উত্তরাঞ্চলে তরল দুধের গরল কারবার
নকল দুধ তৈরি চলছে বছরের পর বছর
লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল
প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০১:১৯
পাবনার ফরিদপুরের ডেমরা ইউনিয়নের গ্রাম চকচকিয়া। ক্রেতা সেজে সন্ধ্যার কিছু পরে গ্রামে ঢুকতেই নাকে এলো রাসায়নিকের ঝাঁজালো গন্ধ। প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে একটি টিনশেড ঘরে ঢুকেই চক্ষু চড়কগাছ। মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে কস্টিক সোডার প্যাকেট, স্কিমড মিল্ক পাউডার আর চিনির বস্তা। ঘরের এক কোণে ডিটারজেন্টের প্যাকেট ও পাম অয়েলের ড্রাম। কয়েকজন শ্রমিক এগুলো পরিমাণমতো মিশিয়ে বানাচ্ছেন দুধের মতো এক ধরনের সাদা তরল। এটিই নাকি ‘আসল দুধ’! কিছু শ্রমিক প্লাস্টিকের বড় বোতলে তরল ভরছেন। তাদের তৈরি ‘তরল দুধের বিষ’ ভোরের আলো ফোটার আগেই ট্রাকে করে চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে।
চকচকিয়ার মতো আশপাশের কয়েক গ্রামে প্রতি রাতেই চলে নকল দুধের কারবার। কারখানার এক শ্রমিক জানান, প্রতিদিন শুধু তাদের কারখানা থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ লিটার নকল দুধ চলে যায় দেশের বিভিন্ন মিষ্টির দোকান ও প্যাকেটজাত দুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির কাছে। সে হিসাবে শুধু এ ইউনিয়নেই কয়েক হাজার লিটার নকল দুধের কারবার চলে।
সিরাজগঞ্জ ও পাবনা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দুধ উৎপাদনে এ দুই জেলা অনেকটাই এগিয়ে। এখানে প্রতিদিন চার লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ লিটারের কিছু বেশি দুধের চাহিদা রয়েছে। অথচ উৎপাদন হয় চার লাখ লিটারের কাছাকাছি। সেই হিসাবে প্রতিদিন ঘাটতি থাকে ৫০ হাজার লিটার। রমজান ও ঈদের আগে এ ঘাটতি আরও বাড়ে। অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল দুধ তৈরি করে দুধের এ ঘাটতি পূরণের সুযোগ নেয়। টাকার অঙ্কে প্রতি রাতে তাদের লাভ হয় (৬০ টাকা কেজি দরে) প্রায় অর্ধকোটি টাকা।
যেভাবে নকল দুধ: পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সুজানগর, আটঘড়িয়া এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, বেলকুচি ও কাজীপুরের ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন প্রায় ১১ হাজার ২০০ কেজি (২৮০ মণ) ছানা তৈরি করেন। ওই পরিমাণ ছানা তৈরিতে এক হাজার ৪০০ মণ দুধের প্রয়োজন হয়। ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা ছানা তৈরির পর ছানার পানি ফেলে না দিয়ে তা বড় বড় ড্রামে সংরক্ষণ করেন। পরে এই পানিই নকল দুধে পরিণত হয়। প্রতিটি কারখানায় সব সময় দুই থেকে পাঁচ হাজার লিটার ছানার পানি মজুত রাখা হয়।
একইভাবে নানা উপকরণ মিশিয়ে তৈরি হয় নকল ঘি। প্রায় ১৫ কেজি সয়াবিন তেল ও ভেজিটেবল ফ্যাটের সঙ্গে পাঁচ কেজি খাঁটি ঘি, এক কেজি আলুর পেস্ট ও রং মিশিয়ে নকল ঘি তৈরি হয়। এটি দানাদার হওয়ায় ভেজাল বোঝার উপায়ই থাকে না। এ পদ্ধতিতে প্রতি কেজি নকল ঘি তৈরিতে সর্বোচ্চ খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। আর পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা দরে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবনার ফরিদপুর, বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর নিয়ে গড়ে উঠেছে দেশের প্রধান দুধ উৎপাদনকারী এলাকা। দিনে প্রায় ৪ লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয় সেখানে। এখান থেকে সরকারি দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা এবং বেসরকারি ব্র্যাক (আড়ং), প্রাণ, আকিজ (ফার্ম ফ্রেশ), আফতাবসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ করে। দুধ সংগ্রহের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে স্থাপন করেছে প্রচুর শীতলীকরণ ও সংগ্রহ কেন্দ্র। অভিযোগ রয়েছে, ভেজালকারীরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু শীতলীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তাকে হাত করে সেখানে ভেজাল দুধ সরবরাহ করে।
