১৩ কোটির কাজ ফেলে লাপাত্তা
জুরাছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
জুরাছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
সত্রং চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৫ | ২৩:৩৭
দেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য নেওয়া উদ্যোগের অংশ হিসেবে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট জুরাছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ১৪ মে। ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ব্যয়ে চারতলা ভবনের নির্মাণের কাজ শুরু হয় একই বছরের জুনে। কাজটি পান বান্দরবানের ইউটি মং নামে এক ঠিকাদার। কিন্তু নির্মাণকাজ শুরু করেন আরেক ঠিকাদার জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ সলিম উল্লাহ সেলিম।
গত বছরের ৩০ জুন নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এক বছর আগে সেই মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর পরও কাজ অব্যাহত থাকলেও ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিলের সাড়ে ৪ কোটি টাকা তুলে নেয়। ভবনের পাহারাদার মো. সাগরের ভাষ্য, সাব-কন্ট্রাক্টে যিনি কাজ করেন, তিনি দুই থেকে তিন মাস হলো পালিয়ে গেছেন।
পুরোনো ভবন ভেঙে ফেলার পর নতুনটি নির্ধারিত সময়ে না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অনন্যা চাকমা। তিনি বলেন, ঠিদাকারকে অন্তত নিচ তলাটি প্রস্তুত করে দিতে বলা হয়েছিল, কিন্তু করেনি। বিলের প্রত্যয়নপত্র না দেওয়ার পরও সাড়ে ৪ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে তারা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। এর পরিপ্রেক্ষিতে চারতলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ শুরু হয়। কিন্তু ৪০ শতাংশ কাজের পর এটি বন্ধ হয়ে যায় বলে একটি চিঠিতে জানায় কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটি অনিশ্চতায় পড়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে স্থানীয় লোকজন বলছেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এক ঠিকাদারের নামে কাজ পাওয়া অপর ঠিকাদার লাপাত্তা হওয়ায় অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য প্রকৌশল কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদার বলছেন, মেয়াদ শেষ হওয়ায় বাকি কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, ভবনের চারতলার ছাদ ও নিচতলায় কিছু দেয়ালের কাজ হয়েছে। রাস্তা, সীমানা প্রাচীরসহ কিছুই হয়নি। প্লাস্টার না করায় বিমসহ ইটের গাঁথুনি নষ্ট হচ্ছে বৃষ্টিতে। নির্মাণাধীন ভবনের পেছনে দুই কক্ষের ভবনের একটিতে রোগী দেখছেন চিকিৎসক। অন্যটিতে ওষুধসহ চিকিৎসার সরঞ্জাম রাখা হয়েছে। সামান্য দূরে চিকিৎসকদের থাকার জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে দুটি কক্ষের মধ্যে একটিতে অন্তঃসত্তা, অন্যটিতে রোগীদের গাদাগাদি করে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ভবনটি নির্মাণে বিভিন্নভাবে চাপ দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উপজেলা দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয় চাকমা। তিনি বলেন, জুরাছড়িবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতাল ভবন নির্মাণে বরাদ্দ পেয়েছে। কিন্তু যিনি কাজ করছেন, তিনি পালিয়ে যাওয়ায় সব বন্ধ হয়ে গেছে।
যদিও ঠিকাদার ইউটি মং তাঁর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি নেই বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের বিভিন্ন সামগ্রী সরানোর নিলাম ডাককারী প্রতিষ্ঠান ঘরগুলো সরিয়ে নিতে অনেক সময় ব্যয় করেছে। সেখানে কিছু লোকের বসতিঘর ও ৩৩ হাজার ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ছিল। এসব কারণে কার্যাদেশের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়ে যায়।
ইউটি মংয়ের ভাষ্য, নির্মাণকাজ ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ শেষ হলেও বিল পাননি। যথেষ্ট নির্মাণসামগ্রী মজুত আছে বলেও দাবি করেন তিনি। আরেক ঠিকাদার জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ সলিম উল্লাহ সেলিম বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে করতে কার্যাদেশের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। যে কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজ করেছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রকল্প অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কার্যাদেশের সময় ১০ মাস থাকলেও এ ধরনের ভবন নির্মাণে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগে বলে জানান স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মনি কুমার শর্মা। তিনি বলেন, পুরোনো ভবন, বিদ্যুতের লাইন অপসারণ করতে পাঁচ মাস চলে গেছে। প্রকল্পের মেয়াদ জুন মাসে শেষ হওয়ায় কাজ বন্ধ রয়েছে। ডিপিডি প্রণয়নের কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগস্টের মধ্যে হলে সেপ্টেম্বর থেকে কাজ শুরু হবে। আগামী বছর জুন মাসের মধ্যে শেষ হবে কাজ। ঠিকাদার ইচ্ছা করে কাজ বন্ধ রাখেননি। সারাদেশে ১১০টির বেশি এমন প্রকল্প বন্ধ রয়েছে।
- বিষয় :
- স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
