চিকুনগুনিয়া রোগের উপসর্গ ডেঙ্গুর পরীক্ষায় চিকিৎসা
রোগীরা তাদের সন্তানদের নিয়ে অপেক্ষা করছেন। কখন তাদের সিরিয়াল আসবে, আর চিকিৎসক দেখাতে পারবেন। এমন চিত্র নাসিরনগর উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটির সমকাল
মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ | ০০:১৯
উপজেলা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের ধরমন্ডল গ্রাম থেকে নাসিরনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলেন সত্তরোর্ধ্ব শরিফা খাতুন। ১০ দিনের জ্বরে শরীর ভেঙে পড়েছে তাঁর, চোখ-মুখ লাল। ব্যথায় দাঁড়াতে পারছিলেন না। তাঁর সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়েছিল দুই দিন ধরে জ্বরে কাবু তিন স্কুলপড়ুয়া নাতনিও। শরিফা খাতুন বলছিলেন, ‘গতকালও আইছিলাম ডাক্তার দেখাইতে, ভিড়ের লাইগ্যা পারি নাই। আইজকা খুব সকালে আইসা লাইনে দাঁড়াইছি, কিন্তু অহনও ডাক পাই নাই।’
শরিফার মতো উপজেলার অসংখ্য মানুষ জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, গিঁটে গিঁটে ফোলা ভাব। এর সঙ্গে রয়েছে তীব্র ক্লান্তি। উপসর্গ দেখে চিকিৎসক বলছেন, তাদের চিকুনগুনিয়া হতে পারে। কিন্তু তারা এ রোগে আক্রান্ত কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। কারণ শুধু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই নয়, জেলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া কোথাও পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০ দিনে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় আট হাজার মানুষ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। বাস্তবে এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি হচ্ছেন ১২৫ জন। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ থাকলেও পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত না হলে চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত ধরে নিয়ে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসক। রোগীর চাপে হিমশিম খাওয়ার জোগাড় চিকিৎসক ও নার্সদের।
সোমবার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ থেকে বহির্বিভাগ পর্যন্ত অসুস্থ মানুষের ভিড়। সঙ্গে আছেন স্বজনেরাও। চিকিৎসকের কক্ষের সামনে রোগীর প্রেসক্রিপশনের স্তূপ জমেছে। চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। বারান্দায় অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে ছয় দিন ধরে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন জুলেখা বেগম। তিনি বলছিলেন, ‘পোলাডারে নিয়া হাসপাতালে আইছিলাম। এহন আমি আর আমার স্বামী দুজনেই জ্বরে পড়ছি। কী করমু, কিছুই বুঝতেছি না।’
১৩টি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরও করুণ। হাওরবেষ্টিত উপজেলার গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে পর্যায়ক্রমে তিনটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, আটটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ১০ শয্যার একটি পল্লী স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রেও জনবল সংকট।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, ১৩ ইউনিয়নের কেন্দ্রগুলোয় ১৩ চিকিৎসা কর্মকর্তার পদের বিপরীতে একজনও নেই। একজন করে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) থাকার কথা। কিন্তু তাও নেই। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ১৩ জন থাকার কথা থাকলেও আছেন পাঁচজন। ১৩ জন ফার্মাসিস্টের স্থলে একজন কর্মরত রয়েছেন।
আয়া থাকার কথা ১৩ জন, আছেন পাঁচজন। নৈশপ্রহরীর ১৩ পদে একজনও নেই। ৯১ পদের বিপরীতে পদায়ন আছে ২৩টিতে। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ১২০ জনই নেই। ২৩ জন চিকিৎসকের স্থলে আছেন মাত্র তিনজন।
ধরমন্ডল ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঁচ বছর ধরে কোনো চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় না বলে জানিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. শফিক মিয়া। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বছরে দু-একবার ভবনের দরজা খোলা হয়। একই অভিযোগ গোয়ালনগর, চাপরতলা, হরিপুর ও কুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানের।
জনবল সংকট প্রকট হলেও ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৬৫০ জন রোগী আসছেন। তাদের সিংহভাগই জ্বর, সর্দি, গলাব্যথা ও গিঁটে ব্যথায় আক্রান্ত। ২০ দিনে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ২৯ জন। লাখাই, সরাইল, মাধবপুর ও অষ্টগ্রাম থেকেও বহু রোগী আসছেন। ভর্তি হওয়া ২০ জন ডেঙ্গু রোগীই অন্য উপজেলার বাসিন্দা।
রোগীর এ অস্বাভাবিক চাপ পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অধিকাংশ চিকিৎসক ও নার্স কয়েক সপ্তাহ ধরে ঠান্ডা-জ্বরে ভুগছেন। তবুও তারা ২৪ ঘণ্টা সেবা দিচ্ছেন। স্বল্প জনবল নিয়ে এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। জরুরি ভিত্তিতে জনবল ও ওষুধ না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’
অনেকের মধ্যেই চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ রয়েছে নিশ্চিত করে ইউএইচএফপিও ডা. মোকবুল
হোসেন বলেন, চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হয় না, এটি ব্যবহুল। কেবল ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫-৬ হাজার টাকার বিনিময়ে করা হয়। শুধু ডেঙ্গু পরীক্ষা করেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
জেলার সিভিল সার্জন ডা. নোমান মিয়া বলেন, ‘প্রতিটি উপজেলা ও জেলা সদরে সাপে কাটা রোগীর জন্য বিনামূল্যে ভ্যাকসিন আছে। করোনা ও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য স্বল্পমূল্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস দেখেই রোগ নিশ্চিত করতে পারেন, নির্দিষ্ট পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। প্রাথমিক পরীক্ষার জন্য সব হাসপাতালে রক্ত সংগ্রহের ব্যবস্থা আছে।’
- বিষয় :
- চিকুনগুনিয়া
