হস্তশিল্প
নকশি পাখায় জীবন বদল
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বড়ডাংড়ি গ্রামে নকশি পাখা তৈরিতে ব্যস্ত নারী -সমকাল
মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৩ | ১৯:৫২
একসময় ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের বড়ডাংড়িসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা ছিল ‘বাড়া ভানা’। ধান সেদ্ধর পর শুকিয়ে ঢেঁকিতে বা মেশিনে চাল বের করার এই কাজে বেশি ভূমিকা রাখতেন নারীরা। এক দশক আগেও ওই সব গ্রাম ‘বাড়া ভানার গ্রাম’ বলে পরিচিত ছিল। এখন পরিচয় বদলে হয়েছে ‘পাখার গ্রাম’। সেই সঙ্গে বদলে গেছে ওই সব গ্রামের মানুষের জীবন। নকশি পাখা তৈরি ও বিক্রি করে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে এসেছে সচ্ছলতা।
হাতপাখার ব্যবহার বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বহু আগে থেকেই প্রচলিত। নানা নকশায় শোভিত হাতপাখাকে বলা হয় ‘নকশি পাখা’। বড়হিত ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে নকশি পাখা তৈরির কাজ শুরু হয় প্রায় দুই দশক আগে। বড়ডাংড়ির ইদ্রিস আলীর হাত ধরে পাড়াডাংড়ি, সৈয়দাবাদ, পেরিনারায়ণপুর ও কাঁঠালডাংড়ি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এই কাজ। পাখা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে তিন শতাধিক পরিবার। এই গ্রামগুলোতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দেড় লাখ পাখা তৈরি হয়।
এলাকায় পাখা তৈরির কাজ কীভাবে এলো– জানতে চাইলে ইদ্রিস আলী বলেন, ১৯ বছর আগে তাঁর মেয়ে মামাবাড়ি গফরগাঁওয়ে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে নকশি পাখা তৈরির কাজ দেখে। কিছুদিন কাজ শিখে গ্রামে ফিরে নকশি পাখা তৈরি শুরু করে। এভাবে আশপাশের কয়েক বাড়ির নারীরাও তার কাছে কাজ শেখে। বাড়তে থাকে পাখার চাহিদা। ধীরে ধীরে পুরো গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে নকশি পাখা তৈরি শুরু হয়। পাখার কাজ করেই কেউ জমিজমা রেখেছেন কিংবা ছেলেকে পাঠিয়েছেন বিদেশে।
বাঁশ কেটে পাখার চাক ও হাতল বানিয়ে দেন পুরুষরা। এর পর অন্য কাজ করেন নারীরা। নারী-পুরুষ মিলে হাতপাখার কাজ করে আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে বড়হিত ইউনিয়নের গ্রামের বাসিন্দাদের।
বড়হিত ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বাড়ির উঠানে নারীরা বসে সুইয়ের ফোঁড়ে বাহারি সুতায় পাখার জমিনে নকশা ফুটিয়ে তুলছেন। বড়ডাংড়ি গ্রামের এক বাড়িতে দেখা গেল, চটের ওপর বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে নকশি পাখা তৈরি করছেন কয়েকজন নারী। তাঁদেরই একজন সুফিয়া খাতুন জানান, আগে বাড়া ভানার কাজ করতেন। আয় বেশি হওয়ায় ১৫ বছর ধরে নকশি পাখা তৈরি শুরু করেন। এরপর জমি কিনেছেন ২০ কাঠা। বাড়িও পাকা করেছেন।
পাখা বিক্রির জন্য কারিগরদের কোথাও ছুটতে হয় না। ঢাকা, সিলেট, ভৈরব, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে এগুলো নিয়ে যান। পাইকারি হিসাবে ছাপার তৈরি ১০০ পাখা বিক্রি হয় দেড় হাজার টাকায়, সুতার নকশায় তৈরি ১০০ পাখা আড়াই হাজার টাকা এবং সুতার কাজের মধ্যে আয়না বসিয়ে করা ১০০ পাখা বিক্রি হয় তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়।
কারিগর রুহুল আমিন বলেন, পাখার পুরো কাজ হয় স্থানীয়ভাবেই। ছাপা পাখা সপ্তাহে ৫০০টি তৈরি করা যায়। সুতার ও আয়না বসানো পাখা করা যায় ২০০ থেকে ৩০০টি। আগে দিনমজুর ছিলেন আবদুল করিম। এখন তিনি পাখার কারিগর। আবদুল করিম বলেন, পাখার কাজ শুরুর পর অনেক ভালো আছেন। একটি পাখা তৈরিতে আট টাকা খরচ হয়। আর বিক্রি হয় ১৫ টাকায়। তবে সহজ শর্তে ঋণ পেলে ব্যবসা ভালো করে করা যেত।
বড়হিত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুল হক মিলন বলেন, ইউপির অনেক গ্রামের মানুষ পাখা তৈরি ও বিক্রির সঙ্গ যুক্ত। সবাই সচ্ছল, কোনো অভাব নেই।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজা জেসমিন বলেন, কর্মসংস্থান ব্যাংক, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ অন্য মাধ্যম থেকে তাঁদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।
- বিষয় :
- হস্তশিল্প
- নকশি পাখায় জীবন বদল
