প্রশাসনের তদারকিতে চার দিন ধরে লুটপাট বন্ধ
জাফলং, বিছনাকান্দিতেও পাথর লুটের নেপথ্যে নেতারা
পাথর তোলার ফলে যে গর্ত হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয় আব্দুল হাই আল হাদি: পরিবেশবাদী
সিলেটের গোয়াইনঘাটের জুম মন্দির, চান্দুবস্তি ও জাফলং চা বাগান থেকে নির্বিচারে পাথর তোলার কারণে চারদিকে গর্ত আর খানাখন্দ। মঙ্গলবার জুম মন্দির এলাকা থেকে তোলা -সমকাল
সিলেট ব্যুরো
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ০১:১৫ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ১২:৪৬
সিলেটের গোয়াইনঘাটের পর্যটন কেন্দ্র জাফলং। সেখানকার ডাউকী নদীর তীর এখন ক্ষত-বিক্ষত। জুম মন্দির, চান্দুবস্তি, জাফলং চা বাগানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে নির্বিচারে পাথর তোলার কারণে চারদিকে শুধু গর্ত আর গর্ত। একই উপজেলার আরেক পর্যটন কেন্দ্র বিছনাকান্দি। সেখানকার বগায়া, গোচর, আদর্শগ্রাম, বিজিবি ক্যাম্প এলাকাসহ অনেক স্থানে একই পরিস্থিতি।
আগে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অবৈধভাবে পাথর তুলে পরিবেশ ধ্বংস করে। সরকার পতনের পর যেটুকু বাকি ছিল, তাও ধ্বংস করা হয়েছে। জাফলং ও বিছনাকান্দি থেকে যন্ত্র বসিয়ে এবং নদী এলাকা থেকে শত শত শ্রমিক বালু-পাথর লুট করে। এসব লুটের পেছনে সবার আগে নাম আসে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীর। যাদের অধিকাংশই দলীয় পদধারী।
গত বছর ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তারা কখনও প্রকাশ্যে, আবার কখনও নেপথ্যে থেকে লুট করে কয়েকশ কোটি টাকার পাথর।
এতে বদলে যায় সেখানকার প্রকৃতি-পরিবেশ। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে চার দিন ধরে বিছনাকান্দি ও জাফলং এলাকায় লুটপাট থেমেছে। তবু একদল শ্রমিক মাঝেমধ্যে নদী থেকে বালু তোলার চেষ্টা করছেন। গত সোমবার উপজেলা প্রশাসন সেখানে কিছু বালু-পাথর জব্দ ও বারকি নৌকা গুঁড়িয়ে দেয়।
পরিবেশবাদী আব্দুল হাই আল হাদি বলেন, পাথর তোলার ফলে যে গর্ত হয়েছে, তা কোনোভাবে পূরণ হওয়ার নয়। কেউ টিলা কেটে, কেউবা সমতল কেটে পাথর তুলেছেন। নদীর তলদেশেও ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে। বর্ষায় নদীর তলদেশ ভরে উঠলেও জুম, টিলা বা গ্রাম এলাকা ভরে ওঠার সুযোগ কম।
জাফলং
কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের পর সাদাপাথর তোলা বন্ধ হলেও জাফলং ডাউকী নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে পাথর উত্তোলন চলতে থাকে। জিরো পয়েন্টের পাশাপাশি জুম মন্দির, কান্দুবস্তি ও চা বাগান এলাকা থেকে যন্ত্র (বোমা মেশিন) ব্যবহার করে অবৈধভাবে পাথর তোলা হয়। সেখানকার টিলা আর সমতলভূমি এখন একাকার। তবে প্রশাসনের নজরদারির কারণে পাথর তোলার কার্যক্রম এখন থেমেছে।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, ৩৫১ একরের জাফলং পাথর কোয়ারির অবস্থান জিরো পয়েন্টের পাশের ভারতের পিয়াইন নদীতে। তবে সেখানে এখন পাথর ওঠানো হয় না। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ডাউকী ও নদীর তীরবর্তী স্থান থেকে মূলত পাথর উত্তোলন হয়ে আসছে। ইজারা বাতিলের পরও এ ধারা অব্যাহত ছিল। পাথর লুটের বিরুদ্ধে সরকারি উদ্যোগ চলাকালে গত ১৬ জুন জাফলং পরিদর্শন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। ওই দিন তাদের গাড়ি আটকিয়ে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকসহ বিএনপি নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় গোয়াইনঘাট থানায় উপজেলা যুবদলের সে সময়ের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ খানকে (বহিষ্কৃত) প্রধান আসামি করে মামলা করা হয়।
