মেলে না বন্যার আগাম সতর্কবার্তা আতঙ্কে থাকেন নদীপারের মানুষ
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার হলদি গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে মহারশি নদী সমকাল
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৫ | ০১:০৩
গত বছরের শেষ দিকে শেরপুরে ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনও শুকায়নি। প্রতিবছর বর্ষায় ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতে জেলার নদীগুলোর পানি হঠাৎ বেড়ে যায়। ফলে বন্যার আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়ায় আতঙ্কে থাকে জেলার তিন উপজেলার লাখো মানুষ। তখন নদীতীরের বাসিন্দাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
গারো পাহাড়বেষ্টিত শেরপুর জেলায় রয়েছে পাঁচটি নদ-নদী। অথচ জেলার গুরুত্বপূর্ণ দুই নদী মহারশি ও সোমেশ্বরীতে নেই পানি পরিমাপের যন্ত্র, স্কেল বা স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা। তবে অন্য তিন নদীতে এ সুবিধা থাকায় নদীপাড়ের বাসিন্দারা প্রস্তুতি নিতে পারেন।
স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা আর অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মহারশি ও সোমেশ্বরী নদীর পানি পরিমাপ করা হয়। এ দুই নদীতীরে বসবাসকারী লোকজন আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়ায় প্রতিবছর ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হন। মূল্যবান অনেক সম্পদ নদীর পানিতে খোয়াতে হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, নদী দুটিতে পানিপ্রবাহ পরিমাপের যন্ত্র বসাতে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাঁচটি নদ-নদীর মধ্যে জেলা সদরে রয়েছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, নালিতাবাড়ীতে চেল্লাখালী ও ভোগাই নদী, ঝিনাইগাতীতে মহারশি এবং শ্রীবরদী উপজেলায় সোমেশ্বরী নদী। এগুলোর মধ্যে মহারশি ও সোমেশ্বরীতে পানি পরিমাপের ব্যবস্থা নেই। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা এলাকা থেকে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার হলদি গ্রামের মধ্য দিয়ে নেমে এসেছে মহারশি। আর শ্রীবরদী উপজেলার সোমেশ্বরী নদী বালিজুড়ির খাড়ামোরা গ্রাম হয়ে উপজেলার মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে। বর্ষায় এ দুই নদীই ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
শ্রীবরদী উপজেলার খাড়ামোরা এলাকার বাসিন্দা হুসাইন হাবিব বলেন, বর্ষায় হুট করে পানি চলে আসে। আগের দিন সন্ধ্যায় দেখি নদীতে পানি নাই। পরদিন পানি বাড়ির উঠানে। নদীর সঙ্গেই আমাদের বাড়ি। কেউ কিছু জানে না– কখন পানি আসবে। যদি আগেভাগে পানির তথ্য পেতাম, তাহলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো।
একই এলাকার বাসিন্দা করিম মিয়া জানান, নালিতাবাড়ীতে পানি এলে আগে থেকেই জানা যায়। কিন্তু তাদের এই নদীতে জানা যায় না। তাই তাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এখন সরকার যদি এই নদীতে যন্ত্র বসিয়ে দেয়, তাহলে পানি এলে বুঝতে
পারবেন তারা। অনুমান করে আর কতদিন চলবেন– প্রশ্ন তাঁর।
ঝিনাইগাতী উপজেলার ব্রিজপাড় এলাকার বাসিন্দা আলমাছ বলেন, ‘প্রতিবছর আমাদের এই এলাকায় পানি ওঠে। নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। পানি বাড়ছে, না কমছে– দেখার জন্য বাঁশ পুঁতে রাখি। কেউ আমাদের বলে না, পানি কী অবস্থায় আছে। পানি মাপার মেশিন (যন্ত্র) থাকলে ভালো হতো। মূলত আগাম সতর্কতা আমাদের খুব দরকার।’
দিঘিরপাড় এলাকার বাসিন্দা ফজলুল মিয়ার ভাষ্য, মহারশি নদীর এখানে বেশি ভাঙে। এর পর পানি বাড়ি-ঘরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু প্রস্তুতি না থাকায় ঘর-বাড়ি থেকে কোনো কিছু বের করতে পারেন না তারা। আগে থেকে জানলে তো ঘর-বাড়ি থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র অন্য জায়গায় নেওয়া যেত।
একই এলাকার বাসিন্দা সিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘টিভির মধ্যে দেখি কোন নদীতে কতটুকু পানি; কখন বাড়ি-ঘরে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু সোমেশ্বরী নদীর কোনো আপডেট দেখি না। আমরা অনুমান করে যা পাই, তা-ই। অনুমান ছাড়া পানি কতটুকু আছে, জানার কোনো উপায় নেই।’
সদর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য জাহিদুল হক মনির জানান, কখন যে ঢলের পানি আসে, সেটার জন্য আতঙ্কে থাকতে হয়। তা ছাড়া নদীতে পানি মাপার কোনো যন্ত্র নেই। অনুমান করে সাধারণ মানুষকে বলতে হয়। যদি পানি মাপার যন্ত্র থাকত, তাহলে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কম হতো। তারাও মানুষকে সর্তক করতে পারতেন।
ঝিনাইগাতী উপজেলার ধানশাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, মহারশি নদীতে পানি মাপার যন্ত্র বসানো খুবই দরকার। কারণ একটু বৃষ্টি হলেই এই নদীর পানি উপচে যায়। পানি বেড়ে গেলেই বাড়ি-ঘরে ঢুকে পড়ে। এছাড়া নদীর পাশেই ঝিনাইগাতী সদর বাজার। ঢলের পানি এলেই বাজারে ঢুকে পড়ে। তখন বাজারে যাওয়া যায় না। যদি নদীতে পানি মাপার যন্ত্র থাকতো তাহলে খুব ভালো হতো।
শেরপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান বলেন, মহারশি ও সোমেশ্বরী নদীতে যন্ত্র-স্কেল বসানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা স্কেল বসানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর আশা, দ্রুতই নদী দুটিতে স্কেল বসানো যাবে। এতে নদীর পানিপ্রবাহ পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
- বিষয় :
- বন্যার পানি
