ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ডাক দিলেই হাজির রমেশ, বিনা পয়সায় পার করেন খেয়া

ডাক দিলেই হাজির রমেশ, বিনা পয়সায় পার করেন খেয়া
×

খেয়াঘাটে রমেশ মাঝি। ছবি: সমকাল

শরীয়তপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৩ | ০৬:৩৪ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৩ | ০৬:৩৬

নড়িয়া উপজেলার জপসা ইউনিয়নের লক্ষীপুর খেয়াঘাটে ৫২ বছর ধরে নৌকার বৈঠা বেয়ে যাচ্ছেন রমেশ মাঝি (৬২)।  যাত্রীদের বিনা পয়সায় পার করেন খেয়া। প্রতিদিন তাঁর নৌকায় কীর্তিনাশা নদী পার হন ৪ ইউনিয়নের অন্তত ২০ গ্রামের মানুষ। গভীর রাতেও খেয়াঘাটে ডাক দিলেই হাজির রমেশ। বিপদগ্রস্ত মানুষকে খেয়া পার করেন হাসিমুখে। তিন পুরুষ ধরে এভাবেই মানুষকে সেবা করে যাচ্ছে রমেশের পরিবার।

রমেশ মাঝির প্রকৃত নাম রমেশ দাশ। তবে এই নামে অনেকেই তাঁকে চেনেন না। মাঝি বললেই একনামে তাঁকে চেনেন সবাই।  রমেশ শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার জপসা ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা যজ্ঞেশ্বর মাঝি, দাদা ধনঞ্জয় মাঝিও একইভাবে বিনা পয়সায় নৌকায় মানুষ পারাপার করতেন। প্রতি বছরে গ্রামের লোকজনের দেওয়া ধান, পাটসহ বিভিন্ন ফসলে চলে তাঁদের সংসার।

৪ সন্তানের বাবা রমেশ। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। তাঁর নৌকা দিয়ে পারাপার হয়ে স্কুল, কলেজে গিয়ে এলাকার অনেক ছেলেমেয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু অর্থাভাবে নিজের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারেননি। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁরা শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। আর দুই ছেলে কাঠমিস্ত্রীর কাজ করেন। তাঁরা আলাদা সংসার করছেন। এরমধ্যে বড় ছেলে গাছ থেকে পড়ে মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ায় তাঁর সংসারের ঘানিও টানছেন রমেশ। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া একটি ছোট বাড়ি রয়েছে রমেশের, কোনো কৃষিজমি নেই। সেখানেই স্ত্রী চায়না রানী ও দুই ছেলে হৃদয় মাঝি (৩৮) ও সেতু মাঝিকে (৩৫) নিয়ে তাঁর বসবাস।  

শরীয়তপুর জেলার ওপর দিয়ে কীর্তিনাশা নদী প্রবাহিত হয়েছে। এই নদীর পূর্বে নড়িয়া  উপজেলা ও পশ্চিমে জেলা সদর। মাঝখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ আমলের হাট ভোজেশ্বর বাজার। উত্তর তীরে জপসা, নশাসন, রাজনগর ও মোক্তারেরচর ইউনিয়নের অবস্থান। ওই ৪ ইউনিয়নের হাজারো মানুষ প্রতিদিন কীর্তিনাশা নদী পারাপার হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন। প্রায় শত বছর ধরে লক্ষ্মীপুর ঘাটে তাদের পারাপারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে রমেশ মাঝির পরিবার।

৯০ বছরের বৃদ্ধা সাদেক আলি সরদার বলেন, ছোটবেলায় খেয়া ঘাটে তিনি রমেশ মাঝির বাবা ও দাদাকে বিনা পয়সায় মানুষ পারাপার করতে দেখেছেন। এখন রমেশ  বিনা পয়সায় মানুষকে খেয়া পারাপার করছে। ফসলের মৌসুমে এলাকাবাসী ধান, পাট দেয় তা দিয়েই রমেশের সংসার চলে।

স্থানীয় বাসিন্দা খালেক মাদবর বলেন, ‘ছোট বেলা থেকেই তাঁর নৌকায় পারাপার হই। কখনো টাকা চায়নি সে। আমরা দিলেও নেয়নি। এলাকার মানুষ ফসল পেয়ে যে যা দেয় তাতেই তার সংসার চলে। সে যদি টাকা নিতো তাহলে অনেক টাকাই উপার্জন করতে পারতো। সে যুগ যুগ ধরে মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে , আমরা তার জন্য কিছুই করতে পারছি না।’

 রমেশ মাঝী বলেন, ’ ১০ বছর বয়সে আমার বাবার হাত ধরে এই নৌকা চালান শিখেছি। অনেক কষ্ট করে অল্প বয়সে এই নৌকার হাল ধরেছি, এখনো চালাচ্ছি। এই খেয়া ঘাটে আমার ৩ পুরুষ ১শ’ বছর যাবৎ মানুষ পারাপার করছে। বাপ–দাদায় মানুষ পারাপার করে টাকা নিতেন না। তাই আমিও নেই না। এখন  বৃদ্ধ হয়ে গেছি, নৌকা চালাতে পারি না। অনেক কষ্ট হয়। যদি ছেড়ে দেই, তাহলে কি করে বাঁচবো? ’

জপসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মাদবর বলেন, রমেশ মাঝি একজন ভালো  মানুষ। বিভিন্ন সময় তাঁকে যতটুকু পারেন, সাহায্য করার চেষ্টা করেন তিনি।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শংকর চন্দ্র বৈধা বলেন, তিনি রমেশ মাঝির কথা শুনেছেন। এই যুগে এমন মানুষ  দুষ্পাপ্য। সরকার তাঁর পাশে আছে। স্থানীয় প্রশাসন থেকে রমেশ মাঝির পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।


আরও পড়ুন

×