ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আবেদনের যোগ্যতা নেই, এক লাফে হন সহকারী অধ্যাপক

আবেদনের যোগ্যতা নেই, এক লাফে হন সহকারী অধ্যাপক
×

আইরিন আক্তার

 বেরোবি সংবাদদাতা

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৪ | ২২:৪৮

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) গণিত বিভাগের শিক্ষক আইরিন আক্তার। অভিযোগ উঠেছে, আবেদনের শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা কৌশল খাটিয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। 
জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে গণিত বিভাগে অধ্যাপক এবং সহকারী অধ্যাপকের (স্থায়ী) দুটি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তাতে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার যে কোনো একটিতে ন্যূনতম ‘এ’ (৫.০০ পয়েন্টভিত্তিক সিজিপিএ বা জিপিএ ন্যূনতম ৪.০ চতুর্থ বিষয় বাদে এবং চতুর্থ বিষয়ে ৪.৫০) থাকতে হবে। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী) পদের ঠিক নিচে ব্র্যাকেটে ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ’-এর মাধ্যমে ‘শূন্যপদ’ লেখা হয়েছে। আবেদনের শর্তে প্রতিটি স্তরে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। তবে একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে কয়টি বিষয় বা কী কী বিষয়ে শর্ত শিথিল হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রশাসনিক সূত্র বলছে, রাজশাহী বোর্ড থেকে এস‌এসসি পরীক্ষায় আইরিন আক্তারের জিপিএ ৩.৭৫। অর্থাৎ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী, ওই পদে আবেদনের যোগ্যতাই ছিল না তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও কোথাও নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর রেজাল্ট শিথিলের কথা উল্লেখ নেই। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞপ্তিতে অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে শর্ত শিথিলের কথা জুড়ে দিয়ে আইরিন আক্তারকে অস্থায়ী প্রভাষক থেকে এক লাফে সহকারী অধ্যাপক পদে নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা 
অনুযায়ী, প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পদ পর্যন্ত নিয়োগের বিষয়ে কোথাও শর্ত শিথিলের কোনো বিষয় উল্লেখ নেই। ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ’ পদ্ধতিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধির কোথাও উল্লেখ নেই। 

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপক পদে শিক্ষক না থাকায় ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর আইরিন আক্তারকে প্রভাষক (অস্থায়ী) নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে কৌশলে ২২ নভেম্বর ২০২১ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত তিন মাসের শিক্ষা ছুটিতে পাঠিয়ে অধ্যাপক পদের বিপরীতে থাকা প্রভাষক পদটি দেখানো হয় খালি। এর পর আইরিনকে যে পদে স্থায়ী করার কথা, সেই অধ্যাপক পদে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। 
আইরিন আক্তারের ছুটির সময়ে অধ্যাপক পদে নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের স্থায়ী পদে কমলেশ চন্দ্র রায় কর্মরত ছিলেন। তিনি পদোন্নতি পেয়ে সহযোগী অধ্যাপক হন। অথচ তাঁর সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। ফলে গণিত বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হলে কমলেশ চন্দ্র কোন পদে চাকরি করেন বা করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী হয়েছে কিনা– জানতে চাইলে অধ্যাপক কমলেশ চন্দ্র রায় বলেন, শিক্ষক তো সরাসরি নেওয়া হয় না। সিন্ডিকেট মিটিং এবং বাছাই বোর্ডে অনেক বিবেচনার পর নেওয়া হয়। তাই এ বিষয়ে প্রশাসন আরও ভালো বলতে পারবে। নিয়োগ বোর্ডে তো বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী নিজেই ছিলেন।
আইরিন আক্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, যে সময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়, সে সময় আবেদনের যোগ্যতা তাঁর ছিল। ২০১৭ সালে আবেদনের যোগ্যতায় সিজিপিএ কম লাগত। কিন্তু ২০২২ সালের পর থেকে এটা বাড়ানো হয়েছে। আর আবেদনের সময় আত্মীয়তা সম্পর্কহীন এমন অভ্যন্তরীণ দু’জন শিক্ষকের সুপারিশ প্রয়োজন হয়। সেখানে আইরিন আমার নাম দিতে চাইলে আমি তাঁকে না করিনি। 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইরিন আক্তার বলেন, আমার নিয়োগ হয়েছিল ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন সার্কুলারের আবেদনের শর্ত ছিল এইচএসসি অথবা এসএসসির যে কোনো একটিতে সিজিপিএ চার থাকা লাগবে। অনার্স অথবা মাস্টার্সের যে কোনো একটিতে ৩.৫ থাকলেই হবে। সার্কুলারের এমন শর্তসাপেক্ষে আমি আবেদন করেছিলাম। 

অস্থায়ী প্রভাষক থেকে সরাসরি সহকারী অধ্যাপক হওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, আগে আমার আর্মি ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিল, সেই সুবাদে সরাসরি সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদন করি। পরে রেজাল্টের সিকোয়েন্স বাড়া শুরু করছে। আর সহকারী পদে আবেদনের জন্য সার্কুলেশনে এইচএসসির ফলাফল ৪ চাওয়া হলেও অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে শর্ত শিথিলের কথা উল্লেখ ছিল। 
এ বিষয়ে বেরোবির তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশিদ বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে। আরেকটি বিজ্ঞাপন দিতে যে সময় ও খরচ, তা কমানোর জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের কোথাও নেই। কিন্তু শিক্ষকদের ভালোর জন্যই করা হয়েছে। আর শিক্ষা ছুটির ক্ষেত্রে যেভাবে ফাঁকা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, অর্জিত ছুটির ক্ষেত্রেও সেটি অনুসরণ করা হবে। কারণ এখানেও তো পদ খালি করেই ছুটিতে যান সংশ্লিষ্ট শিক্ষক।’
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল বিষয়ে বলেন, শর্ত শিথিলের কোনো সুযোগ নেই। তাঁর (আইরিন) তো আবেদনের যোগ্যতা নেই। তাঁর নিয়োগ বোর্ডে আমি ছিলাম, তাঁকে তো আমি শিক্ষক হিসেবে নিতে চাইনি। আমি ছাড়াও ওই বোর্ডের সদস্য চারজন ছিলেন। পাঁচজনের মধ্যে আমি একা কিছুই করতে পারিনি। 

আরও পড়ুন

×