নকল দুধ তৈরির বিষয়ে নাম প্রকাশ না করে চকচকিয়া গ্রামের এক শ্রমিক জানান, খামারিরা তাদের কাছে এক মণ আসল দুধ বিক্রি করেন ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। প্রথমে এই দুধ থেকে মেশিনের সাহায্যে সাড়ে তিন কেজি ননি (ক্রিম) বের করা হয়। প্রতি কেজি ২৬৫ থেকে ২৭০ টাকা হিসাবে এই ননি বিক্রি হয় ৯৩০ থেকে ৯৫০ টাকায়। ননি বের করার পর ঘাটতি মেটাতে দেড় কেজি পাম অয়েল মেশানো হয়। সেটি ব্লেন্ড করলে সেই একই দুধে কৃত্রিম ননি তৈরি হয়। অর্থাৎ তেলের দাম ২৫৮ টাকা বাদ দিলে শুরুতেই প্রতি মণে লাভ হয় ৬৯২ থেকে ৭০০ টাকা।
জানা যায়, দুধ থেকে ননি আলাদা করার পর সেটি বড় আকারের কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। এটি থেকে ছানা তৈরি হলে সেটি ছেঁকে তোলা হয়। কড়াইয়ে থাকা দুধের ঘোলাপানিই তখন নকল দুধ তৈরির প্রধান উপকরণ। প্রতি মণ ছানার পানিতে ১ কেজি ননি, সামান্য পরিমাণ লবণ, খাবার সোডা, ১ কেজি চিনি, পরিমাণ মতো কস্টিক সোডা, স্কিমড মিল্ক পাউডার ও পাম অয়েল মিশিয়ে ব্লেন্ড করে নকল দুধ তৈরি হয়ে যায়। শেষে দুধকে তাজা দেখাতে মেশানো হয় ফরমালিন। দুধের ঘনত্ব নির্ণয়ে ল্যাকটোমিটার ব্যবহার করে ভেজাল শনাক্ত করা যায় বলে ফরমালিনসহ স্কিমড মিল্ক পাউডার ব্যবহার করা হয়। এতে ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং দুধ দীর্ঘক্ষণ তাজা থাকে; যার কারণে ল্যাকটোমিটার দিয়েও এই প্রতারণা সহজে ধরা যায় না।
ফরিদপুর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা কায়সার মো. রুহুল আমিন জানান, এখানে ১২৭টি নিবন্ধিত দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির বেশির ভাগ বাঘাবাড়ী মিল্ক ভিটায় দুধ সরবরাহ করে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যক্তিগত আরও দুই সহস্রাধিক দুগ্ধ উৎপাদনের খামার রয়েছে। শুধু এ উপজেলাতেই প্রাণ, আকিজ, আড়ং ও মিল্ক ভিটার প্রায় ৫৪টি দুধ সংগ্রহ পয়েন্ট রয়েছে। উৎপাদিত দুধের প্রায় ৭০ শতাংশ এসব প্রতিষ্ঠান নেয়। বাকি ৩০ শতাংশ দুধ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকায় নিজস্ব এজেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করেন।
ডেমরা ইউনিয়নের এক প্রবীণ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি চক্র গরুর দুধের বদলে রাসায়নিকের দুধ বানিয়ে পুরো গ্রামের সুনাম নষ্ট করছে। আগে মানুষ এখানকার খাঁটি দুধের সুনাম করত। এখন শুধু ভেজালের জন্যই নামডাক। তিনি বলেন, পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট মাঝেমধ্যে আসে। জরিমানা করে চলে যায়। পরে কারখানা আবার চালু হয়ে যায়।
এদিকে গ্রামে খাঁটি দুধ উৎপাদনকারীর অবস্থাও নাজুক। গবাদি পশু পালনকারী মিরাজুল নামের এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা কষ্ট করে দুধ উৎপাদন করি। তবে এই নকল দুধের কারণে দামের দিক থেকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারি না। মাঝেমধ্যে সংগ্রহ কেন্দ্রগুলোও খাঁটি দুধ কিনতে চায় না। কারণ, তারা আসলের সঙ্গে ভেজাল দুধ মিশিয়ে অধিক লাভ করতে চায়।’
