ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালে তথ্য নিয়ে লুকোচুরি

চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালে তথ্য নিয়ে লুকোচুরি
×

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২০ | ১২:০০

চট্টগ্রামে বাড়ছে করোনা রোগী। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে মিলছে না কোনো চিকিৎসাসেবা। ১৮টি বেসরকারি হাসপাতালে শতাধিক আইসিইউ শয্যা থাকলেও সেগুলোয় ঠাঁই মিলছে না কোনো কভিড কিংবা নন-কভিড রোগীর। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের কাছে প্রথমবারের মতো রোগী ফেরত পাঠানোর ঘটনা স্বীকার করেছে।
তবে এরপরও নানা লুকোচুরির পথ বেছে নিচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলো। করোনা আক্রান্ত কোনো রোগী ভর্তি না করিয়েই হাসপাতালে ভর্তির তথ্য দেখাচ্ছে এসব হাসপাতাল। আইসিইউতে কোনো রোগী না থাকলেও ভর্তি থাকার তথ্য দেখাচ্ছে প্রশাসনকে। দাঁড় করাচ্ছে নানা অজুহাত। সমকালের অনুসন্ধানে চট্টগ্রামের ১৮ বেসরকারি হাসপাতালে তথ্য লুকোচুরির নানা প্রমাণ উঠে এসেছে।
এই ১৮ হাসপাতালের মধ্যে ৬টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে প্রশাসনের কাছে স্বীকার করেছে যে, রোগী ফেরত দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ পাঁচজন রোগী ফেরত দিয়েছে ডেল্টা হাসপাতাল। তিনজন করে রোগী ফেরত দিয়েছে সার্জিস্কোপ, পার্কভিউ ও মেট্রোপলিটন হাসপাতাল। রয়েল হাসপাতাল ও সিএসটিসি হাসপাতাল ফেরত দিয়েছে দুইজন করে রোগী। বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন চট্টগ্রাম নগরের ম্যাক্স হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা আছে প্রায় ২০টি। যার মাত্র একটিতে ভর্তি আছে রোগী। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইসিইউসহ হাসপাতালের একটি শয্যাও খালি না থাকার তথ্য দিয়েছে প্রশাসনকে। গত কয়েকদিনে কভিড কিংবা নন-কভিড আক্রান্ত অনেক রোগী ম্যাক্সে আইসিইউ সেবা চাইলেও ভর্তি না নিয়ে সিট খালি না থাকার কথা জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ৩০টি পর্যন্ত আইসিইউ শয্যা থাকলেও এই ১৮ হাসপাতালের প্রতিটিতেই নানা অজুহাতে রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে না। ১৮ হাসপাতালের মধ্যে এখন কেবল সিএসটিসি হাসপাতালে তিনজন, পার্কভিউতে চারজন ও ম্যাক্স হাসপাতালের আইসিইউতে রোগী ভর্তি আছে মাত্র একজন। বাকি ১৫ হাসপাতালের আইসিইউতে একজন রোগীও ভর্তি নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই এসব তথ্য প্রশাসনকে দিয়েছে। সিট খালি থাকার পরও করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গের অনেক রোগীর আইসিইউ শয্যার প্রয়োজন হলেও তাদের ভর্তি না করার এই প্রবণতা রহস্যজনক। এমনকি সাধারণ রোগে আক্রান্তরাও নিতে পারছেন না জরুরি এই সেবা। আইসিইউসহ শত শয্যার সুবিধা থাকার মধ্যে পার্কভিউ, ন্যাশনাল, ম্যাক্স, মেট্রোপলিটন, মেডিকেল সেন্টার ও সার্জিস্কোপ অন্যতম। রয়েল, সিএসসিআর, ডেল্টাসহ দেড় ডজন হাসপাতালের প্রতিটিতে শয্যা আছে পঞ্চাশেরও বেশি।
গত ৩১ মে বেসরকারি হাসপাতালে কভিড-১৯ ও নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত ও তদারকি করতে সাত সদস্যের সার্ভেইল্যান্স কমিটি গঠন করেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার। প্রতিদিন কতজন করোনা আক্রান্ত কিংবা উপসর্গের রোগী ভর্তি করা হচ্ছে, আইসিইউতে কতজন ভর্তি হচ্ছে, কতজন রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত দেওয়া হচ্ছে, খালি বেডের সংখ্যাসহ নানা বিষয় উল্লেখ করে যাবতীয় তথ্য দিতে গত ৪ জুন ১৮ বেসরকারি হাসপাতালকে নির্দেশনা দেয় সার্ভেইল্যান্স কমিটি। এ সময় আইসিইউসহ হাসপাতালে রোগী ভর্তি না করলেও অনেক হাসপাতাল করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গের অনেক রোগীকে ভর্তি করার তথ্য দিয়ে কমিটির কাছে তথ্য প্রেরণ করে, যার অধিকাংশই সঠিক নয় বলে প্রমাণও পেয়েছে কমিটি। রোগী ফেরত দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও শাস্তি থেকে বাঁচতে এদের অনেকে নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে।
তথ্যের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের অসামঞ্জস্য পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে সার্ভেইল্যান্স টিমের আহ্বায়ক চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, '১৮টি বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গের রোগী ভর্তি করাসহ নানা তথ্য উল্লেখ করে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। কিন্তু রিপোর্টের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের অসামঞ্জস্য রয়েছে। অনেকে রোগী ভর্তি না নেওয়ার তথ্য দিলেও যথোপযুক্ত কারণ দেখাতে পারছে না।' তিনি বলেন, 'চিকিৎসা না দিয়ে মনগড়া রিপোর্ট দিয়ে পার পাবেন না তারা। কমিটির সদস্যরা অসামঞ্জস্য পাওয়া হাসপাতালগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। এতে কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তা সরকারকে জানাব। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।'
করোনা মোকাবিলায় গঠিত বিভাগীয় কমিটির সমন্বয়কারী ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান সমকালকে বলেন, 'আইসিইউ সেবা না পেয়ে ও হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে অনেকের করুণ মৃত্যু হচ্ছে। অথচ ব্যবসা হারানোর ভয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো কভিড রোগী ভর্তি করাচ্ছে না। এজন্য মনিটরিং টিমকে আরও কঠোর হতে হবে। সরেজমিনে গিয়ে হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেড়িয়ে আসবে।'
গত কয়েকদিন ধরে বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা পরিস্থিতি সরেজমিনে মনিটর করছে মহানগর ছাত্রলীগ। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হাবিবুর রহমান তারেক বলেন, 'কয়েকটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুরুতে আমাদের আইসিইউতে একটি সিটও খালি না থাকার কথা বললেও ওই ওয়ার্ডে গিয়ে একজন রোগীও পাইনি। পরে কর্তৃপক্ষ চিকিৎসক না থাকায় আইসিইউ বন্ধ রাখার কথা জানায়। সিট খালি না থাকার অজুহাতে কয়েকজন রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়ারও প্রমাণও মিলেছে। এভাবে তথ্য নিয়ে লুকোচুরি করছে হাসপাতালগুলো।'
ম্যাক্স হাসপাতালের একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, 'করোনা উপসর্গ থাকায় নিজে কর্মরত থাকার পরও পাইনি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও আইসিইউ সেবা।'





আরও পড়ুন

×