ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সরেজমিন
এবার ভিন্ন পরিবেশ দেখছে কোরবানির পশুর গাড়ি
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম, সেকান্দর হোসেন, সীতাকুণ্ড ও বিপুল দাশ, মিরসরাই
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
সোমবার সকাল সোয়া ৯টা। মিরসরাইয়ের ধুমঘাট ব্রিজের ওপর দিয়ে পাবনা থেকে আসছে গরুবোঝাই দুটি ট্রাক। এর একটির নম্বর ঢাকা মেট্রো ১২-২৭০০। গন্তব্য চট্টগ্রামের গরুর হাট। মিরসরাইয়ে প্রবেশ করতেই একটি ট্রাকে বসলেন সমকালের এক প্রতিবেদক। পাগড়ি মাথায় ট্রাকের কেবিনের ওপর তখন বসে ছিলেন মধ্যবয়সী আবুল কালাম ও মো. শাহীন। গরুগুলো পাহারা দিচ্ছিলেন তাঁরা। চালকের পাশের আসনে বসা গরুর ব্যাপারী মুছা মিয়া। দীর্ঘ পথ গাড়ি চললেও চোখেমুখে কোনো ক্লান্তি নেই কারও। যাত্রাপথের গল্প কেমন? জিজ্ঞেস করতেই ট্রাকচালক আকবর হোসেন চট্টগ্রামের ভাষায় বললেন, ‘আঁরার লাক বালা। পথত কোন চাদা দন ন পরে।’ (আমার কপাল ভালো। পথে এবার কোনো চাঁদা দেওয়া লাগেনি)।
তাঁর এ কথার সত্যতা মিলল ছাগল ব্যাপারী মো. নুর নবী, জাকির হোসেন ও সাইফুল ইসলামের কণ্ঠেও। রাজশাহী জেলার বানেশ্বর বাজার থেকে ৯৬টি ছাগল কিনে বড় একটি ট্রাকে করে আসছেন চট্টগ্রামে। রোববার বিকেল ৫টায় যাত্রা শুরু করা ট্রাকটি মিরসরাই পৌঁছে সোমবার সকাল ১০টায়। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ ও কুমিল্লা এসে দু্ইবার যাত্রাবিরতি করে গাড়িটি। পথে কোথাও কোনো ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয়নি বলে জানালেন নুর নবী।
তিনি বললেন, ‘এবার মহাসড়কে পুলিশের ঝামেলা নেই একদম।’ আরেক ছাগল ব্যাপারী সাইফুল ইসলাম বললেন, ‘আগে গাড়ি থেকে গরু-ছাগল মোড়ে মোড়ে নামানোর জন্য তদবির করত অনেকে। এবার দেখছি, সেটি নেই।’ পাশে থাকা জাকির হোসেন জানান, তাঁদের গাড়িতে আসা ছাগলগুলোর ২০টি বারইয়ারহাট নামানো হয়েছে। এ ছাড়া ৪৯টি মিরসরাই বাজার এবং বাকি ২৭টি হাদি ফকির হাটে বিক্রির জন্য নামানো হয়।
মিরসরাইয়ে ট্রাকচালক আকবর হোসেন জানান, রোববার রাত ১২টার দিকে ১০টি গরু নিয়ে পাবনা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেন তাঁরা। পথে দুইবার যাত্রাবিরতি করলেও কাউকে কোনো টাকা দিতে হয়নি এবং পুলিশও কোথাও তাঁদের গাড়ি থামায়নি। গরুর মালিক মুসা মিয়া জানান, গরুগুলো তিনি পাবনার বিভিন্ন এলাকা থেকে কিনেছেন। বাজার বুঝে চট্টগ্রামের সিডিএ মার্কেট অথবা মাদামবিবি হাট এলাকায় নিয়ে যাবেন। এগুলো বিক্রি করে বাজার পরিস্থিতি বুঝে আবার গরু আনতে রাতেই ফিরে যাবেন।
মিরসরাইয়ের ৩২ কিলোমিটার মহাসড়ক
গরুবোঝাই ট্রাকটি ধুমঘাট ব্রিজ থেকে মিরসরাই অংশের বড় দারোগার হাট পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। ওই ট্রাকের পেছনে থাকা গরুবোঝাই আরেকটি ট্রাকে বড় জাতের ৬টি গরু ছিল। বাজার ধরার উদ্দেশ্যে দ্রুতগতিতে ছুটে যায় ট্রাকটি।
ছাগল ব্যাপারী নুর নবী জানান, রাজশাহীর বানেশ্বর বাজার থেকে ২৭টি বড় ছাগল কিনে আনেন তিনি। সঙ্গে আরও দুই ব্যাপারীর মোট ৯৬টি ছাগল নিয়ে আসতে ৪৫ হাজার টাকায় ট্রাক ভাড়া করেন। আগের দিন বিকেল ৫টায় ট্রাক ছাড়ে; সোমবার সকাল ১০টায় মিরসরাই পৌঁছেন। তবে পথে কোনো চাঁদাবাজির শিকার না হওয়ায় তাঁরা এবার খুশি। ছাগলগুলো তিনি দারোগারহাট ও কয়েকটি আবুতোরাব বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যাবেন।