৫ আগস্টের পর জাফলং থেকে বালু-পাথর লুটের নেতৃত্বে সবার আগে নাম আসে গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা শাহ আলম স্বপন এবং বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম শাহপরানের। নাম আসে জেলা যুবদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেম (বহিষ্কৃত), পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমজাদ বক্স, বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক, পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি আজির উদ্দিন, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সুমন শিকদার, জেলা ছাত্রদলের সহসাধারণ সম্পাদক সোহেল আহমদ, উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আবদুল জলিল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রমজান মোল্লাসহ কয়েকজনের। শাহ আলম স্বপন ও রফিকুল ইসলাম শাহজাহান শুরু থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। তাদের কোনো পাথর ব্যবসা নেই বলেও দাবি করেন।
পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমজাদ বক্স বলেন, ‘পাথর থেকে টাকা খাইতে হবে আমার এমন অবস্থা হয়নি, চলার মতো সম্পদ আছে। কোনো সময়ই আমি পাথরের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, বরং বিভিন্ন সময় বাধা দিয়েছি।’
বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘রাজনীতি করি বলে অনেকে শত্রুতা করে। মূলত বাইরের শ্রমিকরা জাফলং থেকে পাথর লুট করে নিয়েছে। আমি বা আমার দলের কেউ পাথর লুটের সঙ্গে জড়িত না।’
পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি আজির উদ্দিনের ফোন নম্বর বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেনি সমকাল। এ ছাড়া বিএনপির অন্য নেতাদের বক্তব্য জানতে ফোন দেওয়া হলে কেউ ধরেননি।
বিছনাকান্দি
গোয়াইনঘাটের রুস্তমপুর ইউনিয়নের পর্যটনকেন্দ্র বিছনাকান্দি। সীমান্তঘেঁষা প্রায় ৫৩ একর ভূমির মধ্যে ১৩ একর পাথর তোলার জন্য গেজেটভুক্ত। পাথর কোয়ারি ইজারা বাতিল করার পর বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হয় উত্তোলন। সরকার পরিবর্তনের পর পাথর উত্তোলন রোধে একাধিক অভিযান চালিয়ে পাথর জব্দ করা হয়। সেই পাথর আবার গত জানুয়ারিতে নিলামের জন্য ডাকে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি)। জব্দ করা ৬০ লাখ ঘনফুট পাথর নিলামের আগেই সরিয়ে নেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে সেখানে বিভিন্ন স্থানে প্রচুর মজুত পাথর দেখা গেছে। অভিযান শুরুর পর স্থানীয় আদর্শ গ্রামের ভেতরে রাস্তা, বাড়ি ও নদীর তীরে বিপুল সংখ্যক মজুত পাথর সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়রা বলছেন, বিছনাকান্দি থেকে পাথর লুটে নেতৃত্ব দেন গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জয়নাল আবেদিন, সদস্য আব্দুল্লাহ, বিএনপি সমর্থিত স্থানীয় ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিন, স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ, তাদের অনুসারী সুলতান, কামরুল, আবুল মিয়াসহ ১৫ থেকে ১৬ জন। অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি কোনো দিন কোয়ারিতে যাইনি। বিজিবির সহায়তায় শ্রমিকরা চুরি করেছে। আমরা বিভিন্ন সময় বাধা দিয়েছি।’
গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জয়নাল আবদিন বলেন, ‘এতে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কেউ মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে। কোয়ারি বন্ধের পর থেকে সিলেট নগরে অবস্থান করছি।’ বিছনাকান্দির আবদুস সামাদ মেম্বারের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়নি।
গোয়াইনঘাট থানার ওসি সরকার তোফায়েল আহমদ জানান, জাফলংয়ে পাথর লুটে পরিবেশ অধিদপ্তর যে তিনটি মামলা করেছে, তা তদন্ত করা হচ্ছে। যারা জড়িত, তাদের শনাক্তের কাজ চলছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, সোমবার আমাদের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে। থানায় একাধিক জিডি ও মামলা রয়েছে, যা পুলিশ তদন্ত করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরও মামলা করেছে। পাথর উদ্ধার ও জাফলং রক্ষায় অভিযান চলছে।
- বিষয় :
- পাথরখনি
