৭২ শিক্ষার্থীর জন্য ৫ শিক্ষক, সবাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-কর্মকর্তার স্ত্রী
কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে চলছে পাঠদান সমকাল
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৬
শিক্ষার্থী মোটে ৭২ জন। তাদের জন্য শিক্ষক পাঁচজন। অর্থাৎ প্রতি ১৪ জনে একজন শিক্ষক। তার সঙ্গে রয়েছেন একজন অফিস সহকারী। এমন চিত্র ত্রিশালের কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ছয়জনই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের স্ত্রী।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের স্ত্রীদেরই বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মাত্র ৭২ জন শিক্ষার্থীর জন্য পাঁচজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারী অস্বাভাবিক অনুপাত। কারণ জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকা আবশ্যক।
কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের তথ্যমতে, প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সাতটি ক্লাসে ৭২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কর্মরত রয়েছেন ছয়জন শিক্ষক-কর্মচারী। যেখানে দেশের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট একটি প্রধান সমস্যা, সেখানে এই বিদ্যালয়ে প্রতি ১২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছে একজন শিক্ষক-কর্মচারী।
সমকালের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বিদ্যালয়ে কর্মরত সব শিক্ষক-কর্মচারী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের স্ত্রী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখানে নিয়োগে যোগ্যতা বা মেধার কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত ও আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের স্ত্রীদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালার লঙ্ঘন এবং সরকারি অর্থের অপচয় হিসেবেও বিবেচিত।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন মোছা. লোপা খাতুন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম হাফিজুর রহমানের স্ত্রী। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালে উপাচার্য মোহিত উল আলমের সঙ্গে ব্যক্তিগত সখ্য থাকায় নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে হাফিজুর রহমান নিজের স্ত্রীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।
শিক্ষক মোছা. সাবিনা ইয়াসমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার লিয়াকত হাসানের স্ত্রী, রোকসানা হাসান বৃষ্টির স্বামী ফিনান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক সোহেল রানা, রোকাইয়া আক্তার একাউন্টিং বিভাগের শিক্ষক মিনহাজ উদ্দিনের স্ত্রী এবং মন্টি রানী সরকারের স্বামী প্রকৌশল দপ্তরের উপপ্রধান প্রকৌশলী স্বপন কুমার শীল। এ ছাড়া অফিস সহকারী মঞ্জু আরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে কর্মরত রফিকুল ইসলামের স্ত্রী।
এসব নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সাবেক ছাত্র ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা শহীদুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, যেখানে হাজার হাজার যোগ্য বেকার যুবক চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন, সেখানে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অধীনে এমন নজিরবিহীন স্বজনপ্রীতি কীভাবে সম্ভব? এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষকই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নয়। তাই বর্তমান প্রশাসনের বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছা. লোপা খাতুন বলেন, ‘আগে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বরখাস্ত হওয়া শিক্ষক রুহুল আমিনের স্ত্রী। তিনি দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে আমি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে বসি। স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। নতুন ভবনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মিজানুর রহমান সমকালকে জানান, বর্তমানে যারা শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের যথাযথ নিয়োগপত্র নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল অ্যান্ড কলেজ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের অনুমোদনের জন্য ইউজিসিতে কাগজপত্র পাঠানো হবে। অনুমোদন হয়ে আসার পরে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিয়োগ দেওয়া হবে।
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল্লাহর ভাষ্য, জেলার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি ২২ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। অন্যান্য জেলায় শিক্ষক সংকট থাকলেও এ জেলায় তা নেই। তবে কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম সেখান থেকে শিক্ষককে বদলি করে অন্য স্কুলে পাঠানো হয়।
- বিষয় :
- স্কুলে ভর্তি
