বাউফল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস
দলিলের ভাগ্য নির্ধারণ হয় সাংকেতিক অক্ষরে
.
বরিশাল ব্যুরো ও বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৩৫
দলিলের এক কোণে পেন্সিলে লেখা হয় একটি গাণিতিক সংখ্যা অথবা প্রশ্নবোধক চিহ্ন। এ চিহ্ন থাকলেই যত বিপত্তি। কাগজপত্রে ত্রুটিসহ নানা অজুহাতে নাস্তানাবুদ হতে হয় দাতা ও গ্রহীতাকে। চিহ্ন না থাকলে কোনো প্রশ্ন না করেই দলিল সম্পন্ন করেন সাব-রেজিস্ট্রার। বাউফল উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে এ রেওয়াজ চলছে।
সাব-রেজিস্ট্রার নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি চক্র এ কাজে জড়িত। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অন্তত ১০ জন দলিল লেখক এ তথ্য জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, সরকার নির্ধরিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার। তার প্রতিনিধি হয়ে কাজ করেন নকলনবিশ মেহেদি হাসান। জমির পরিমাণ, দাগ, খতিয়ান, চৌহদ্দির ঘর পূরণ করে, পর্চা, দাখিলাসহ যাবতীয় তথ্য মেহেদির টেবিলে দিতে হয়। তিনি এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে দাতা বা গ্রহীতার সঙ্গে কথা বলেন। ঘুষ পেলে দলিলের এক কোণে সাংকেতিক চিহ্ন লিখে দেন। এটি দেখলে সাব-রেজিস্ট্রার বুঝে নেন, আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। ভাগ পেয়ে যাবেন নিশ্চিত। চোখ না বুলিয়েই স্বাক্ষর করে দেন। দলিল সম্পন্নের পর এ সংকেত মুছে ফেলা হয়।
বাউফলের সাব-রেজিস্ট্রার পদটি প্রায় তিন বছর ধরে শূন্য। কলাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রার নজরুল সপ্তাহে দুদিন বাউফলে দায়িত্ব পালন করেন। জাল পর্চায় দলিল সম্পন্ন করায় তাঁর বিরুদ্ধে এক বছর আগে দলিল লেখকরা লিখিত অভিযোগ দেন। তখন তাঁকে বাউফল থেকে প্রত্যাহার করা হয়। অদৃশ্য শক্তির জোরে তিন মাস পরই বহাল হন নজরুল ইসলাম।
অভিযোগ থেকে জানা গেছে, আমোক্তারনামা বাংলায় লেখা হলে দুই হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়। ইংরেজিতে লেখা হলে আরও বেশি। এ ক্ষেত্রে নিজ নামে বা বাপ-দাদার নামে জমির নামজরি না থাকলেও চলে। বন্ধকি দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে জমির মূল্য ৯৯ হাজার টাকা পর্যন্ত ১২ হাজার টাকা এবং এর পরে টাকার অঙ্ক অনুযায়ী অতিরিক্ত টাকার হারও বাড়ে। সাবকবলা দলিল ও বণ্টননামায় প্রতি লাখে বাড়তি দিতে হয় এক হাজার টাকা। এক কোটি টাকার দলিলে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এভাবে অনিয়ম করে গত বছর ১২ ফেব্রুয়ারি পাবলিক মাঠের জাহাঙ্গীর টাওয়ার (সাত তলা ভবন) বিক্রিতে ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিতে সাবকবলা দলিলের বদলে দানপত্রের মাধ্যমে হস্তান্তরের সুযোগ দেন সাব-রেজিস্ট্রার। এতে সরকার কমপক্ষে ২০ লাখ টাকার রাজস্ব হারিয়েছে।
দলিল লেখকদের ভাষ্য, অতিরিক্ত টাকা না দিলে যাচাই-বাছাইয়ের নামে খাজনা, নামজারি, জাতীয় পরিচয়পত্র ইত্যাদির নানা ত্রুটি ধরে হয়রানি করা হয়। নামজারি, খাজনা, মূল কাগজের স্থলে কাটাছেঁড়া হলে মেহেদি হাসান টাকার অঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেন। পেঅর্ডার কেটে দলিল সম্পাদনের এক মাস হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা হয় না।
লিটন চন্দ্র নামের এক দাতা বলেন, নকলনবিশের কাজ হলো সরকারি রেজিস্টার বইয়ে দলিলসহ বিভিন্ন তথ্য লিপিবদ্ধ করা। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এর অবিকল নকল সরবরাহ করা। অথচ দলিল নিতে গিয়ে দেখা যায় নকলনবিশ সাব-রেজিস্ট্রারের কাজ করছেন। বিধানে রয়েছে, দাতার পর্চা, নামজারি ঠিক আছে কিনা তা সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার দেখবেন। এ নির্দেশনা মানা হচ্ছে না।
অভিযোগের বিষয়ে নকলনবিশ মেহেদি হাসান বলেন, ‘কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা আমি দেখে দেই, স্যার সই করেন।’ দলিলের কোনায় গাণিতিক অক্ষর লেখার কারণ প্রসঙ্গে বলেন, কতটা দলিল হয়েছে এটা তার হিসাব। প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে কী হিসাব মেলান জানতে চাইলে সদুত্তর মেলেনি।
মেহেদি হাসানের সহযোগী মোহরার নাসির বলেন, ‘আমাদের বদনাম করছে দলিল লেখকরা।’
সাব-রেজিস্ট্রার কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, নিয়ম মেনেই দলিল করা হচ্ছে। তিনি কোনো অনিয়মে জড়িত নন।
জেলা সাব-রেজিস্ট্রার মো. কামাল হোসেন বলেন, অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- ভূমি
