ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভূমি জটিলতায় থমকে আছে লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা

ভূমি জটিলতায় থমকে আছে লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা
×

.

 সমকাল প্রতিবেদক, সুবর্ণচর (নোয়াখালী)      থেকে ফিরে

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪৯

ভাঙা-গড়ার উপকূলীয় জনপদ নোয়াখালীর সুবর্ণচর। জোয়ার-ভাটার এ জনপদের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা কখনোই সহজলভ্য ছিল না। আর সেই সীমাবদ্ধতার ভেতরেও উপকূলের প্রায় চার লাখ মানুষের একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠেছিল সুবর্ণচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সুবর্ণচরের আটটি ইউনিয়ন এবং পাশের দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার তিনটি ইউনিয়নের একমাত্র ভরসা এই হাসপাতাল। কিন্তু হাসপাতালটি এখন

অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ভূমি জটিলতায় থমকে আছে ৫০ শয্যার হাসপাতালের সম্প্রসারণ কাজ। 
হাসপাতালের জন্য দান করা জমিরই একটি বড় অংশ বর্তমানে দখল করে রেখেছে দাতাদের পরিবার। আরেকটি জমিতে গড়ে ওঠা হাসপাতালের স্থাপনা ঘিরেও চলছে আইনি লড়াই। বছরের পর বছর জমি জটিলতায় হাসপাতালের সম্প্রসারণ কাজ বন্ধ হয়ে আছে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত হাসপাতালের সম্পূর্ণ জমি উদ্ধার করতে হবে, যাতে এই দরিদ্র জনপদে অন্তত ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা জানান, ১৯৭৪ সালে সুবর্ণচরে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। সে সময় স্থানীয় তিন ব্যক্তি– হাবীব উল্লাহ, নুর মোহাম্মদ ও মোহাম্মদ উল্ল্যাহ হাসপাতাল নির্মাণের জন্য সরকারকে ছয় একর জমি দান করেন। জমির রেজিস্ট্রি দলিলও হয়। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল সেবা দিয়ে এলেও বছর দশেক আগে থেকে স্পষ্ট হতে শুরু করে– পুরো ছয় একর জমি হাসপাতালের দখলে নেই। হাসপাতাল নির্মাণের সময় যে জমি দান করা হয়েছিল, এর বড় অংশ দাতারাই দখলে রেখে দোকান, পাকা ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। যে ছয় একর জমির দানপত্র হয়েছিল, বাস্তবে এর মধ্যে প্রায় ২ দশমিক শূন্য ৭ একর জমি হাসপাতালের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, তাও সেটি স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা নামে এক ব্যক্তির জমিতে। 

অভিযোগ রয়েছে, দাতাদের একজন হাবীব উল্লাহ হাসপাতালের জমি ভরাটের ঠিকাদারি পেয়েছিলেন। তিনি তখন নিজ জমি ফাঁকা রেখে পাশের ব্যক্তি মোস্তফার জমি ভরাট করে হাসপাতালের নামে বুঝিয়ে দেন। মোস্তফা তখন বিদেশে কর্মরত ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি দেখেন, নিজের জমিতে হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। মোস্তফা আদালতের শরণাপন্ন হন এবং ১৯৯১ সালে নিম্ন আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেন। হাইকোর্টেও এই রায় বহাল থাকে। বর্তমানে তিনি নিজ দখলে থাকা অংশে বসবাস করছেন, অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনও সেই ২ দশমিক শূন্য ৭ একর জমি জটিলতার কারণে পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। ২০১৭ সালে হাসপাতালের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হলেও এক বছরের মধ্যে সেটি ভেঙে ফেলেন দাতারা। 
স্থানীয় মহিব উল্লাহ মহিব বলেন, যারা জমি দান করেছিলেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রভাব খাটিয়ে জমির একটি অংশ ফাঁকা রেখে হাসপাতাল গড়ে তোলার সময় পাশের জমি দখলে নিয়ে নেন। 
চরজব্বর থানা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) একাধিক চিঠিতে জমি উদ্ধারের আবেদন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জমিদাতারাই সরকারি সম্পত্তি দখল করে রেখেছেন। ২০১০ সালে নোয়াখালী সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে এক চিঠিতে বলা হয়, জমির একটি অংশ দাতারাই দখলে রেখেছেন এবং তা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।

এদিকে হাসপাতালের ভেতরেই এখন দুটি জটিলতা দেখা দিয়েছে। একদিকে হাসপাতালের নিজের দানপ্রাপ্ত জমির একটি অংশ বেদখলে রয়েছে, অন্যদিকে হাসপাতালের ভবন গড়ে উঠেছে এমন এক জমিতে, যার মালিকানাসংক্রান্ত মামলা ইতোমধ্যে আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং মালিক রায় পেয়েছেন। ফলে হাসপাতালও একটি আইনি ঝামেলায় জড়িয়ে আছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মীজানুর রহমান বলেন, হাসপাতালের দলিল অনুযায়ী ছয় একর জমির মধ্যে প্রায় ২ দশমিক শূন্য ৭ একর বেদখলে রয়েছে। আমরা বহুবার প্রশাসনের কাছে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ আসেনি। এই জমি জটিলতার কারণে হাসপাতালের সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেওয়া যাচ্ছে না।
সুবর্ণচর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছেন মং রাখাইন বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা আছে। তবে জমির মালিকানা নিয়ে মামলা চলমান থাকায় আদালতের নির্দেশনা ছাড়া আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।

আরও পড়ুন

×