেশ দূষিত হয়। এটি শিশু, বড় মানুষ, পাখি, বেড়াল, কুকুরের ক্ষতি করতে পারে। উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দিতে পারে। সাউন্ড ভাইব্রেশনে মশার পাখা ঝরে যায়। এটি অনেক বেশি কার্যকর।

মশা বৃদ্ধির জন্য পলিথিন-প্লাস্টিককে দায়ী করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নারায়ণগঞ্জ শাখার সহসভাপতি তারেক বাবুও। তিনি বলেন, ছাদ ও বারান্দার বাগান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু এটি করতে গিয়ে অনেকে প্লাস্টিকের টব, কান্দা, প্লাস্টিকের বোতল, বালতি, ড্রাম- এসব ব্যবহার করছেন। ছিদ্র করলেও অনেক পানি জমে থেকে মশা জন্ম নিচ্ছে। মাটির টব হলে এ পানি শোষণ করে নিত।

এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী জানান, সিটি করপোরেশনে মশার ওষুধের বা মেশিনের সংকট নেই। যে কাউন্সিলরের যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু নিয়ে মশা নিধনের কাজ করতে পারেন। তিনি বলেন, এটাও সত্য ওষুধ ছিটিয়ে কাজ কম হচ্ছে। মশা মরছে কম। এজন্য বিকল্প কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবছি। এক্সপার্টদের মতামত নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×