জলাশয় ভরাট করে ফের মার্কেট নির্মাণের চেষ্টা
টাঙ্গাইলে জলাশয় ভরাটের প্রতিবাদে এলাকাবাসীর মানববন্ধন সমকাল
আবদুর রহিম, টাঙ্গাইল
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪ | ০০:১১
টাঙ্গাইল পৌরসভা এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি না নিয়ে জলাশয় ভরাট করে ১০ একর জায়গায় মার্কেট নির্মাণ করছে। এই জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, তাদের জমি। তবে রেকর্ড সংশোধন মামলার রায় অনুযায়ী জমির মালিক সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে টাঙ্গাইল পৌরসভা শতকরা ৬৫ ভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৩৫ ভাগ বাটোয়ারার চুক্তি করে মার্কেট নির্মাণ করছে। তবে মার্কেট নির্মাণ বন্ধে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছে পীর শাহ্জামান মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি।
মার্কেট নির্মাণের প্রতিবাদে রোববার মানববন্ধন করেছে সন্তোষ পীর শাহ্জামান মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি ও সর্বস্তরের জনসাধারণ। এর আগেও সড়ক ও জনপথের জায়গায় জলাশয় ভরাট করে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয় ও টাঙ্গাইল পৌর কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে সমকালে সংবাদ প্রকাশ হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে মার্কেট নির্মাণের জন্য জলাশয় ভরাট বন্ধ হয়ে যায়।
জানা গেছে, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনেই সন্তোষ চারাবাড়ি সড়ক। সড়কের দক্ষিণ পাশে মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর হাতে প্রতিষ্ঠিত পীর শাহ্জামান মার্কেট। উত্তর পাশেও রয়েছে দোকানপাট। দুই পাশে প্রায় ৩০০ দোকান রয়েছে। দক্ষিণ পাশের মার্কেটের পেছনেই ১০ একর জলাশয়। এখানেই চোখ পড়েছে পৌর কর্তৃপক্ষের।
পরিবেশ আইন-১৯৯৫ ও জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০-এর বিধান অনুসারে যে কোনো জলাশয় ভরাট নিষিদ্ধ। তবে এই আইন অমান্য করে জলাশয়টি ভরাট করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ। মাঝে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও আবার শুরু হয়েছে ভরাটের কাজ। এ ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে ব্যবসায়ী সমিতি।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন– টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জামিলুর রহমান মিরন, পীর শাহ্জামান মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক হাসরত খান ভাসানী, সদস্য সচিব আবু বক্কর সিদ্দিক, যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম আহমেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক হোসেন প্রমুখ। মার্কেট নির্মাণ বন্ধ করার জোর দাবি জানান তারা।
পীর শাহ্জামান মার্কেটের পেছনে জলাশয়ের চার ভাগের তিন ভাগ ভরাট করা হয়েছে। বাকি অংশেও মাটি ফেলা হচ্ছে। ১৯৭৪-৭৫ সালে টাঙ্গাইল পৌর এলাকার সন্তোষে টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবেক দাগ ৮০৩ ও ৮০৪-এর ১৫ দশমিক ৩২ একর জমি ইজারার আবেদন করেন আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। সে বছরই প্রতিষ্ঠিত করেন পীর শাহ্জামান মার্কেট এবং ভোগ্যপণ্য সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৬ সালে ভাসানীর মৃত্যুর পর ১৯৮৪ সালে গঠন করা হয় সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্ট বোর্ড। এই ট্রাস্ট বোর্ডের অধীনেই ছিল জমিটি। ২০০৫ সালে ট্রাস্ট বোর্ডের সঙ্গে সমঝোতা স্বাক্ষর হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের।
এদিকে, ২০০৫ সালেই ১৯৫৫-এর ৩০ ধারা রেকর্ড সংশোধনের মামলা করেন টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের কার্যসহকারী ফজলুল করিম। এতে বিবাদী করা হয় সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টের সেক্রটারি এবং সদর উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি)। ২০০৭ সালে মামলাটির রায় পায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
পীর শাহ্জামান মার্কেট বাজার সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম আহম্মেদ বলেন, পৌরসভা শুধু বাণিজ্যের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণ করছে। ভিসিও বিশ্বদ্যিালয়ের সম্পত্তি বলে ম্যিথাচার করেছেন। নিজেদের একটি জলাশয় ভরাট করতে হলেও অনুমতি নিতে হয়। কার অনুমতি নিয়ে মার্কেট নির্মাণ করছেন তারা?
সমিতির আহ্বায়ক ভাসানীর নাতি হাসরত খান ভাসানীর ভাষ্য, ১৯৭৬ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মৃত্যুর পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো ষড়যন্ত্রের মুখে পড়ে। এখন ভাসানীর হাতে গড়া পীর শাহ্জামান মার্কেট ভেঙে পৌর সুপার মার্কেট নির্মাণ করলে মেনে নেওয়া হবে না। এটা বন্ধ না হলে কঠোর আন্দোলনে গড়ে তোলা হবে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি এসেছি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে। স্থানীয় কোনো রাজনীতিতে আমি জড়াতে চাই না। মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।’
অভিযোগের বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌর মেয়র সিরাজুল হক আলমগীর সমকালকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় সবসময় যানজট থাকে। পীর শাহ্জামান মার্কেটের কারণে রাস্তা দিয়ে মানুষের চলাচল করতে অসুবিধা হয়। তাই মার্কেটটি উত্তর পাশে সরিয়ে নিলে রাস্তাটি বড় ও নান্দনিক হবে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তিতে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন তারা।
টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সিনথিয়া আজমেরী খান বলেন, ‘ইতোমধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি লিখেছি। খুব দ্রুতই জায়গাটি উদ্ধারে অভিযান চালানো হবে।’
- বিষয় :
- জলাধার ভরাট
