ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

টুপিতে ভাগ্য বদল অর্ধলাখ নারীর

উদ্যোগ

টুপিতে ভাগ্য বদল  অর্ধলাখ নারীর
×

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার খোশাইল গ্রামে টুপি তৈরিতে ব্যস্ত নারী সমকাল

 কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ

প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৪ | ০০:২৮ | আপডেট: ২২ মার্চ ২০২৪ | ০৭:১৫

জেলার মহাদেবপুরের কয়েকটি গ্রাম ‘টুপির গ্রাম’ বলে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামে গ্রামে নারীদের বানানো নকশি টুপি যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। টুপি তৈরির আয় থেকে অনেকের সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে। এসেছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। 

জানা গেছে, ওমানের জাতীয় টুপি ‘কুপিয়া’ তৈরি হচ্ছে মহাদেবপুরের নারীদের নিপুণ হাতে। এ ছাড়া সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, পাকিস্তান, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে এসব টুপি। মানভেদে একেকটি ‘কুপিয়া’ এক থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হয়। গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে নারীরা সুই-সুতা ও কাপড় দিয়ে এসব টুপি তৈরি করেন।  সুইয়ের ফোঁড়ে নান্দনিক নকশা ফুটিয়ে তোলেন তারা। বিশেষ কায়দায় সেলাই ও ভাঁজ করে বানানো হচ্ছে এসব টুপি।

জেলার তিনটি উপজেলা নওগাঁ সদর, মান্দা ও মহাদেবপুরের প্রায় ৯০টি গ্রামের বিভিন্ন বয়সী প্রায় ৫০ হাজার নারী কারিগর বিশেষ ধরনের টুপি তৈরিতে সংশ্লিষ্ট। তবে মহাদেবপুরের খোসালপুর, রনাইল, ভালাইন, সুলতানপুর, কুঞ্জবন, মধুবন, হরমনগর, খাজুর, শিবগঞ্জ, তাতারপুর, উত্তরগ্রাম শিবগঞ্জ, গোয়ালবাড়ীসহ ৬০-৭০ গ্রামের নারী মূলত এসব টুপি তৈরি করছেন। ঈদ সামনে রেখে তাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। কেউ বাড়ির উঠানে, কেউ দলবদ্ধভাবে টুপি তৈরি করছেন।

সরেজমিন দেখা যায়, খুচরা ব্যবসায়ীরা বিদেশি ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন নকশার ছাপ দেওয়া সাদা রংয়ের টুপির কাপড় ও সুতা কারিগরদের কাছে পৌঁছে দেন। এসব কাপড়ে সুই-সুতা দিয়ে সুন্দর নকশা ফুটিয়ে তোলেন নারী কারিগররা। বোতাম, চেন, দানা ও মাছকাটা নামে চার ধরনের টুপি সেলাই করা হয়। 

কোনো টুপিতে নকশা তুলতে ২০-২৫ টাকা, কোনোটিতে ছয়-সাতশ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। এ কাজে একজন নারী কারিগরের মাসে তিন-চার হাজার টাকা আয় হয়।

মহাদেবপুরে প্রায় ১৫ বছর আগে শুরু হয়েছিল টুপি তৈরির কাজ। সারাবছর এসব টুপি তৈরি হলেও রমজানে বেড়ে যায় চাহিদা। জেলার ১১ উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে এ টুপি তৈরির কাজ। তবে এতে কারিগররা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। 

দেড় দশক আগে মহাদেবপুরে টুপির ব্যবসা শুরু করেছিলেন ভোলা এবং ফেনী জেলার এক দল ব্যবসায়ী। তখন টুপি তৈরির পর ঢাকার চকবাজার, বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হতো। ঢাকার ব্যবসায়ীরাই মধ্যপ্রাচ্যে এগুলো রপ্তানি করতেন।

শিবগঞ্জ গ্রামের সুফিয়া বেগম জানান, স্বামী দিনমজুরের কাজ করে। তার একার আয় দিয়ে আগে কষ্ট করে সংসার চলত। অনেক সময় আধপেটা খেয়ে থাকতে হতো। তবে গত চার-পাঁচ বছর টুপিতে নকশা তোলার কাজ করে এখন সংসার ভালোই চলছে। বাড়িতে হাঁস-মুরগি, ছাগল ও গরু পালন করছে তারা। 

কুঞ্জবন গ্রামের সীমা বেগম জানিয়েছেন, প্রতিটি টুপি থেকে ২০ থেকে ২৫ টাকা পেয়ে থাকেন তিনি। প্রায় ১০ বছর আগে প্রতিবেশীর উৎসাহে শুরু করেন টুপিতে নকশা তোলার কাজ। স্বামী ও নিজের আয় দিয়ে এখন সংসার চলছে স্বাচ্ছন্দ্যে। 

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, জেলায় প্রায় সাতজন মহাজন রয়েছেন। এ মৌসুমে জেলা থেকে প্রায় ৫০ হাজার পিস টুপি তৈরি করা হবে। যার উৎপাদন খরচ প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এর সবই রপ্তানি করা হবে। তবে সরাসরি নিজেরা রপ্তানি করতে পারলে বাড়তি দামে বিক্রি করে লাভবান হতে পারতেন।

ভোলার পাইকারী ব্যবসায়ী জহির আব্দুল্লাহ জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টুপি কিনে তা সরাসরি ওমানে রপ্তানি করেন। ওমানেও তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। সেখান থেকে তিনি এই টুপি রপ্তানি করেন মধ্যপাচ্যের বিভিন্ন দেশে। ওমানে তিনি প্রতিটি টুপি বিক্রি করেন ২ থেকে ৩ হাজার টাকায়। তিনি মনে করেন, কারিগরদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে টুপির মান বৃদ্ধির পাশাপাশি এর চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধি পাবে।

নওগাঁ জেলা বিসিকের উপব্যবস্থাপক শামীম আক্তার মামুন সমকালকে জানান, এ হস্তশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে মাত্র ৫ শতাংশ এবং পুরুষের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ সুদে ক্ষুদ্রঋণ চালু রয়েছে। এ খাতের কারিগররা আগ্রহী হলে দেশে ও দেশের বাইরে প্রশিক্ষণ এবং বিপণনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

আরও পড়ুন

×