জরাজীর্ণ ৪৫ কিলোমিটার রেলপথ যেন মরণফাঁদ
.
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৪৫
গ্রামবাসীর প্রচেষ্টায় আবারও বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন রেলওয়ের রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীরা। বৃহস্পতিবার বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস ট্রেনের কারণে চারঘাট উপজেলার বালুদিয়াড় এলাকায় রেললাইনের দুই ফুট অংশ ভেঙে যায়। স্থানীয় এক তরুণ ভাঙা অংশটিকে দেখতে পেয়ে গ্রামবাসীকে খবর দেন। গ্রামবাসী লাইট ও লাল কাপড় নিয়ে গিয়ে খুলনা থেকে রাজশাহীগামী সাগরদাঁড়ী এক্সপ্রেস ট্রেনটিকে থামিয়ে দেন। নয়তো প্রায় সাতশ যাত্রী নিয়ে চলা ট্রেনটি দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতো। এ রুটে তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় ছয়টি ট্রেন আটকা পড়ে।
রেললাইনের পাত ভেঙে যাওয়া কিংবা ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া এই রুটে এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত বছরের ২৯ জানুয়ারি চারঘাট উপজেলার বাগমারী এলাকায় ১০ ইঞ্চি রেললাইন ভেঙে যায়। এক কৃষক বিষয়টি দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের ডেকে কাছে থাকা লাল গামছা উড়িয়ে রাজশাহীগামী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনটি থামিয়ে দেন। সেবার ওই ট্রেনের প্রায় ৫০০ জন যাত্রী প্রাণে রক্ষা পান। গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি একই কায়দায় ঢাকাগামী বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেন গামছা দেখিয়ে থামিয়ে ৮৫০ যাত্রীকে বাঁচান দুই কৃষক। সেবারও লাইনের ৮ ইঞ্চি জায়গা ভেঙে গিয়েছিল।
এর আগে ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আড়ানী রেলব্রিজের লাইনের ১৫ ইঞ্চি ভেঙে যায়। সেখানকার গেটম্যান বিষয়টি দেখতে পেয়ে লাল কাপড় উঁচিয়ে উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেন থামিয়ে যাত্রীদের রক্ষা করেন। পরে তাঁকে পুরস্কৃত করে রেলের পাকশী বিভাগ। এছাড়াও এ রুটে মাঝেমধ্যেই ট্রেন লাইনচ্যুত হবার ঘটনা ঘটছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী থেকে আব্দুলপুর জংশন পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার সিঙ্গেল রেললাইন রয়েছে। এই রেললাইনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ রাজশাহী থেকে চারঘাটের সরদহ রোড স্টেশন ও নন্দনগাছী স্টেশন হয়ে বাঘার আড়ানী স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটার রেললাইন। একমাত্র রেল সেতুও (আড়ানী বড়াল রেল সেতু) ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
রাজশাহী থেকে আব্দুলপুর পর্যন্ত রেললাইনটি সর্বশেষ বড় ধরনের সংস্কার করা হয় ১৯৬২ সালে। এরপরে আর কোনো সংস্কার কাজ হয়নি। ৪৫ কিলোমিটার এই রেললাইন সিঙ্গেল ব্রডগেজ থেকে ডাবল লাইনে উত্তীর্ণ করতে কাজ শুরু করা হয় ২০০০ সালের দিকে। দুই যুগেও সেই প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত কোনো অগ্রগতি নেই। এখনও প্রকল্পটি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে জরাজীর্ণ রেললাইনে অনেক কম গতিতে ট্রেন চলছে।
৬৩ বছরের পুরোনো সিঙ্গেল ব্রডগেজ রেললাইন দিয়ে প্রতিদিন ১৫টি ট্রেন ৩০ বার যাতায়াত করছে। চলাচল করছে মালবাহী ট্রেনও। পুরোনো রেললাইন, দুর্বল স্লিপার ও ঝুঁকিপূর্ণ রেল সেতুর কারণে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে ট্রেন। অথচ রাজশাহীর সঙ্গে সারাদেশে রেল যোগাযোগের এটিই একমাত্র রুট। প্রতি বছর এ রুটে নতুন ট্রেন কিংবা ইঞ্জিন যুক্ত হলেও জরাজীর্ণ রেললাইনের কারণে এর সুফল পাচ্ছেন না যাত্রীরা।
সরেজমিন রাজশাহী-আব্দুলপুর রুটের চারঘাট ও বাঘা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রেললাইন ও স্লিপারগুলোর বেহাল অবস্থা। স্লিপারকে যথাস্থানে রাখতে যে পরিমাণ পাথর প্রয়োজন, অধিকাংশ স্থানে তা নেই। যত্রতত্র রেললাইনের মাঝখান দিয়ে গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানকার লাইনের অবস্থা আরও নাজুক।
১৯১০ সালে নির্মিত আড়ানী রেল সেতুর স্লিপারের দুই পাশে আটটি করে পিন দেওয়ার কথা থাকলেও কোনোটাতে দুটি, আবার কোনোটাতে তিনটি, আবার কোনোটাতে একটিও নেই। কোনোটাতে নাট বোল্ট, ক্লিপ, হুক কিছুই নেই। দুই লাইনের গোড়ায় ফিস প্লেটে চারটি নাট-বোল্ট থাকার কথা। স্লিপারগুলোও বহু বছরের পুরোনো।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আহসান জাবির বলেন, রাজশাহী থেকে আব্দুলপুর জংশন রেললাইনের অনেক বয়স হয়ে গেছে। আড়ানী রেল সেতুর বয়সও শত বছরের বেশি। এ অবস্থায় রেললাইনের যে অংশগুলো অনিরাপদ মনে হচ্ছে সেখানে মেরামত করে রেল যোগাযোগ নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- রেলপথ
