ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মা-বাবার শিক্ষায় রক্ষা দুটি জীবন

মা-বাবার শিক্ষায় রক্ষা দুটি জীবন
×

পরিবার ও স্কাউট থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং বিবেকের তাড়নায় এমন ঝুঁকি নেন কলেজছাত্রী মাসুমা খাতুন সমকাল

মুনসী লিটন, খোকসা (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

 এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন মাসুমা খাতুন। সঙ্গে ছিলেন দুই বান্ধবী রত্না ও রিয়া। পথে মানুষের ভিড় দেখে দাঁড়িয়ে যান। জানতে পারেন, সামনের বাসায় সিলিন্ডারের পাইপ খুলে গ্যাস বের হচ্ছে। সবাই ফায়ার সার্ভিসে খবর দিতে ব্যস্ত। মাসুমাও পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিলেন। হঠাৎ তাঁর মাথায় কাজ করে, ঘরে বা চুলায় তো আগুন লাগেনি। গ্যাস বের হওয়া বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান।

 কলেজে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার কথাও মাথায় আসে মাসুমার। তবে ঘরে গিয়ে গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে আসছিল তাঁর। এ সময় নিজের হিজাবের একাংশ দিয়ে নাক ঢেকে নেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরে গিয়ে সিলিন্ডারের সুইচ অফ করেন। তাঁর সাহসিকতায় দুই নারীসহ বাড়িটি দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। গতকাল মঙ্গলবার কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভার মাঠপাড়ায় নিজেদের বাড়িতে আলাপকালে ঘটনার বিস্তারিত জানান মাসুমা।

রোববার খোকসার কলেজপাড়ায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মায়া রানী বিশ্বাসের বাড়ির রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডারের হোসপাইপ খুলে যায়। জানালা বন্ধ থাকায় মুহূর্তে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বাড়িতে ছিলেন তাঁর বড় বোন রিনা রানী ও শয্যাশায়ী মা আশা লতা রানী (৮৪)।

মাসুমা সাহস করে সিলিন্ডারের সুইচ বন্ধ করে জানালা-দরজা খুলে দিলে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় পরিবারটি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ছাত্রীটিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মায়া রানী। বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে বলে স্বীকার করেছেন খোকসা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা নজরুল ইসলামও।

সেদিন শত শত মানুষের মধ্যে এমন সাহস দেখান মাসুমা। অনেক মানুষ থাকায় লজ্জা পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে চলে যান তিনি। পরিবার ও স্কাউট থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং বিবেকের তাড়নায় তিনি এমন ঝুঁকি নেন। খোকসা সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে এবার মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনি। প্রাথমিকের সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পান মাসুমা। তবে করোনাকালে এসএসসিতে পেয়েছেন জিপিএ ৪.৩৫। যদিও এইচএসসিতে ভালো ফলের আশা করছেন।

বাবা সোবাহান হোসেনকে দেখে সামাজিক কাজে উদ্বুদ্ধ হন মাসুমা। পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও শিক্ষার খোঁজ নেওয়া, প্রবাসীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং হিসাব রক্ষার অ্যাপের ব্যবহার দেখিয়ে দেন প্রতিবেশীদের। শিশু ও নারীদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করেন। উচ্চশিক্ষা নিয়ে সরকারি চাকরি ও গ্রামের শিশুদের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। ছোট গল্প ও কবিতা পড়তে তাঁর ভালো লাগে।

মাসুমা ষষ্ঠ শ্রেণিতে স্কাউটে নাম লেখান। সেখানে মানবসেবা ও নিজেকে রক্ষার কৌশল রপ্ত করেছেন। বিস্ফোরণোন্মুখ গ্যাস সিলিন্ডার নিষ্ক্রিয় করাটা তাই স্বাভাবিক মনে হয়েছে তাঁর। গোপগ্রাম এ জেড ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী সুপার এইচ এম সোবাহান ও শাহানাজ পারভিন দম্পতির চার মেয়ের মধ্যে মাসুমা তৃতীয়। তবে সবার কাছে তামান্না নামে পরিচিত। বাবা চাকরিজীবী হলেও অবসরের পর গ্রামের এবতেদায়ি মাদ্রাসায় বিনা বেতনে ক্লাস নেন।

মা শাহানাজ পারভিন ছোটবেলায় পুকুরে পড়ে যাওয়া শিশুকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেও ডুবতে বসেছিলেন। সে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সন্তানদের মানুষের জীবন বাঁচানোর শিক্ষা দিয়েছেন। মায়ের ভাষ্য, মাসুমা আগেও দুর্ঘটনায় পড়া মানুষের জন্য ছুটে গেছে। প্রতিবেশী শিশুদের কিছু হলে পাশে থাকে। বড় দুই মেয়ে সুরাইয়া রেণু ও ফাহানা মুশফিকা মাস্টার্সে পড়ছে। ছোট মেয়ে মাফুজা আক্তার পড়ে নবম শ্রেণিতে। মেয়েরা যেন মানুষের জন্য কিছু করতে পারে, সে শিক্ষা দিয়েছেন।

কলেজছাত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ প্রতিবেশী বৃদ্ধ জহুরা খাতুন। তিনি শুনেছেন মাসুমার সাহসের কথা। তবে ভয় পেয়েছিলেন, মেয়েটির যদি কিছু হয়ে যেত। সহপাঠী রত্না ও রিয়াও সঙ্গে ছিলেন। তবে কখন মাসুমা সেখানে গেছেন, তা বুঝতে পারেননি। তাদের ভাষ্য, নিজের কথা না ভেবে যা করেছে মাসুমা, তা মনে রাখার মতো।

ছাত্রীর সাহসের গল্প শুনে সাধুবাদ জানিয়েছেন খোকসা সরকারি ডিগ্রি কলেজের ভূগোল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, মেয়েটি স্কাউটের ট্রেনিংপ্রাপ্ত। ফায়ার সার্ভিসের ক্যাম্পেও ছিল। ফলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসার আগেই গ্যাসের সুইচ বন্ধ করেছে।

আরও পড়ুন

×