সোমবার সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ধুমঘাট ব্রিজ থেকে বড় দারোগারহাট পর্যন্ত ৩২ কিলোমিাটার এলাকায় মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেন ও ঢাকামুখী লেনে কোনো পুলিশ টহল কিংবা তাদের গাড়ি চোখে পড়েনি। অভিন্ন চিত্র ছিল মহাসড়কের সীতাকুণ্ড পয়েন্টেও। সেখানে গরুর ট্রাকে উঠে পরিস্থিতি দেখেছেন সমকালের আরেক প্রতিবেদক।
সীতাকুণ্ডের ৪৭ কিলোমিটারে ছিল না চাঁদাবাজি
মানিকগঞ্জ সদর থেকে শুক্রবার গভীর রাতে ঢাকা মেট্রো-ট ১৮-৮১৫৬ নম্বর ট্রাকে ১৪টি গরু ও ১০টি ছাগল নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন শাকিল আহমেদ নামে এক ব্যবসায়ী। শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সীতাকুণ্ডের বড় দারোগারহাট ওজন স্কেল এলাকায় গরুগুলো নিয়ে গাড়িটি অতিক্রম করেন তাঁরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড পয়েন্ট অতিক্রমকালে কথা হয় চালক ও গরু ব্যবসায়ীর সঙ্গে।
গাড়িচালক আব্দুর রহিম বলেন, ঢাকা অতিক্রম করার সময় বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। তবে কোথাও চাঁদা দিতে হয়নি। কোনো হয়রানিরও শিকার হতে হয়নি। গরু ব্যবসায়ী শাকিল আহমেদ জানালেন, গরুগুলো মইজ্জেরটেক এলাকার হাটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বিক্রির জন্য।
বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড় দারোগারহাট থেকে ট্রাকে ওঠেন সমকাল প্রতিবেদক। এই ট্রাকটি একে খান এলাকা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। ৪২ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে বাড়বকুণ্ড বাজারে এসে গাড়িটা একবার থামে। তবে কাউকে কোনো টাকা দিতে দেখা যায়নি। গাড়িচালক আব্দুর রহিম বলেন, মানিকগঞ্জ থেকে গাড়িটি ছাড়ার পর ঢাকাতে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করতে হয়েছিল। তবে কোথাও চাঁদার টাকা দিতে হয়নি।
বদলে গেছে সাগরিকা গরুর হাট
নগরীর সাগরিকা মোড়ে বসে সবচেয়ে বড় গরুর হাট। আগে এই মোড়ের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকত দালাল। তারা গরু কিংবা ছাগলের গাড়ি যেতে দেখলেই জোর করে তা নামিয়ে ফেলত। দাবি করত বাড়তি টাকা। এবার তেমন চিত্র নেই সাগরিকা গরুর হাটে। ঢোকার আগে কোনো গাড়িকে টাকা দিতে দেখা যায়নি। হাটের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে মোতায়েন করা আছে পুলিশ। অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটলে হস্তক্ষেপ করছে পুলিশ।
পাহাড়তলী থানার অধীনে সাগরিকা গরুর হাট। এই থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গরুর হাটে কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সে জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। টহল পুলিশের পাশাপাশি পোশাকধারী পুলিশও আছে গুরুত্বত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে হাজির হচ্ছে পুলিশ।
হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে মহাসড়কগুলোর বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে। পণ্য বা গরুবাহী ট্রাকের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে হাইওয়ে থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের অধীনে ৮২১ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে কোথাও কোনো সংগঠন বা কোনো চক্রকে চাঁদাবাজি করতে দেওয়া হবে না। চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়ামাত্র নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা। এ ছাড়াও নির্দিষ্ট গন্তব্য ব্যতীত কোরবানির পশুবাহী গাড়ি ভিন্ন কোনো জায়গায় নামানো যাবে না। প্রয়োজনে হাইওয়ে প্যাট্রল সেই গাড়িকে তার নির্দিষ্ট হাটে পৌঁছাতে সহায়তা করবে।
