তিনশ মিটারের ত্রাহিযাত্রা
বর্ষার শুরুতে শিশুদের কোলে নিয়ে জলাবদ্ধ জায়গা পার করে দেন মায়েরা সংগৃহীত
মনোজ সাহা, গোপালগঞ্জ
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৪৯
গ্রামের মধ্যে মাত্র তিনশ মিটার অংশে নেই সড়ক। বর্ষায় সেখানে জমে পানি। জলাবদ্ধতা থাকে অন্তত চার মাস। শতাধিক পরিবারকে বর্ষার শুরুতে হাঁটুসমান কাদাপানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়। বিদ্যালয়গামী ছোট শিশুরা মা-বাবার কোলে-পিঠে চড়ে সে অংশ পাড়ি দেয়। এখন পানি বেড়ে যাওয়ায় যাতায়াত করতে হচ্ছে ডিঙ্গি নৌকায়। তাদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন অভিভাবকরা।
এমন অবস্থা গোপালগঞ্জ পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাড়ারগাতী গ্রামের পরামানিক বাড়ি থেকে পোদ্দারবাড়ি পর্যন্ত। পরামানিক বাড়ির পাশে কাড়ারগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আর পোদ্দারবাড়ির পাশে কাড়ারগাতী সর্বজনীন হরি মন্দিরে হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের মন্দিরভিত্তিক উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র। এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিশুদের বয়স ৩ বছর থেকে ১১ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে অন্তত ১২০ শিশুকে পানি মাড়িয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে হয়।
শুকনো রাস্তায় যেতে হলে ঘুরতে হয় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ব্যস্ত দুই কিলোমিটার পথ। সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাধ্য হয়ে অন্তত চার মাস পানি মাড়িয়ে বা নৌকায় করে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করে শিশুরা।
কাড়ারগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিরু কামরুন্নাহার বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে ২১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এরমধ্যে ৭৬ শিক্ষার্থী ওই ৩০০ মিটারের কারণে ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসে। এসব শিক্ষার্থীর যাতায়াতের দুর্ভোগ নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় থাকি। এছাড়া দক্ষিণ কাড়ারগাতী গ্রাম থেকে রাস্তার পানি মাড়িয়ে ৩০ শিক্ষার্থী স্কুলে আসে। তাই রাস্তাগুলো নির্মাণ ও সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।’
কাড়ারগাতী মন্দিরের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক পলি বালা বলেন, ‘আমার এ কেন্দ্রে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির ৩০ শিশু পড়াশোনা করছে। এরমধ্যে ১৪ শিশু পরামানিক বাড়ির দিক থেকে পানি মাড়িয়ে কেন্দ্রে আসে। মাত্র ৩শ মিটার রাস্তা করে দিলে দুর্ভোগ থেকে শিশু, অভিভাবক ও আমরা রক্ষা পাব।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জ্যোৎস্না খাতুন বলেন, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। গোপালগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, যে স্থানে রাস্তা নির্মাণ করার দাবি করা হচ্ছে, সেখানে জমির মালিকরা জায়গা দিতে চাচ্ছেন না। তাই রাস্তা তৈরি করতে দেরি হচ্ছে। জায়গার বিষয়টি সমাধান হলে, দ্রুত সময়ের মধ্যে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রকিবুল হাসান বলেন, রাস্তা নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
গত বৃহস্পতিবার কাড়ারগাতী গ্রামে গেলে বাসিন্দারা তাদের দুর্ভোগের কথা জানান। তারা বলেন, বর্ষা মৌসুমের শুরুতে কাদাপানি মাড়িয়ে তাদের ওই ৩শ মিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। কিছুদিন হলো পানি বেড়ে যাওয়ায় ডিঙ্গি নৌকায় করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। বড়রা এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। গত মাসের মাঝামাঝি সময়েও শিশুদের কোলে করে ওই পথ পার করেছেন তাদের অভিভাবকরা। এখন নৌকায় করে শিশুরা স্কুলে গেলেও মাঝেমধ্যেই তা উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে সব সময় উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, জেলা সদরের জেলা পুলিশ লাইন্সের পরের ফিলিং স্টেশন থেকে পশ্চিম দিকে একটি পাকা রাস্তা পরামানিক বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। পুলিশ লাইন্সের পুলিশ বক্স থেকে পূর্ব দিকে আরেকটি পাকা রাস্তা গেছে পোদ্দারবাড়ি হয়ে সর্বজনীন হরি মন্দির পর্যন্ত। মাঝের ওই ৩০০ মিটার অংশে কোনো রাস্তা নেই। শুকনো মৌসুমে ধানক্ষেতের আল দিয়ে চলাচল করেন বাসিন্দারা। বর্ষায় শুরু হয় নানা ভোগান্তি।
যাতায়াতের ভোগান্তির পাশাপাশি মাঠ থেকে ফসল ঘরে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এছাড়া দক্ষিণ কাড়ারগাতী গ্রামের ২শ মিটার সড়ক তলিয়ে গেছে হাঁটুপানিতে। সেখানে নৌকাও চলে না। আবার শিশুদের জন্য হেঁটেও স্কুলে যাতায়াত কষ্টসাধ্য। পৌর কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েও সমাধান পাননি স্থানীয়রা।
কাড়ারগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণ পোদ্দার, দিশা টিকাদার, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রাপ্তি বিশ্বাসের ভাষ্য, শুকনো মৌসুমে তারা জমির আইল দিয়ে হেঁটে স্কুলে যায়। কিছুদিন আগে পানি এসে জমির আইল ডুবে যায়। তখন তারা হাঁটুপানি মাড়িয়ে স্কুলে যেত। ১০ দিন হলো পানি বেড়েছে। হেঁটে যেতে পারে না তারা। ১০ টাকা দিয়ে ডিঙ্গি নৌকায় পার হতে হচ্ছে। নৌকায় উঠলে নৌকা দুলতে থাকে। কখনও কখনও উল্টে যায়। তাদের বই খাতা কাপড় ভিজে যায়। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃষ্টি কির্ত্তনীয়া ও রাত্রী মজুমদার জানায়, আধা ভেজা কাপড়েই তাদের ক্লাস করতে হয়।
ডিঙ্গি নৌকার মাঝি অমিত রায় বলেন, ‘পানি বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা হেঁটে পার হতে পারছে না।’ তিনি বলেন, ‘শিশুরা নৌকায় উঠে নড়াচড়া করে। কয়েক বারই নৌকা উল্টে গেছে। এতে শিশুরা ভিজে গেছে। তবে বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। সাঁতার না জানা শিক্ষার্থীরা থাকলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।’
কাড়ারগাতী গ্রামের সুজন মজুমদার, শিক্ষক পবিত্র কুমার বিশ্বাস, রিপন বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা এখানে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ বসবাস করি। চলাচলের জন্য এখানে রাস্তাটি নির্মাণ করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।’ আবেদন করার পরও পৌর কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
- বিষয় :
- জলাবদ্ধ