কারা চালাচ্ছে সিন্ডিকেট: ফরিদপুরের ডেমরা গ্রামে নকল দুধের কারবারে ভূমিকা রাখছে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। এরা মূলত তিন স্তরে কাজ করে। নকল দুধ তৈরির জন্য প্রথমে স্থানীয় ক্ষুদ্র দুধ ব্যবসায়ী চুক্তি করেন খামারির সঙ্গে। কম দামে তাদের দুধ কিনে এবং প্রয়োজনে আর্থিক প্রলোভন দিয়ে ভেজাল মিশ্রিত দুধ সরবরাহে বাধ্য করেন। গ্রামের ভেতরে এবং আশপাশে গড়ে তোলেন একাধিক কারখানা। এসব কারখানার মালিকরা এ সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করেন। প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা লেনদেনও হয় এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।
সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ফরিদপুর উপজেলার শফি প্রামাণিক, আব্দুল আলীম, সাইদুল ইসলাম ও সরোয়ার। তাদের নির্দেশনা মতো কাজ করতে দলে আরও রয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। তারা সবাই নকল দুধ তৈরি করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্টের মাধ্যমে সরবরাহ করেন। এ ছাড়া বড়াল নদীর তীরে গড়ে ওঠা নকল দুধের কারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন সেখানকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মোগলা ঘোষ, আরিফ ঘোষ, আমজাদ ঘোষ, সাগর ঘোষ, সোহেল ঘোষ, জুয়েল ঘোষ ও আরিফ ঘোষ। তারা সবাই বড় ডিলার। সারাদেশে তাদের নকল দুধ সরবরাহের নেটওয়ার্ক রয়েছে। এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে পাশের সাঁথিয়ার আনাইকোলা গ্রামের ওয়াজেদ ঘোষ ও সাজু ঘোষের নকল দুধ তৈরির মালপত্র আদান-প্রদানের ব্যবসা রয়েছে। আবার ফরিদপুর ও সাঁথিয়ার এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জেলার আরও বেশ কিছু ব্যবসায়ী জড়িত। তাদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুর রশিদ, নাজমুল, আব্দুল কুদ্দুস, সরোজিৎ কুমার ঘোষ, দুলাল চন্দ্র ঘোষ, বিশ্বনাথ ঘোষ, পরিমল ঘোষ, পরিতোষ ঘোষ, দুলাল ঘোষ, রবি ঘোষ, নবরত্ন ঘোষ, মেজর ঘোষ, নবকুমার ঘোষ, রঞ্জিত কুমার ঘোষ, অধীর কুমার ঘোষ, রঘু ঘোষ, প্রেমকুমার ঘোষ, মিঠু ঘোষ, বাচ্চু ঘোষ, জিকরুল, উত্তম, নরেন হালদার, প্রশান্ত, রঞ্জন, সাধন ঘোষ, অখিল, এমদাদুল, ইসলাম, আমিরুল, পরিতোষ ঘোষসহ আরও অনেক। অভিযুক্ত এ ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতে অভিযানের শিকার হয়ে মোটা টাকা জরিমানা গুনেছেন। নকল দুধ তৈরি এবং সরবরাহ বন্ধ রাখেননি তারা।
শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ির খামারি আব্দুল আলিম বলেন, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো ৪ দশমিক ৫০ স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাটের (ননিযুক্ত) দুধ প্রতি লিটার ৫২ থেকে ৫৭ টাকা দরে কিনছে। এই মানের দুধ খুব কম উৎপন্ন হয়। খোলা বাজারে প্রতি লিটার দুধ ৬৫ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা বাজারে দুধের চাহিদা বেশি থাকায় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ কম থাকার সুবিধা নিচ্ছেন অসাধু কিছু ব্যবসায়ী। তারাই নকল দুধ ও ঘি বাজারজাত করে এ শিল্পের বারোটা বাজাচ্ছেন।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. মাহমুদা আরা বলেন, ‘ভেজাল ঘি ও দুধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। এতে ব্যবহৃত রাসায়নিক শরীরে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। লিভার ও কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলার পাশাপাশি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
উল্লাপাড়ার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান বলেন, ‘এভাবে নকল দুধ তৈরি চলছে বছরের পর বছর। নজরদারি না রাখলেই অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।’
শাহজাদপুরের নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সব সময় সতর্ক থাকার চেষ্টা করি। অভিযোগ পেলেই অভিযানে নামি।’
