কুমিল্লায় ৩৮ শহীদ পরিবার
দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বছর পার
ছেলের মরদেহ পাননি, কবর কোথায় তাও জানে না ফয়সালের পরিবার। ছবি-সমকাল
কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৯ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৫ | ১৬:৩১
‘আমার একটাই পোলা (ছেলে) ছিল, মাদ্রাসায় পড়ালেহা করত। তার বাপ মারা যাওয়ার পর সংসারে অভাব লাইগ্যা যায়। এরপর ঢাকায় একটা জুতার কারখানায় কাজ নেয়। পোলারে বিয়াও করাইছিলাম, একটা নাতিন হইছে। নাতিনের বয়স যখন দুই বছর তখনই পোলায় ঢাহা আন্দোলনে গুলি খাইয়া মারা যায়।’ এটুকু বলতেই ছেলের শোকে কেঁদে ফেলেন দেবিদ্বার উপজেলার ইউসুফপুর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের শহীদ জহিরুল ইসলাম রাসেলের বৃদ্ধ মা মোর্শেদা বেগম।
সমকালের কাছে ছেলের স্মৃতিচারণ করার সময় তিনি বলেন, ‘এহন নাতিনের বয়স তিন বছর হইল। বাড়ির পাশে পোলার কবর। নাতিন বাপেরে খুঁজলে কবরের কাছে নিয়ে যাই, আর বলি– তোর বাপ ওইখানে ঘুমাই রইছে। ঘুম ভাঙলে তোর কাছে আইব।’
গত বছরের ৪ আগস্ট রাজধানীর গুলিস্তানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গুলিতে নিহত হন রাসেল। তাঁর মায়ের মতো কুমিল্লার ৩৮ শহীদ পরিবারে অনেকেই হারিয়েছেন সন্তান; কেউবা স্বামী হারিয়ে হয়েছেন বিধবা। অনেকেই ছিলেন পরিবারের বেঁচে থাকা একমাত্র অবলম্বন।
শহীদ ফয়সাল সরকার (২২) দেবিদ্বার উপজেলার কাচিসাইর গ্রামের সফিকুল ইসলাম সরকারের ছেলে। ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকার আব্দুল্লাহপুরে শ্যামলী বাস কাউন্টারে পার্টটাইম চাকরি করতেন। মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন আব্দুল্লাহপুরের একটি ভাড়া বাসায়। ফয়সালের মা হাজেরা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলের কবরের সন্ধান চাই।’ গত বছর ১৯ জুলাই বিকেলে কাউন্টারে যাবেন বলে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি তাঁর ছেলে। ১ আগস্ট সকালে একটি হাসপাতাল থেকে বলা হয়, আঞ্জুমানে খোঁজ নিলে তারা দাফন করা কিছু লাশের ছবি দেখায়। সেখানে ‘হাড় নেই চাপ দিবেন না’; মাথায় ব্যান্ডেজ করা ফয়সালের ছবি দেখা যায়। তাকে কোথায় দাফন করা হয়েছে, জানতে চাইলে তারা বলেন, ১৫-২০টি লাশের গণকবর দেওয়া হয়েছে। কাকে কোথায় দাফন করা হয়েছে, কেউ জানেন না। শহীদ ফয়সালের বৃদ্ধ বাবা সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার আরও একটা ছেলে আছে। সে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। তার যদি কোথাও একটি চাকরির ব্যবস্থা করা হতো তাহলে আমার সংসারটা ঠিকমতো চলত।’
৫ আগস্ট কুমিল্লার ময়নামতি এলাকায় মারা যান মামুন আহমেদ রাফসান (১৮) নামে এক হোটেল কর্মচারী। নিহত রাফসান হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের ছালেক মিয়ার ছেলে। রাফসানের ভাই রানু মিয়া বলেন, ‘দাফনের আগে গোসল করানোর সময় ভাইয়ের শরীরে অনেক আঘাত দেখেছি। ভাই হারিয়ে মামলা করে এখন নানা অপবাদ সহ্য করছি। আমার ভাইকে নাকি কেউ মারেনি। আমার ভাই তাহলে মরল কেমনে? জানি না, ভাই হত্যার বিচার পাব কিনা!’
৪ আগস্ট আন্দোলনের সময় দেবিদ্বার উপজেলা সদরে গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুর রাজ্জাক রুবেল (৩৫)। তাঁর স্ত্রী হ্যাপী আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার স্বামী বাস চালাত। কী অপরাধ ছিল মানুষটার! তাকে গুলি করার পর তার মাথা কুপিয়ে দু’ভাগ করা হয়েছে। আমার স্বামীকে যারা প্রকাশ্যে হত্যা করেছে, তারা জামিনে বের হয়ে এলাকায় ঘুরছে।’
৪ আগস্ট দাউদকান্দির শহীদনগরে গুলিতে মারা যান স্কুলছাত্র রিফাত হোসেন (১৮)। তাঁর মা নিপা আক্তার বলেন, ‘আমি মামলা করার আগেই রাজ্জাক ফকির নামে একজন মামলা করে। মারা গেল আমার ছেলে; পুলিশ নিয়েছে অন্যের মামলা! সে (রাজ্জাক) লোকজনের কাছ থেকে টাকা খাচ্ছে, আর এলাকার লোকজন দোষ দিচ্ছে– আমি নাকি ছেলের রক্ত বিক্রি করছি।’
৪ আগস্ট সদর দক্ষিণে গুলিতে মারা যান মাছুম মিয়া (২২) নামে এক হোটেল কর্মচারী। তাঁর বাবা শাহীন মিয়ার আক্ষেপ, কী অপরাধ ছিল তাঁর ছেলের! তার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। তাকে কেন এভাবে মারা হলো?
২০ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীর গোপীবাগে গুলিতে নিহত হন দেবিদ্বারের ভানী ইউনিয়নের সূর্যপুর গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে কাদির হোসেন সোহাগ (২৪)। কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করতেন তিনি। তাঁর ছোট ভাই নাজমুল হাসান বলেন, ‘ভাইকে হারিয়ে আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। মায়ের চিকিৎসা চালাতে পারছি না।’
বাবা-মায়ের সঙ্গে মিরপুর-১ নম্বরে থাকতেন সাগর মিয়া। ভ্যানে সবজি ও কলা বিক্রি করতেন। ১৯ জুলাই ভ্যানে কাঁচামাল নিয়ে মিরপুর-১০ নম্বরে যান। সেখান থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মিরপুরের একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে। তাঁর মা বিউটি আক্তার বলেন, ‘ছেলের রোজগারের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখন আয় করার মতো সংসারে কেউ নেই।’
পুলিশ জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কুমিল্লা জেলার ১১টি থানায় ১২টি হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগে ৩০টি মামলা হয়েছে। একটিতেও চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ। এখনও ময়নাতদন্ত হয়নি ৪টি লাশের। ৪২ মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ৪ হাজার ৪২৪ ও অজ্ঞাতনামা আসামি ৬ হাজার ৩৯২ জন। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হন এজাহারনামীয় ৩২৮ জন এবং অজ্ঞাতপরিচয় ৬৯১ জন।
কুমিল্লা আদালতের পিপি কাইমুল হক রিংকু বলেন, ‘এখনও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় কোনো মামলার চার্জশিট আদাতে জমা হয়নি।’
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খানের ভাষ্য, নিরপরাধ কেউ যেন চার্জশিটভুক্ত না হয়, সে বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা আছে। প্রতিটি মামলা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- শহীদ পরিবার
