ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

ফুলবাড়িয়ায় করোনায় বিপাকে ২০০ পাল পরিবার, অবিক্রিত অর্ধ কোটি টাকার মাল

ফুলবাড়িয়ায় করোনায় বিপাকে ২০০ পাল পরিবার, অবিক্রিত অর্ধ কোটি টাকার মাল
×

কবির উদ্দিন সরকার হারুন, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২০ | ১২:৩২

'মাটির হাড়ি পাতিল বেইচা ৫টা মাইয়া আমার বিয়া দিছি। এই জাত ব্যবসা ছাইড়া দিছে আমার লগে বহুৎ কারিগর। আমি ছাড়ি নাই, বাপ ঠাকুরপোর আশীর্বাদে খুশী মোহন অহনো তাগড়া জোয়ানের মতো পাল বাড়ির চাঁকা ঘোড়ায়। তয় অহন দেশে কি যে হয়ে গেলো, দেশে দেশে নাকি অসুখ হইছে, যার জন্য বেবাক লোক ঘরের মধ্যে বন্দি থাকে। যাইতে পারি না কোন হাড়ি পাতিল বেঁচতে, ঘরে চাইল নাই, বৈশাখী মেলা ও হইল না এই বার, জীবনের পইলাবার দেখলাম মেলা হইলো না। কোনদিন ভাবি নাই এমুন দিন দেহন লাগবো। এই পালপাড়ার প্রায় বেশিরভাগ ঘরে হন অভাব, কাদা মাটিতে জল দিলেই অখন শুকাইয়া যায়,কাদা জলের জীবন অখন সুকাই গেছে কাকু, বুহের হুকনা কইলজাডার মত।'

কয়লার ইঞ্জিনের মতো চলতে থাকা শ্বাস–প্রশ্বাসের ভেতর চাপাপড়া কথাগুলো বললেন ৮০ উর্ধ্বো প্রবীণ মৃৎশিল্পী খুশি মোহন পাল। যাদের কাছে জীবনটাই হলো কাদা–মাটির, মাটিই যাদের ভগবান, রোজ পূজার আরতিতে সাজায় মাটির ভগবানকে, যেই মাটিতেই মিশে যাবে যাদের চিতা, কেমন আছে আসলে মাটির এই জীবন? 

ঘরে চাল প্রায় শেষ এক বেলা ভাত আর আরেকবেলা শুধু শুকনো মুড়ি খেয়ে ক্ষুধা নিবাররন করছে খুশি মোহন আর তার স্ত্রী বকুল রানীর পালের সংসার। ভাঙা ছাপড়া ঘরের তলে নির্বাক মলিন বিষন্ন মুখ বসে আছেন এই দম্পতি, পহেলা বৈশাখের দিনটিতে তাদের ঘরে উৎসবের আমেজ বইতো, পিঠাপুলি আর পূজার ছলে মাটির দেবতাকে আরাধনায় তুষ্ট করতেন কুমার পাড়ার কাদামাটির মানুষেরা পূজা-অর্চনায় মতো থাকতো। অথচ ঘরে খাবার না থাকায় আজ সবই যেন মলিন।  

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার নাওগাঁও পালপাড়ার আশি ঊর্ধ্ব খুশি মোহন পাল। এই কুমাবাড়িতে ৩০ ঘর পালের বসবাস। পালপাড়ার সবচেয়ে প্রবীণ খুশি মোহন পাল। তার হাত ধরেই ২ থেকে ৪ গ্রামের পালবাড়ির বহু কারিগর কাজ করে খাচ্ছে অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আজ খুশি মহনের ঘরেই খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে ।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় প্রায় ২০০ কুমার পরিবার করোনার প্রভাবে খাদ্য সংকটে রয়েছে। বৈশাখী মেলা এবং গৃহস্থালির ব্যবহারীত হাঁড়ি-পাতিলসহ আনুষঙ্গিক জিনিসগুলো তৈরী প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মালামাল অবিক্রি থাকায় দিনে দিনে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে কুমারবাড়িগুলোতে। যেহেতু মৌসুমকে কেন্দ্র করে কুমাররা তারা তাদের মালামাল তৈরি করে বৈশাখের আগে থেকেই তাই এবারো তার ব্যাতিক্রম হয়নি শুধুমাত্র করোনার প্রভাবে কোনো মালামাল বিক্র হচ্ছে না কারিগরদের। 

