ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিরাপত্তার অভাবে রাতে বন্ধ থাকে সব ফার্মেসি, বিপদে পড়েন রোগী

নিরাপত্তার অভাবে রাতে বন্ধ থাকে সব ফার্মেসি, বিপদে পড়েন রোগী
×

মুরাদনগর সদরে গত ৯ আগস্ট রাত ১১টায় বন্ধ পাওয়া যায় ফার্মেসিগুলো সমকাল

মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৬

নিরাপত্তার অভাবে রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় মুরাদনগর উপজেলা সদরের সব ফার্মেসি। কারও ওষুধের দরকার হলে বিপদে পড়েন রোগী ও স্বজনরা। রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা পেলেও কোনো ধরনের ওষুধ কিনতে পারেন না তারা।
দীর্ঘদিন ধরে উপজেলাবাসী ২৪ ঘণ্টা ফার্মেসি খোলা রাখার দাবি জানালেও নিরাপত্তার অভাবে রাজি হচ্ছেন না ওষুধ ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, মাদকসেবীরা রাতে ঘুরে বেড়ায়। করে ছিনতাই-চুরি। এসব কারণে সবার মধ্যে ভয় কাজ করে। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হয় না।
জানা গেছে, মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেতরে ২০০৩ সালে একটি ফার্মেসি চালু করা হয়। এর পর থেকে ২৪ ঘণ্টা ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী কিনতে তেমন সমস্যা হতো না। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় ফার্মেসিটি। এর পর থেকেই শুরু হয় রাতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর ভোগান্তি। ফার্মেসিটি চালু করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার দাবি জানিয়ে আসছেন এলাকাবাসী। কিন্তু কিছুতেই সাড়া মিলছে না। বিভিন্ন অজুহাতে বন্ধ রয়েছে ওষুধের দোকানটি।
স্থানীয়রা জানান, রাত ১টার পরে যদি কেউ মুরাদনগর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ পাবেন ঠিকই, কিন্তু সেই অনুযায়ী ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে পারবেন না। কারণ তখন সব ওষুধের দোকান থাকে বন্ধ। অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী না পেয়ে রোগীকে সদর হাসপাতালে নিতে হয়। এতে যেমন অতিরিক্ত অর্থ খরচ হয়, তেমনি ভোগান্তি পোহাতে হয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় দরিদ্র মানুষকে। অর্থের অভাবে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকে না। ফলে ওষুধের জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
গত ৯ আগস্ট রাত ১১টার সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতাল রোড ও উপজেলা সদরের প্রায় সব ফার্মেসি বন্ধ। যে দু-একটি খোলা 
আছে, সেগুলোও বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাত ১২টার পর আর কোনো ওষধের দোকান খোলা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিক সরকার বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার বাবা রাত ১টার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাই। চিকিৎসক ভর্তি দিলে কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনার প্রয়োজন হয়। তখন বাজারে গিয়ে কোনো দোকান খোলা না পাওয়ায় বিপদে পড়ে যাই। পরিচিত ফার্মেসির একজনকে ফোন করে ঘুম থেকে তুলে ওষুধের ব্যবস্থা করি। সেটিও সম্ভব হয়েছে ফার্মেসির মালিকের বাসা তাঁর দোকানের পাশে থাকার কারণে।’ তাঁর ভাষ্য, আগে হাসপাতালের ভেতরে একটি ফার্মেসি ছিল। যত রাতই হতো ওষুধের কোনো সমস্যা হতো না। ফার্মেসিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন অনেক সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে, বেশি সমস্যা পড়ছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী। মানবিক দিক চিন্তা করে হাসপাতালের ফার্মেসিটি চালু করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি হাসপাতালের আশপাশের ফার্মেসিগুলো খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হলে মানুষের কষ্ট কমে যেত।
গোমতী মার্কেটের দি নিউ সুলতান ফার্মেসির মালিক মামুন জানান, হাসপাতালের সীমানার ভেতরে একটি ফার্মেসি ছিল। মূলত তাঁর বাবা রোগীর কথা চিন্তা করে সেবামূলক উদ্দেশ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ২০০৩ সালে ফার্মেসি চালু করেন। তাঁর বাবার পর মানবসেবা হিসেবে ধরে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফার্মেসি সরিয়ে ফেলতে বললে সেটি বন্ধ করে দেন। জনগণের স্বার্থে কর্তৃপক্ষ যদি অনুমতি দেয় তাহলে সেটি আবার চালু করার ইচ্ছা আছে।
উপজেলা সদরের মায়া ফার্মেসির মালিক বাবুল চন্দ্র সাহা বলেন, ‘আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা মানুষের সেবায় ২৪ ঘণ্টা দোকান খোলা রাখা। কিন্তু দুঃখের বিষয় কেউ নিরাপত্তা দিতে রাজি হয় না। একটি ফার্মেসিতে কম করে হলেও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার ওষুধপত্র থাকে। প্রশাসন যদি নিরাপত্তা দিতে রাজি না হয়। তাহলে কে ঝুঁকি নিয়ে দোকান খোলা রাখতে চায়?’
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম মানিকের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, ফার্মেসি মালিকদের তিনি ডেকে বলেছেন রাতে অন্তত কয়েকটি ওষুধের দোকান খোলা রাখতে। কিন্তু তারা কেউ রাজি হননি। হাসপাতালের ভেতরে ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকা ফার্মেসিটি বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে প্রায় সব সরকারি হাসপাতালে এ ধরনের ফার্মেসি ছিল। কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় সেটি এখন বন্ধ রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুর রহমান জানান, এটি একটি বড় সমস্যা। কিছুদিন আগে আমার এক স্টাফ রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে মুরাদনগর সদরের ফার্মেসিগুলো বন্ধ থাকায় তাঁর জন্য পাশের উপজেলা দেবিদ্বার থেকে ওষুধ আনতে হয়। তিনি বলেন, ‘শুনেছি হাসপাতালের সীমানার ভেতরে একটি ফার্মেসি ছিল বর্তমানে সেটি বন্ধ রয়েছে। যেহেতু রাতে নিরাপত্তার একটু ঘাটতি রয়েছে। তাই হাসপাতালের ভেতরের ওষুধের দোকানটি পুনরায় কিভাবে খোলা রাখা যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।’
এ বিষয়ে মুরাদনগর থানার ওসি জাহিদুর রহমানের ভাষ্য, তাদের যদি জানানো হয়, তাহলে টহল ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

আরও পড়ুন

×