সমকাল এক্সপ্লেইনার
কার পাথর, কে লুট করে, বন্ধ হয় না কেন
পাথর লুট হওয়ার পর সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র। মঙ্গলবার সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে। ছবি: ইউসুফ আলী
মুকিত রহমানী
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৫ | ১৯:৫১ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৫ | ০৭:১৬
স্বচ্ছ জলের ভেতর স্পষ্ট দেখা যায় ছোট-বড় সাদা পাথর। এ পাথর লুটও হয় দিনের আলোতে।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে ধলাই নদীর উৎস মুখের অংশটিই মূলত সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সিলেটের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিও এই সাদাপাথর এলাকার পাশে। পাহাড় ঘেঁষা নদী থেকে শ্রমিকরা এ পাথর তোলে। নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা অমান্য করে উত্তোলনের মূল উদ্যোগটা নেওয়া হয় পাথর ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে। যাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক নেতা বা প্রশ্রয় পাওয়া ব্যক্তি। প্রশ্ন হলো, এই সাদাপাথর আসলে কার সম্পদ, রক্ষা করার দায়িত্ব কার এবং রক্ষা করা যাচ্ছে না কেন?
পাথর কার সম্পদ
সিলেটের পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, পাথরের জন্য বিখ্যাত সিলেটের জাফলং এক সময় ছিল খাসিয়া জৈন্তা রাজার অধীনে নির্জন বনভূমি। ১৯৫৪ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর পতিত ছিল বিস্তীর্ণ এলাকা। ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীরা পাথরের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌপথে জাফলং আসতে শুরু করেন। পাথর ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকলে সেখানে গড়ে ওঠে জনবসতি।
একইভাবে পাকিস্তান আমলে সীমান্তঘেঁষা সিলেটের বিভিন্ন নদী মোহনায় পাথরের সন্ধান শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইজারা দেওয়া শুরু করে সরকার। আশি ও নব্বইয়ের দশকে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে সিলেটের ‘পাথররাজ্য’। তবে যন্ত্রের ব্যবহার ও নীতিমালা না মেনে পাথর উত্তোলনের কারণে পরিবেশের ক্ষতি হতে থাকে। এ নিয়ে সোচ্চার হন পরিবেশবাদীরা। যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধসহ একে একে পাথর কোয়ারি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
খনিজ সম্পদ হওয়ায় পাথর উত্তোলনের অনুমতি বা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার এখতিয়ার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। দর্শনীয় স্থান ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষারও বিষয় থাকায় এর সঙ্গে পর্যটন এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও সংশ্লিষ্ট। আর আইন প্রয়োগে সহযোগিতা করার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।
কারা লুট করে
সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাথর উত্তোলনের কাজ করে বারকি শ্রমিকরা। পরে তারা নদী ও আশপাশের এলাকায় মজুত করে রাখে। সেখান থেকে কিনে নেন ব্যবসায়ীরা। শ্রমিকরা প্রধান ভূমিকায় থাকলেও তাদের মদদ ও আশ্রয় নেন বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি মামলার কারণে পাথার কোয়ারির ইজারা স্থগিত থাকে ৪ বছর। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশের সব পাথর কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করে।
বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বন্ধ থাকলেও একটি মহল সে সময় পাথর উত্তোলন করে কোনো রাখঢাক ছাড়াই। তাদের সমর্থিত লোকজনকে মাঠে নামানো হয় পাথর উত্তোলনের দাবিতে।
গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের সুযোগে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ ‘সাদা পাথর’ পর্যটনকেন্দ্র থেকে লুট করা হয় কয়েক কোটি টাকার পাথর। ওই দিন সন্ধ্যা থেকে পরদিন বিকেল পর্যন্ত শত শত ছোটবড় নৌকায় করে পাথর লুট করা হয়।

৫ আগস্টের পর টানা দুই সপ্তাহ জাফলং জিরো পয়েন্ট-সংলগ্ন পিয়াইন ও গোয়াইন নদের আশপাশে জমে থাকা অন্তত এক কোটি ঘনফুট পাথর লুট করা হয়। এর আনুমানিক মূল্য শতকোটি টাকা। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা ১৮ আগস্ট গোয়াইনঘাট থানায় জিডি করেন। জাফলংয়ে বালু-পাথর লুটের ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা ও পরিদর্শক মামুনুর রশিদ বাদী হয়ে গোয়াইনঘাট থানায় পৃথক মামলা করেন। দুই মামলায় মোট আসামি করা হয় ১১৪ জনকে। তাদের মধ্যে আছেন, সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম শাহপরান এবং সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আলম স্বপন। এ ঘটনার পর তাদের বহিষ্কার করে বিএনপি। এ ছাড়া মামলার অধিকাংশ আসামিও বিএনপির নেতকর্মী। পাথর লুটের অভিযোগে সবশেষ গতকাল সোমবার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনের পদ স্থগিত করে কেন্দ্রীয় কমিটি।
লুট বন্ধ হচ্ছে না কেন
চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি পাথর উত্তোলনের স্থগিতাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় উদ্বেগ প্রকাশ করে। ২৭ এপ্রিল এক সভায় দেশের ৫১টি পাথর কোয়ারির মধ্যে ১৭টির ইজারা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
খনি ও খনিজ সম্পদ (নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন) আইন-১৯৯২ এবং খনি ও খনিজ সম্পদ বিধিমালা-২০১২ অনুযায়ী, খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য সরকারের কাছে থেকে নিবন্ধন বা অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি ছাড়া বালু বা মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডও হতে পারে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুসারে পরিবেশ দূষণ বা ক্ষতির জন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পর্যায় বিবেচনায় আইনি ব্যবস্থা ও জরিমানার বিধান আছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মোহাম্মদ মাহবুব মুরাদ বলছেন, তাদের এমন জনবল নেই যাদের সেখানে (সাদাপাথর এলাকায়) বসিয়ে রাখবেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে যাতে কেউ পাথর তুলতে না পারে।