ফুলবাড়িয়ার নাওগাঁও পাল বাড়ির কারিগর, শিলা রানী, সুনিতা চন্দ্র, মিতালী, রুপালি রানীপাল, প্রতিমা কারিগর সুনিল চন্দ্র পালসহ শিক্ষক রঞ্জিত চন্দ্র পাল বলেন, করোনার প্রভাবের কারণে পুরো দেশে একটা থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আমাদের এই নাওগাঁও পাল পাড়ায় মোট ৩০ টি ঘর আছে, উত্তর পারতেও রয়েছে পাল পরিবার। যারা সবাই কিন্তু মৌসুমকে সামনে রেখে যার যার মত মালামাল তৈরী করে রেখেছে ঘরে বাইরে, বৈশাখী মেলা এবং ধান কাটার আগ মুহূর্তে গৃহস্থের বাড়িতে প্রচুর মাটির মালামাল বিক্রি হয়, কিন্তু পুরো উপজেলা লকডাউনের কারণে কোন মৃৎশিল্পী আর তার তাদের তৈরী মালামাল নিয়ে বাইরে বিক্রির জন্য যেতে পারে না তাছাড়া অন্য জেলা থেকে কোন পাইকার আসতে পারছে না। যার জন্য বর্তমানে উপজেলার প্রত্যেকটি মৃৎশিল্পী কারিগর খুবই মানবেতর জীবন যাপন করছে, সরকারের উচিত এই শিল্পীদের টিকিয়ে রাখা, তাদের ঘরে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়াসহ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া।

এছাড়াও সরেজমিনে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার নাওগাঁও, পুটিজানা, কালাদহ, আছিম, দেওখলাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের কুমারদের বাড়িগুলোতে মাটির তৈরি বিভিন্ন খেলনাসহ সংসারের নিত্যপ্রয়জনীয় মাটির জিনিসপত্র তৈরি এবং সেই সব মালামাল মজুত বিক্র করতে না পারায় সেইসব মালামাল মজুদ করে রাখতে দেখা গেছে কুমারদের। 

উপজেলার সবচেয়ে বড় কুমার পাড়া হলো পুটিজানা ইউনিয়নে শিবগঞ্জ কুমার বাড়ি, সেখানে দুই গ্রামে প্রায় ১০০ কুমার পরিবারের বসবাস। সরেজমিনে উপজেলার শিবগঞ্জ পাল পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি পাল পরিবারের উঠোনে তাদের তৈরি হাড়ি পাতিল বাসনপত্র রং করে রোদে শুকাতে দেয়া হয়েছে। 

পালবাড়ির জীবন পাল,শ্যামল পাল,উত্তম পাল বলেন, আমাদের প্রত্যেকের ঘরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মাল তৈরি করা আছে এবং সবই অবিক্রি। এই করোনার কারণে কোনো মালপত্র বিক্রি করতে বাইরে যেতে পারছি না। অনেকের ঘরে খাবার নেই, বিভিন্ন জায়গায় সরকারি সহযোগিতা পেলেও এখন পর্যন্ত কোনো মেম্বার- চেয়ারম্যান আমাদের কোনো খোঁজ নেয়নি। 

স্থানীয় ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন বলেন, এর আগে ১ টন করে পুরো ইউনিয়নে ত্রাণের চাল বরাদ্দ পেয়েছি, পাল পাড়ায় দিতে পারিনি। 

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের উপজেলা শাখার সভাপতি বিপুল হুর বলেন, হতদরিদ্র এই সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের কেউ তাদের কষ্টের কথা কাউকে বলতে চায় না, আবার তাদের খোঁজ কেউ নেয় না। কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ টাকার মালামাল এবার ফুলবসড়িয়ার কুমাররা বিক্রি করতে পারেনি। এই দুর্যোগ মুহূর্তে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি তাদের জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ( ইউএনও) আশরাফুল ছিদ্দিক বলেন, কুমারদের পরিবারের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে সরকারি ত্রাণের তালিকায় নাম আলাদাভাবে যুক্ত করতে বলেছি। 

আরও পড়ুন

×