অর্থ সংকটে ঐতিহ্যবাহী বাংলা পান চাষ ছাড়ছে বাড়ৈ সম্প্রদায়
.
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৫ | ০০:১৫
সিলেটের লোকালয়ের মানুষের মাঝে খাসিয়া পানের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত মৌলভীবাজারের ঐতিহ্যবাহী বাংলা পান। জেলার বাড়ৈ সম্প্রদায়ের হাত ধরে এই জাতের পানের চাষ বিস্তার লাভ
করে। যুগ যুগ ধরে পারিবারিক পেশা হিসেবে এই পানের চাষ করে আসছে বাড়ৈরা। সেই ঐতিহ্য এখন ম্লান। অর্থ সংকট ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলা পানের চাষ ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছে বাড়ৈ গোষ্ঠীর লোকজন।
কৃষি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও আধুনিকায়নের ছোঁয়া না লাগায় বাংলা পান চাষে ভাটা পড়েছে। চাষিরা আর আগের মতো মুনাফা অর্জন করতে পারেন না। যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা পানের বাণিজ্যিক আবাদ ও বাজার পতনের মুখে। এমন অবস্থায় জীবিকা নিশ্চিতে পান চাষ বাদ দিয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছে বাংলা পান চাষের জন্য সুপরিচিত বাড়ৈ সম্প্রদায়ের মানুষ।
বাংলা পান উৎপাদনকারী জেলার এই জনগোষ্ঠীর আয়-ব্যয়ে বিস্তর তারতম্য। ফলে তারা পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে বেকার হয়ে পড়ছেন। এতে সদর উপজেলার ধোবারহাট গ্রামে এ সম্প্রদায়ের দুইশ পরিবার দিন কাটাচ্ছে ভয়াবহ অভাব আর সংকটের মাঝে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাগাবলা ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায় বাড়ৈদের পানের বরজ ও চাষের কার্যক্রম। ইউনিয়নের দিনারপুর পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ধোবারহাট গ্রামজুড়ে বসতি গড়ে তুলেছে বাড়ৈ সম্প্রদায়ের দুই শতাধিক পরিবার। বংশপরম্পরায় তারা এ জনপদে বসবাস করে বাংলা পান উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কালের পরিক্রমায় কৃষিক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন সাধিত হলেও এ ক্ষেত্রে তার ছোঁয়া লাগেনি। বাংলা পান উৎপাদনকারী বাড়ৈ সম্প্রদায়ের মানুষের ভাগ্য বদলে আসেনি আধুনিকতা। সনাতন পদ্ধতিতেই চলছে তাদের চাষাবাদের কার্যক্রম। তা ছাড়া হাইব্রিড ফসলের বাজারে পানেও পড়েছে প্রভাব। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় চাষ করা এসব হাইব্রিড পানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না সনাতনী বাংলা পান। বাজার মন্দা, আয় কম। তাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন চাষিরা।
বাড়ৈ সম্প্রদায়ের বর্তমান সদস্যরা জানান, তাদের বাপ-দাদারা যেমন বাঁশের মাচা বেঁধে, উঁচু চারি দিয়ে বেড়ার মধ্যে বাংলা পানের চারা রোপণ করে আবাদ করতেন; তারা একই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করেন। এটিকে পানের বরজ বলা হয়। কিছু দূরে দূরে এবাড়ি-ওবাড়ির পাশে পানের বরজের দেখা মেলে। এতে গ্রামীণ জনপদে সবুজ গাছ-গাছালির মাঝে দেখা মেলে এক ফালি সাদা মাচা। তাতে অপরূপ নান্দনিক আবহের সৃষ্টি হয়।
ধোবারহাট গ্রামের পানচাষি পুলিন ধর জানান, বছর দুয়েক আগেও এ গ্রামের অন্তত দুশ পরিবার বাংলা পান উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করত। এখন এ পান উৎপাদনে খরচ বেড়ে গেছে বিঘাপ্রতি ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এ খরচ অনেকে বহন করতে পারেন না। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে কোনোমতে বাপ-দাদার পেশা টিকিয়ে রেখেছেন। নিকটবর্তী শমশেরগঞ্জে হাটবার সপ্তাহে দুদিন। সোম ও বৃহস্পতিবার বরজ থেকে পান কাটা হয়। তিনি দেড় কেয়ার (দেড় বিঘা) জমিতে পান চাষ করে সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ কুঁড়ি (এক কুঁড়িতে ৪০ বিড়া) পান বিক্রি করতে পারেন। বর্তমানে পানের কুঁড়ি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।
স্থানীয় চাষিরা জানান, ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত পানের কুঁড়ি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
মৌলভীবাজার সদর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার ধোবারহাট, বৌলাশী, যাত্রাপাশা, নিশ্চিন্তপুর, মাধবপুর, শেখরজিরাসহ বিভিন্ন গ্রামে এ জাতীয় পান চাষ করা হয়। তবে এ পানের ভোক্তা মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ পর্যন্ত এলাকায় সবচেয়ে বেশি।
মৌলভীবাজার থেকে সবচেয়ে বেশি নবীগঞ্জ এলাকার পাইকাররা এসে পান নিয়ে যান। ওই গ্রামের হীরালাল ধর জানান, বরজে বর্ষাকালে কালাপচা, ধলাখাউড়িসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপে পান লাল হয়ে খসে পড়ে। আর্থিক সংকটের কারণে ঠিকমতো ওষুধও ব্যবহার করতে পারেন না চাষিরা। পান গাছের প্রধান খোরাক খইল। যার দাম ৫০-৫৫ টাকা কেজি। তাই খইল ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এতে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ২ থেকে ৩ বছর ধরে পান চাষ করতে পারছেন না।
আরেক পান চাষি নির্মল দত্ত জানান, ১৪ শতাংশ জমি চাষের উপযোগী করতে মাটিতে পোকা-মাকড় মারতে চুন, উর্বরতা বাড়াতে খইল, বেড়া দেওয়া ও মাচা বানানো, পানের গাছ রোপণে শ্রমিকসহ খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তিনি বেশি টাকা খরচ সম্পর্কে প্রথম দফায় রোপণের পর কাজে আসেনি, তাই দ্বিতীয় দফায় সফল হওয়ায় দ্বিগুণ খরচ হয়েছে। তিনি জানান, কৃষি বিভাগের কোনো সহযোগিতা কখনও পাননি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন বলেন, সম্প্রতি বর্তমান কর্মস্থলে যোগদান করেছি। ফলে অনেক বিষয়ই জানা নেই। সদর উপজেলার কৃষি অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলা পান চাষিদের সমস্যা সম্পর্কে জেনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
- বিষয় :
- অর্থ আদায়
